প্রস্তাবিত সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে জামায়াত-এনসিপির নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা শপথ নিলেও শপথে অংশ নেয়নি বিএনপির দলীয় সংসদ সদস্যরা। ফলে সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে তৈরি হয়েছে চরম অনিশ্চয়তা।
শপথ না নেওয়ার পেছনে বিএনপির যুক্তি হলো সংবিধানে এই পরিষদের শপথ নেওয়ার বিধান নেই। আর জামায়াত-এনসিপির বক্তব্যÑবিএনপি দুটি শপথ না নিলে সংসদে যাওয়াই তো অর্থহীন। গণভোটে জনরায়ের সঙ্গে প্রতারণা করে শপথ নিতে যাচ্ছে সরকার।
সংবিধান বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিএনপির দাবি যৌক্তিক। তাছাড়া গণভোটের রায়ের কারণে জুলাই আদেশ বাস্তবায়নযোগ্য হলে সংবিধান সংস্কার পরিষদের প্রয়োজনীয়তাই থাকে না। আবার যেসব সদস্য শপথ নিয়েছেন তারা নিজেরাই জুলাই আদেশ অনুযায়ী নিজেরাই সংবিধান বানিয়ে ফেলতে পারেন।
রাষ্ট্রপতির জারি করা জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, গণভোটে হ্যাঁ বিজয়ী হলে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা একই সঙ্গে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও কাজ করবেন। ৬০ সদস্যের কোরাম হলেই এই পরিষদ কাজ করতে পারে। ওই আদেশের ভিত্তিতে যে গণভোট হয়েছে, সেখানে ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়লাভ করেছে।
নির্বাচনের পর সংসদ সদস্যদের শপথের তারিখ ঘোষণার পর থেকেই রাজনৈতিক অঙ্গনে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছিল সংবিধান সংস্কার পরিষদ। বিশেষ করে বিএনপি এই পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেবে কি না, তা নিয়ে আলোচনা জোরালো হয়ে উঠেছিল।
গতকাল মঙ্গলবার বিএনপির নির্বাচিতরা সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেয়নি। তবে জামায়াত-এনসিপির ৭৭ জন নির্বাচিত সদস্য একই সঙ্গে সংসদ সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছেন।
সংসদ ভবনে বিএনপির নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা শপথ নেওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ সাদা ও নীল রঙের দুটি ফরম হাতে নিয়ে বলেন, ‘আমরা কেউ সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হইনি এবং সংবিধানে এখনো এটা ধারণ করা হয়নি। গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হলে সেটা সংবিধানে আগে ধারণ করতে হবে এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যকে কে শপথ পড়াবেন সেটার বিধান করতে হবে। এমন ফরম সংবিধানের তৃতীয় তফসিলে আসবে। সেগুলো সাংবিধানিকভাবে সংসদে গৃহীত হওয়ার পরে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যদের শপথ নেওয়ার বিধান করা যাবে। আমরা সংবিধান মেনে এ পর্যন্ত চলেছি। আশা করি সামনের দিনেও চলব।’
দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ জ্যেষ্ঠ নেতারা তখন সেখানে সামনের সারিতে উপস্থিত ছিলেন। এরপর সালাহউদ্দিন আহমদ দলীয় সদস্যদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘আমি মাননীয় চেয়ারম্যানের নির্দেশে ওনার উপস্থিতিতে আমাদের দলীয় সিদ্ধান্ত জানালাম।’
বিএনপির সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নেওয়ায় এনসিপি দলীয়ভাবে মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠান বয়কট করে। দলটির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেছেন, গণভোটে জনরায়ের সঙ্গে প্রতারণা করে শপথ নিতে যাচ্ছে সরকার।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেছেন, বিএনপি দুটি শপথ না নিলে সংসদে যাওয়াই তো অর্থহীন।
