২০১৫ সালে ‘বিপ্লবীদের কথা’ প্রকাশনা থেকে ভাষাসংগ্রামী আহমদ রফিক ভাইকে নিয়ে একটি ‘জীবনী গ্রন্থ’ প্রকাশ করার উদ্যোগ নিই। কিন্তু তার রচিত ‘পথ চলতে যা দেখেছি’ বইটি পরে নতুন করে ‘জীবনী গ্রন্থ’ প্রকাশ করার প্রয়োজন পড়ে না। তখন একটু মুশকিলে পড়লাম। অনেক চিন্তা-ভাবনা করে একদিন তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনার কোনো সাক্ষাৎকারমূলক বই বের হয়েছে কি-না? জানলাম বের হয়নি। তখন উদ্যোগ নিলাম একটা সাক্ষাৎকারমূলক বই করার। কিন্তু তাতেও স্বস্তি পাচ্ছিলাম না। কেননা ভাষাসংগ্রামী আহমদ রফিক ভাইয়ের কাছে প্রশ্ন করে, তার উত্তর নিয়ে বই করা যথারীতি ভীতিজনক ছিল আমার কাছে। কারণ তার সৃষ্টিকর্ম ও জীবন-দর্শন সম্পর্কে খুব কমই জানতাম। তবে এতটুকু জানতাম যে নির্মোহ, সৎ ও মহৎ কর্মযোগী মানুষ তিনি। আহমদ রফিক তার সৃষ্টিকর্মের মাধ্যমে মানুষের সামনে ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি-ইতিহাস-দর্শন ও রাজনীতির সঠিক বিষয়বস্তু তুলে ধরার মহান কাজে ব্রতী। এমন একজন ‘মানুষ’-এর কাছে প্রশ্ন করা আমার মতো কম জানা লোকদের জন্য অবশ্যই ভীতিকর বটে। তারপরও সাহস করে প্রশ্ন নিয়ে রফিক ভাইয়ের বাসায় গেলাম। তিনি প্রশ্ন দেখলেন, বললেন, তোমরা কী করবে? আপনার সাক্ষাৎকার ও সংক্ষিপ্ত জীবনী নিয়ে বই করব। তখন তার বয়স ছিল ৮৮ বছর। তার অসমাপ্ত অনেক কাজ পড়ে রয়েছে। এছাড়াও বিভিন্নজন ও গণমাধ্যমগুলো একের পর এক লেখা চায়। তার মধ্যে আমরা আরেকটা কাজের বোঝা নিয়ে হাজির। তারপরও তিনি আমাদের ফিরিয়ে দেননি। একের পর এক প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। যা ওই বয়সে আমাদের পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব হতো না। আসলে এমন ‘মানুষ’রাই পারেন। এরাই আমাদের টিকিয়ে রেখেছেন কিন্তু আমরা তা বুঝি না!
‘ভাষাসংগ্রামী আহমদ রফিকের সাক্ষাৎকার’ গ্রন্থটি ২০১৭ সালে প্রকাশিত হয়। দীর্ঘদিন ধরে নেওয়া ধারাবাহিকভাবে নানা প্রশ্ন ও প্রশ্নের উত্তর পর্বের শুরুর দিকে ‘খাপড়া ওয়ার্ড’ হত্যাকাণ্ডের ইতিহাস কেন ইতিহাস থেকে বাদ পড়ল? এই প্রশ্নের জবাবে বললেন, ‘বিভাজিত ভারতবর্ষের ভারত, পাকিস্তান ডোমিনিয়নে ক্ষমতাসীন কংগ্রেস ও লীগ ডান্ডা হাতে ফ্যাসিস্ট কায়দায় দেশ শাসন করেছে। আর কমিউনিস্টদের প্রতি উভয়ের ছিল বিষ নজর। অন্যদিকে, মানুষ ছিল কথিত স্বাধীনতার নামে মন্ত্রমুগ্ধ। সে সময় ১৯৪৮-এর ফেব্রুয়ারিতে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় কমিউনিস্টদের সশস্ত্র বিপ্লবের ডাক ছিল অসময়োচিত, রাজনৈতিক