বর্ণমালার পথ ধরে স্বাধীন মানচিত্র

আপডেট : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২:২৭ এএম

‘ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়’ আব্দুল  লতিফের লেখা ও সুরের এই গানের আর্তি কেবল একটি পঙ্ক্তি নয়, বরং ছিল যমুনার ঢেউয়ের মতো উত্তাল এক জাতির শোষিত হৃদয়ের হাহাকার ও দ্রোহের সম্মিলিত গর্জন। অন্যদিকে, কালজয়ী সাংবাদিক ও কলামিস্ট আবদুল গাফফার চৌধুরী, যিনি ১৯৫২ সালের সেই রক্তঝরা বিকেলের অব্যবহিত পরেই ভাষাশহীদদের স্মরণে লিখেছিলেন ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’। আজ যখন আমরা পেছন ফিরে তাকাই, তখন কেবল সেই রাজপথের হাহাকার নয়, বরং এক জাতির পুনর্জন্মের ইতিহাস দেখতে পাই। কেন আমরা নিজস্ব পরিচয়ের জন্য উতলা হয়েছিলাম, তার উত্তর নিহিত সাংস্কৃতিক স্বকীয়তায়। যখন ফরমান জারি করা হলো, ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’, তখন পূর্ব বাংলার ৫৬ শতাংশ মানুষের হৃদয়ে প্রথম আঘাত লাগে। আমরা বুঝতে পেরেছিলাম, ভাষা কেড়ে নেওয়া মানে জাতির ইতিহাস, স্বপ্ন আর স্বকীয়তাকে মুছে দেওয়া। শেকড়ের গন্ধই নিজস্ব পরিচয় আনে। এই গন্ধ আমরা খুঁজে পেয়েছি ভাটিয়ালির সুরে, নকশিকাঁথার বুননে আর ধানের শীষে বাতাসের নাচন দেখে। বাঙালি উপলব্ধি করেছিল, যদি নিজের ভাষায় কথা বলা না যায়, তবে এ মাটির সঙ্গে আমাদের যে নাড়ির টান, তা  বিচ্ছিন্ন হবে। এই আত্মপরিচয়ই আমার অস্তিত্ব। যেখানে মিশে আছে হাজার বছরের সমৃদ্ধ ঐতিহ্য ও দৈনন্দিন জীবন পরিচয়।

১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ছিল বৃহস্পতিবার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে যখন ছাত্রসমাজ বেরিয়ে এলো, তখন তাদের কণ্ঠে ছিল না কোনো ভয়, ছিল কেবল বর্ণমালা রক্ষার তীব্র আকাক্সক্ষা। সেই মিছিলে যখন পুলিশ গুলি চালায় তখন রফিক, সালাম, বরকত আর জব্বারের রক্তে ভিজে গেল বাংলার রাজপথ। সেই প্রথম পৃথিবীর ইতিহাসে কোনো জাতি মায়ের ভাষার জন্য রাজপথ রঞ্জিত করল। ভাষা আন্দোলন কেবল একটি সাংস্কৃতিক আন্দোলন ছিল না, এটি ছিল বাঙালির রাজনৈতিক স্বাধিকারের প্রথম সোপান। ১৯৫৪-র যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন থেকে শুরু করে ১৯৬৬-র ছয় দফা এবং ১৯৬৯-র গণঅভ্যুত্থান আন্দোলনের প্রতিটি বাঁকে জ্বালানি জুগিয়েছিল বাহান্নর তেজ। একুশ আমাদের শিখিয়েছিল, কীভাবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে দাঁড়াতে হয়। এই চেতনার চূড়ান্ত রূপ আমরা দেখি,  ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে। ৩০ লাখ শহীদের রক্ত আর ২ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা ছিল মূলত ভাষারই জয়গান। আমাদের আত্মপরিচয় লৈঙ্গিক বা ধর্মীয় পার্থক্যের ঊর্ধ্বে। এটি একটি ভাষাতাত্ত্বিক পরিচয়, যা  ললাটে ‘বাঙালি’র তিলক এঁকে দিয়েছে। এই পরিচয়ের জোরেই আমরা বিশ্বদরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছি। ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো যখন একুশে ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে, তখন সেই রক্তের ঋণ বিশ্বজনীন স্বীকৃতি পায়। আজকের গ্লোবালাইজেশনের যুগে দাঁড়িয়েও যখন আমরা ইংরেজি বা অন্য ভাষার দিকে ঝুঁকে পড়ি, তখন শেকড়ের টানই আমাদের আবার ফিরিয়ে আনে।