তাদের মতে, জুলাই আদেশে এ ধরনের সুযোগ থাকায় একে ঘিরে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তৈরির আশঙ্কা রয়েছে। এর মধ্যেই মঙ্গলবার গণভোটের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ও ফল স্থগিত চেয়ে হাইকোর্টে রিট হয়েছে।
প্রসঙ্গত, বিএনপি আগে থেকেই ক্ষমতা গ্রহণের পর আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে দলটি সনদের ভিত্তিতে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার কাজ সম্পন্ন করার কথা বলে আসছে।
সংবিধান বিশেষজ্ঞ শাহদীন মালিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিষয়টি নিয়ে এখন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। আগে কখনো এটা ছিল না। ফলে সমাধান কী হবে সেটা বলা মুশকিল।
বিএনপি শপথ না নেওয়ায় কার্যত এটি করার আর সুযোগ নেই বলেই মনে করেন তিনি। তার ভাষায়, যে ৭৭ জন শপথ নিয়েছেন তারা জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে পারেন সেই আদেশ বলে। কিন্তু তেমন কিছু করার জন্য সংঘাতময় পরিস্থিতি তৈরি করতে চাইলে সেটি আর জনগণের সমর্থন পাবে না।
শাহদীন মালিক বলেন, জুলাই আদেশ অনুযায়ী গণভোট ছিল সংবিধান সংশোধনের। এখন সেই গণভোটে জেতার কারণেই যদি এটি বাস্তবায়নযোগ্য হয়ে যায়, তাহলে এমনিতেও আর সংবিধান সংস্কার পরিষদের প্রয়োজন হয় না।
তার ভাষায়, বিএনপি যে যুক্তিতে শপথ নেয়নি তা যৌক্তিক। কারণ তারা কীভাবে শপথ নেবে তা সংবিধানে বলা নেই। জুলাই সনদের এমন অনেক কিছুই বর্তমান সংবিধান পরিপন্থী। কমিটিতে কোনো আইনজীবী রাখা হয়নি। যে ৬ জন ছিলেন তাদের কেউই আইনজীবী নন। ফলে এসব বিষয়ে দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার অভাবেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। কাজটা চিন্তাভাবনা করে করলে এমন সংকট তৈরি হতো না।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরসেদও প্রায় একই কথা বলেছেন। গতকাল তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, যা সংবিধানে নেই তাতে শপথ নেওয়া আর না নেওয়া তো একই কথা। বিএনপি এখানে শপথ না নিলেও কোনো আইনগত জটিলতা থাকবে না। যারা শপথ নিয়েছেন তাদের ওই শপথেরও কোনো ভিত্তি নেই। এটা আদালতে গেলে বাতিল হয়ে যাবে। এ নিয়ে যেটা হচ্ছে তা রাজনৈতিক বিতর্ক।
জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ অনুসারে সংবিধান সংস্কার পরিষদের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ৬০ জন পরিষদ সদস্যের উপস্থিতি প্রয়োজন হবে।
প্রসঙ্গত, ২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর গেজেট হওয়া ওই আদেশে বলা হয়েছে, সংসদ নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর ত্রিশ পঞ্জিকা দিবসের মধ্যে যে পদ্ধতিতে জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করা হবে অনুরূপ পদ্ধতিতে পরিষদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করা হবে।
এতে বলা হয়েছে, সংবিধান সংস্কার-সংক্রান্ত কোনো প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য পরিষদের মোট সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে সিদ্ধান্ত গৃহীত হবে এবং অন্য বিষয়ে উপস্থিত ও ভোটদানকারী সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে পরিষদের সিদ্ধান্ত গৃহীত হবে।