ভাষায় ‘বাম-হঠকারিতা’। জনবিচ্ছিন্ন এ সংগ্রাম দুই ভূখণ্ডেই শাসক শ্রেণি রক্তস্রোতে স্তব্ধ করতে পেরেছে। পাকিস্তানে তেভাগাসহ এ আন্দোলনের পক্ষে মাথা তুলে দাঁড়ানোর বাস্তবতা ছিল না বলেই, খাপড়া ওয়ার্ড হত্যাকাণ্ড ও ইলা মিত্রের ওপর পৈশাচিক নির্যাতন বিনা বাধায় সংঘটিত হয়। একইভাবে ময়মনসিংহে ‘হাজং বিদ্রোহ’, সিলেটে ‘নানকার আন্দোলন’ দমন সম্ভব হয়। সংবাদপত্র বা জনমানসে এসব বর্বরতার বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া ছিল না বললেই চলে। ফলে এসব বিদ্রোহ বা আন্দোলনের ইতিহাস লিপিবদ্ধ হয়নি, পত্রপত্রিকাতেও প্রকাশিত হয়নি বললেই চলে। অবশ্য এর জন্য বুদ্ধিজীবীদের ইতিহাস-অসচেতনতাও দায়ী।
সেই দীর্ঘ বক্তব্যের কিছু অংশ সংকলন করে তুলে ধরছি ‘দেশের প্রথম শহীদদের আমরা সত্যি মনে রাখিনি। ফেব্রুয়ারি শাহাদাতের মাস। একুশের ভাষা আন্দোলনে (১৯৫২) শহীদদের আমরা এ মাসেই বিশেষভাবে স্মরণ করি। বিনম্র শ্রদ্ধায় নানা অনুষ্ঠান বক্তৃতা, স্মৃতিচারণা, এমনকি লেখালেখিতে তাদের অবদান তুলে ধরি, জাতি তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানায়। এমন কথাও বলি যে, তাদের আত্মদানের পথ ধরে পরবর্তী গণতান্ত্রিক সংগ্রামের প্রকাশ এবং সবশেষে একাত্তরের স্বাধীনতাযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটেছে, এ সবই ঠিক। কিন্তু ইতিহাস-উদাসীন আমরা মনে করি না, এদের আগে পাকিস্তানি স্বৈরশাসনের বর্বরতায় শহীদদের কথা, নির্যাতিতদের কথা; যারা প্রাণ দিয়ে, মান দিয়ে ফ্যাসিস্ট শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঘণ্টা বাজিয়েছিলেন, দেশকে গণতান্ত্রিক শাসনের পথে টেনে আনতে চেষ্টা করেছিলেন। মূলত তেভাগা ও কৃষক আন্দোলন নিয়ে বাম রাজনীতির যাত্রা পাকিস্তান জমানার শুরুতেই বর্বর দমননীতির মুখে পড়ে। দেশের জেলখানাগুলোতে রাজবন্দি বলতে তখন শুধুই বামপন্থি নেতাকর্মী। ‘ঝুটা আজাদি’র উপলব্ধি নিয়ে, সাতচল্লিশ-পরবর্তী সময়ে যারা জনস্বার্থে জনতাকে জাগাতে চেয়ে সংঘবদ্ধ সংগ্রামের ডাক দিয়েছিলেন, তাদের পাইকারি হারে গ্রেপ্তার করে জেলে ঢোকানো হয়। শুধু জেলখানায় বন্দি নন, প্রকৃত অর্থে রাজবন্দিও নন, তারা ছিলেন ঘানি টানা, লাপ্সি খাওয়া, অকারণে নির্যাতিত জেলবন্দি চোর-ডাকাতদের চেয়েও নিম্ন শ্রেণির বন্দি। যারা সরকারের হিসাবে পাকিস্তানবিরোধী, রাষ্ট্রদ্রোহী। তাই জেল-গারদের অন্ধকার কুঠুরিতে আবদ্ধ রেখে লাঠির ঘায়ে বা বুলেটে তাদের মেরে ফেলতে পারলে আপদ যায়। কথায় কথায় ডান্ডাবেড়ি, মোটা পাকা বেতের লাঠির ঘায়ে হাড়মাংস থেঁতলে দেওয়া বা পাগলা ঘণ্টি বাজিয়ে