রবীন্দ্র-নজরুল-জীবনানন্দের ভাষা আমাদের আত্মার খোরাক জোগায়, যা অন্য কোনো ভাষায় খুঁজে পাওয়া অসম্ভব। একটি জাতির পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার প্রথম ধাপ হলো তার নিজস্বতা আঁকড়ে ধরা। বাঙালি সেই কাজটি করেছিল অসীম সাহসে। যখন কোনো তরুণ বিদেশে বসে বাংলায় তার মায়ের সঙ্গে কথা বলে, কিংবা যখন কোনো বাউল একতারা হাতে গ্রামের মেলায় গান ধরে, তখন সেখানে স্পন্দিত হয় সেই হার না মানা অস্তিত্বের গল্প। ভাষাই আমাদের দিয়েছে একটি পতাকা এবং সার্বভৌম কণ্ঠস্বর। পরিচয়হীনতার সংকটে বাংলা ভাষাই আমাদের ধ্রুবতারা। ইতিহাস সাক্ষী দেয়, যারা নিজের ভাষাকে ভুলেছে, তারা কালক্রমে বিলীন হয়ে গেছে। কিন্তু বাঙালি তার শেকড় চিনেছিল বলেই, আজ বিশ্ব মানচিত্রে লাল-সবুজের অস্তিত্ব এত উজ্জ্বল। আমাদের আত্মত্যাগ আজ সারা বিশ্বের কাছে এক অনুপ্রেরণার উৎস। ১৯৩টি দেশে আজ একুশে ফেব্রুয়ারি পালিত হচ্ছে ভাষার প্রতি মমত্ববোধ জাগিয়ে তুলতে। এটি কেবল বাঙালির উৎসব নয়, বরং এটি পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী এবং বিলুপ্তপ্রায় ভাষাগুলোর বেঁচে থাকার লড়াইয়ের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। যখনই কোনো অপশক্তি আমাদের সংস্কৃতিকে বিকৃত করতে চেয়েছে, তখনই বাংলা ভাষা আমাদের প্রতিরোধের ভাষা হয়ে গর্জে উঠেছে। আমাদের বর্ণমালার বাঁকে লুকিয়ে আছে, এক একটি সংগ্রামের ইতিহাস। অ, আ, ক, খ এগুলো কেবল বর্ণ নয়, এগুলো মায়ের চিবুক স্পর্শ করা শীতল পরশ। যখন কোনো শিশু প্রথম তার আধো আধো বোল ফুটিয়ে ‘মা’ বলে ডাকে, তখন সেখানে ধ্বনিত হয় সহস্র বছরের অমর ঐতিহ্য। এই ধ্বনিই আমাদের সার্বভৌমত্বের ঘোষণা। ডিজিটাল যুগে প্রযুক্তি আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভিড়েও বাংলা ভাষাকে আমরা পৌঁছে দিচ্ছি নতুন উচ্চতায়। রোমান হরফে বাংলা লেখার চেয়ে, স্বকীয় লিপিতে মনের ভাব প্রকাশ করাই আমাদের অহংকার। তরুণ প্রজন্ম যখন ল্যাপটপ বা মোবাইলের কি- বোর্ডে বাংলা বর্ণমালা টাইপ করে, তখন শহীদদের আত্মা হয়তো এক অপার্থিব তৃপ্তি পায়। সাংস্কৃতিক এই মেলবন্ধন আমাদের শিখিয়েছে পরমতসহিষ্ণুতা। বাংলা ভাষা কেবল আমাদের নয়, এটি হয়ে উঠেছে বিশ্বের সেই সব মুক্তিকামী মানুষের কণ্ঠস্বর- যারা নিজ ভাষায় গান গাইতে চায়। আমাদের একুশ আজ তাই বৈশ্বিক ভ্রাতৃত্বের এক মহান স্তম্ভ, যা মানুষের সঙ্গে মানুষকে মেশাতে শিখায়, কোনো প্রাচীর তুলতে নয়। বইমেলা থেকে শুরু করে চৈত্রসংক্রান্তির গান, প্রতিটি উৎসবে ভাষার উদযাপন। অমর একুশে বইমেলার প্রতিটি ধূলিকণা সাক্ষী দেয় আমাদের জ্ঞানতৃষ্ণার। সহস্রাধিক নদীর দেশ যেমন আমাদের শরীর গঠন করেছে, তেমনি বাংলা ভাষা আমাদের মননকে করেছে ঋদ্ধ ও পরিশিলিত। অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন থাকার দীক্ষা আমরা ভাষা থেকেই পেয়েছি। যখনই সত্য প্রকাশের পথ রুদ্ধ হয়, তখনই বাংলা ভাষা হয়ে ওঠে কলম আর কণ্ঠের তীক্ষ হাতিয়ার। এই ভাষাই আমাদের মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে শেখায়। বাংলা ভাষা কেবল ব্যাকরণের কাঠামো নয়, এটি আমাদের চেতনার অরণ্যে এক চিরস্থায়ী সুবাস।