মনজিল মোরসেদ বলছেন, এ আদেশ মানলে এসব নিয়ম অনুযায়ী জামায়াত-এনসিপি নিজেরাই পরিষদ আহ্বান করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এমনকি নতুন সংবিধানও বানিয়ে ফেলতে পারেন।
জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ পরিষদের গঠন সম্পর্কে বলা হয়েছে, নির্বাচিত প্রতিনিধিরা একই সঙ্গে জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে এবং এই আদেশ অনুসারে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
এই ধারায় আরও বলা হয়েছে, সংবিধান সংস্কার পরিষদ প্রথম অধিবেশন শুরুর তারিখ থেকে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে জুলাই জাতীয় সনদ এবং গণভোটের ফল অনুসারে সংবিধান সংস্কার সম্পন্ন করবে এবং তা সম্পন্ন করবার পর পরিষদের কার্যক্রম সমাপ্ত হবে।
মনজিল মোরসেদ বলছেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশের মধ্যে পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করে তোলা বীজ রাখা হয়েছে এবং তার মতে, এটি করাই হয়েছে দেশে আবারও অনির্বাচিত সরকার আনার প্রেক্ষাপট তৈরির জন্য।
তিনি বলেন, নির্বাচন ঘোষণার পর থেকেই দেশ সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় চলে এসেছে এবং প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভা ও এমপিদের শপথ হয়েছে সংবিধান অনুযায়ী।
বাংলাদেশের বর্তমান সাংবিধানিক ব্যবস্থায় সংসদ বহাল না থাকা অবস্থায় রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ বা নতুন আইন জারি করা হলে তা সংসদ বহাল হওয়ার পর উত্থাপনের ৩০ দিনের মধ্যে অনুমোদন করতে হয়। না হলে সেটি বাতিল হয়ে যায়। কিন্তু রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ জারি করে জুলাই বাস্তবায়ন আদেশের যে গণভোট হয়েছে, সেক্ষেত্রে কী হবে, সেটি পুরোপুরি পরিষ্কার নয়।
আইনের ব্যাখ্যা দিয়ে মনজিল মোরশেদ বলছেন, ‘যে অধ্যাদেশে গণভোট হয়েছে, সেটা হয়েছে রাষ্ট্রপতির নামে জারি করা একটি আদেশের ওপর নির্ভর করে। এভাবে অধ্যাদেশ হতে পারে কি না, সেটি নিয়ে আইনি প্রশ্ন রয়ে গেছে। আবার সেই অধ্যাদেশকে বা গণভোটকে বৈধতা দিতে হলে সংসদে উত্থাপন করে পাস করাতে হবে। বিএনপি এখন সেটা সংসদে তুলবে কি না, সেটা দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে।’
তিনি আরও জানান, রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ জারি করার ক্ষেত্রে সংবিধানে কিছু সীমাবদ্ধতা বেঁধে দিয়েছে। সংবিধানে যা নেই অর্থাৎ সংসদ যে বিষয়ে আইন করতে পারে না বা সংবিধানের কোনো বিধান পরির্বতন হয়ে যায়, সেসব বিষয়ে রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ জারি করতে পারেন না।
সংবিধানে যেহেতু গণভোটের বিধান নেই, তাই এ বিষয়ে অধ্যাদেশ জারি করার এখতিয়ার রাষ্ট্রপতির নেই বলে মনে করেন মনজিল মোরশেদ। ফলে এসব বিষয় নিয়ে আইনি প্রশ্ন উঠতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
এর মধ্যেই মঙ্গলবার গণভোটের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ও ফল স্থগিত চেয়ে রিট আবেদন করেছেন একজন আইনজীবী। সেই রিটে গণভোট বাতিল চাওয়া হয়েছে।
মনজিল মোরসেদ বলছেন, সংবিধানে সংস্কার আনার বিষয়ে বিএনপি তাদের যে পরিকল্পনার কথা আগে জানিয়েছিল সে অনুযায়ী সংসদে বিল উত্থাপনের মাধ্যমে সংবিধানের প্রয়োজনীয় পরিবর্তন তারা করতে পারবে এবং এটিই হবে সাংবিধানিক পন্থা। এর অন্যথা কিছু হলে সেটি জাতীয় স্থিতিশীলতার জন্যই হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।