বেধড়ক পেটানো জেলকর্তাদের অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। ঢাকা, রাজশাহী, রংপুর, খুলনা, ময়মনসিংহের কারাগারগুলো সাতচল্লিশ-পরবর্তী কয়েক বছর ধরে অনাচারের পীঠস্থান হয়ে দাঁড়ায়। নাজিমুদ্দিন ও নুরুল আমিন সরকারের জেল প্রশাসন জেলের স্বীকৃত নিয়ম মেনে চলেনি। আর সে অপরাধের জন্য তাদের কোনো রকম জবাবদিহিও করতে হয়নি। কারণ, নাৎসি শাসনসুলভ ওই সব অত্যাচারের কাহিনি সংবাদপত্রে বড় একটা স্থান পায়নি। আর পাকিস্তানি মোহে অন্ধ মানুষও প্রয়োজন বোধ করেনি, কোনো প্রতিবাদ করার। এ দেশের সাতচল্লিশ-উত্তর কয়েক বছরের রাজনৈতিক সংগ্রামের ইতিহাস সঠিকভাবে লেখা হলে, সে সময়ের সংগ্রামী শহীদদের নাম এক এক করে আমাদের সামনে এসে দাঁড়াবে। চিহ্নিত হবে অপরাধী শাসক ও জেল কর্মকর্তাদের নাম। কিন্তু আশ্চর্য যে, আমরা সে ইতিহাস ভুলে গেছি। কোনো মহল থেকে তা মুছে ফেলার চেষ্টাও চলেছে। ঝেড়ে ফেলা হয়েছে, ইতিহাস থেকে কিছু সময় এবং অধ্যায়।
আমাদের সংগ্রামের ইতিহাস শুরু হয়েছে প্রথম ভাষা আন্দোলন থেকে। তৎকালীন রাজনৈতিক নেতা, জেল প্রশাসক, জেল চিকিৎসক প্রমুখের আচরণ দেখে বোঝার উপায় ছিল না, তারা কতটা মানুষ পদবাচ্য। সে সময়কার রাজনৈতিক ইতিহাস তেমন কথাই বলবে। আর জেল-চিকিৎসক? তারা বোধহয় পেশাগত শপথ, নৈতিক কর্তব্য এমনকি মানবিকতার কথাও ভুলে গিয়েছিলেন। যে জন্য ঢাকা জেলে অনশনরত রাজনৈতিক বন্দি শিবেন রায়কে অনশন ভাঙানোর জবরদস্তি করে মেরে ফেলার ঘটনা তাদের বিবেকে আঘাত করেনি। সরকারের ওই জঘন্য অপরাধের বলি শিবেন রায়কে আমরা কি মনে রেখেছি? কিংবা খুলনা জেলে আক্ষরিক অর্থে পিটিয়ে মারা বিষ্ণু বৈরাগীকে? এ হত্যার জন্য মুখ্যমন্ত্রী আইন পরিষদে প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েও জবাবদিহিরও প্রয়োজন বোধ করেননি। করেননি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কিংবা জেলখানা বিষয়ক আইজি। একইভাবে রাজশাহী জেলের খাপড়া ওয়ার্ডে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে সাত রাজবন্দিকে মারার ঘটনারও সুবিচার হয়নি। ঘটনার সময় খাপড়া ওয়ার্ডে আটক রাজবন্দিদের মধ্যে ছিলেন ইতিপূর্বে সংঘটিত নাচোল কৃষক বিদ্রোহের নেতাকর্মী অনেকে এবং বিভিন্ন জেল থেকে আনা কমিউনিস্ট পার্টির নেতাকর্মী। এর আগেও নাচোলে কৃষক আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে সাঁওতাল মাঝি ও কৃষক সমিতির নেতানেত্রীদের ওপর পুলিশি বর্বরতা শিক্ষিত বাঙালি বিবেককে নাড়া দিতে পারেনি। কৃষক নেত্রী ইলা মিত্রের ওপর পৈশাচিক অত্যাচারের ঘটনা প্রায় নিঃশব্দে পার হয়ে গেছে।
একুশের মাসে, একুশের বর্ণাঢ্য উদ্যাপনের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা গণতান্ত্রিক-প্রগতিবাদী পূর্বসংগ্রামের বিশেষ ঘটনা স্মরণ করতে চাই, তাতে একুশের মর্যাদা বাড়বে বৈ কমবে না।’ ১৯৪৮ থেকে ১৯৫০ পূর্ববাংলা জুড়ে পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর দমননীতি এক ভয়াবহ রূপ নেয়। অন্ন, বস্ত্র ও গণতান্ত্রিক অধিকারের দাবিকে বুলেট ও কারাবাসে স্তব্ধ করা হয়। শ্রমিক, কৃষক, ছাত্র ও সাধারণ মানুষের পক্ষে দাঁড়ানো দেশপ্রেমিক কমিউনিস্ট নেতাকর্মীদের ওপর শুরু হয় চরম নির্যাতন; একের পর এক গ্রেপ্তারে ভরে ওঠে পূর্ববাংলার কারাগারগুলো। ব্রিটিশ আমলে রাজবন্দিদের যে বিশেষ মর্যাদা ছিল, মুসলিম লীগ সরকার তা বাতিল করে তাদের ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’ হিসেবে চিহ্নিত করে। ঢাকা ও রাজশাহী জেলে আটক রাজবন্দিরা ১৯৪৯ সালে ধারাবাহিক অনশন ধর্মঘট করেন। প্রথমে ৩০ দিন, পরে ৪১ দিন, ৪৯ দিন এবং শেষবার ৬১ দিন। নানা প্রতিশ্রুতি দিয়েও সরকার বারবার তা ভঙ্গ করে। নির্যাতনের ভয়াবহতায় অনেকে মানসিক ভারসাম্য হারায়, কেউ কেউ মৃত্যুবরণ করেন। ১৯৫০ সালের এপ্রিল মাসে রাজশাহী জেলের সাধারণ কয়েদিরা অনশন শুরু করলে কমিউনিস্ট বন্দিরাও যোগ দেন। ২১ এপ্রিল রাজবন্দিদের প্রতিনিধি আব্দুল হক ও বিজন সেনকে জানানো হয় শাস্তি হিসেবে কয়েকজন বন্দিকে কনডেমড সেলে পাঠানো হবে। খাপড়া ওয়ার্ডের বন্দিরা এ আদেশ প্রত্যাখ্যান করেন। ২৪ এপ্রিল সকালে জেল সুপারিন্টেনডেন্ট এডওয়ার্ড বিল দলবল নিয়ে ওয়ার্ডে প্রবেশ করে, অপমানসূচক মন্তব্যের পর দরজা বন্ধ করে গুলির নির্দেশ দেন। জানালার ফাঁক দিয়ে বন্দুক ঢুকিয়ে গুলি চালানো হয়; রক্তে ভেসে যায় খাপড়া ওয়ার্ড। মোট ৬০ রাউন্ড গুলিতে ঘটনাস্থলেই শহীদ হন হানিফ শেখ, আনোয়ার হোসেন, সুখেন ভট্টাচার্য, দেলোয়ার হোসেন, সুধীন ধর, কম্পরাম সিং ও বিজন সেন। আর বাকি ৩২ জন গুরুতর আহত হন। একুশ আমাদের ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রতীক; তার পূর্বসূরি এই সংগ্রাম আমাদের গণতান্ত্রিক আকাক্সক্ষার উৎস। কারাগারের অন্ধকারে প্রাণ হারানো রাজনৈতিক বন্দি, কৃষক আন্দোলনের নির্যাতিত নেতা এবং রাজশাহী জেলের শহীদদের স্মৃতি ফিরিয়ে আনা মানে, স্বাধীনতার ইতিহাসকে পূর্ণ মর্যাদা দেওয়া। উভয় মিলেই আমাদের জাতিসত্তার ভিত্তি। বিস্মৃত পূর্বসূরিদের স্বীকৃতি দেওয়া মানে, ভবিষ্যতের ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র নির্মাণের পূর্বশর্ত।
লেখক: গবেষক ও কলাম লেখক