একুশে ফেব্রুয়ারিতে যখন ভোরের কুয়াশা চিরে প্রভাতফেরির সম্মিলিত সুর ভেসে আসে, তখন মনে হয় পূর্বপুরুষরা আজও আমাদের কানে ফিসফিস করে বলেন- ভাষার অমরত্বের কথা। একুশ আমাদের রক্ষাকবচ। আমাদের উৎসবগুলোও বাংলা ভাষারই প্রতিচ্ছবি। পহেলা বৈশাখের রমনার বটমূল থেকে শুরু করে নবান্নের পিঠা উৎসব সবখানেই বাংলা ভাষা যেন এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। এই শক্তিই আমাদের শিখিয়েছে যে, অন্যের ভাষাকে শ্রদ্ধা করতে হলে, নিজের ভাষাকে ভালোবাসতে হয়। ভাষার প্রতি অনুরাগ কেবল আবেগ নয়, এটি একটি দায়িত্ব। বর্তমান প্রজন্মের কাছে আমাদের প্রাণের ভাষাকে শুদ্ধভাবে পৌঁছে দেওয়া এবং প্রযুক্তির প্রতিটি শাখায় বাংলার পদচারণা নিশ্চিত করাই এখন মূল লক্ষ্য। এই লক্ষ্যই আমাদের একুশের চেতনাকে চিরকাল প্রাসঙ্গিক করে রাখবে। বাঙালির প্রতিটি নিঃশ্বাস যেখানে মাটির সোঁদা গন্ধ নেয়, সেখানে বাংলা ভাষা কেবল উচ্চারণ নয়, বরং তা জীবনের সুর। আমাদের হাসি-কান্না, আনন্দ-বেদনা এবং দ্রোহের প্রতিটি প্রকাশ ভাষার অবদানে ঋদ্ধ। তাই এই ভাষাকে বাদ দিয়ে আমাদের অস্তিত্বের কথা কল্পনা করা অসম্ভব। ভাষা আমাদের আত্মমর্যাদার প্রতীক, যা আমাদের শিখিয়েছে পরনির্ভরশীলতা ত্যাগ করে আপন শক্তিতে বলীয়ান হতে। যখন কোনো কবি নিভৃতে বসে একটি পঙ্ক্তি রচনা করেন বা কোনো বিজ্ঞানী বাংলায় তার গবেষণার সারাংশ প্রকাশ করেন, তখন আমাদের জাতিসত্তা আরও একধাপ পূর্ণতা পায়। এই সৃজনশীলতার মধ্যেই নিহিত ভাষার প্রাণভোমরা। সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার রক্ষায় প্রতিটি নাগরিকের সচেতনতা আজ সময়ের দাবি। ভাষাদূষণ রোধ এবং প্রমিত বাংলার চর্চা নিশ্চিত করার মাধ্যমে, আমরা শহীদদের প্রতি শ্রেষ্ঠ সম্মান প্রদর্শন করতে পারি।

ভাষা কেবল উচ্চারণের বিষয় নয়, এটি একটি জাতির মনন এবং মনস্তত্ত্বের সূক্ষ্ম প্রতিফলন, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রবাহিত হয়। শাশ্বত বাংলার জয়যাত্রায় আমাদের ভাষা হোক সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। বিশ্বায়নের প্রবল স্রোতেও স্বকীয়তা বজায় রেখে আমরা যেন বলতে পারি, বাংলা আমাদের অহংকার। আমাদের প্রতিটি কাজ এবং চিন্তায় যদি বাংলার ছোঁয়া থাকে, তবেই ১৯৫২ সালের সেই রক্তদান সার্থক হবে এবং আমাদের জাতিগত পরিচয় হবে সুদৃঢ়। একুশের চেতনা কেবল বছরের একটি দিন নয়, বরং এটি আমাদের জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের চালিকাশক্তি। ভাষাই আমাদের একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে এই যে সুরের ধারা বয়ে চলেছে, তা কেবল তখনই সার্থক হবে- যখন আমরা উত্তরসূরিদের হৃদয়ে বাংলার প্রতি মমত্ববোধ জাগিয়ে তুলতে পারব। আমাদের কৃষ্টি আর সংস্কৃতি যেন কেবল ইতিহাস গ্রন্থে সীমাবদ্ধ না থেকে প্রতিদিনের অভ্যাসে পরিণত হয়, তবেই আমাদের জাতীয় সংহতি বজায় থাকবে। আমাদের এই অহংকার, আমাদের এই পরিচয় কোনো শক্তির কাছেই কখনো ম্লান হওয়ার নয়। কারণ, আমাদের শিরায় শিরায় বইছে সেই বর্ণমালার উত্তরাধিকার। বাংলা আমার মা, বাংলা আমার জীবনশক্তি। এই ভাষার প্রতিটি বর্ণ রক্তকণিকার সঙ্গে মিশে আছে। মা, মাটি আর মানুষের অস্তিত্বকে ধারণ করে এই ভাষা আমাদের চেতনার মূলে সতত প্রবহমান। যে কারণে প্রতিনিয়ত আমাদের হৃদয়ে ধ্বনিত হয়- ‘বাংলা আমার চৈতন্য, বাংলা আমার ঋণ/ এই বাংলার দৃষ্টি থাকুক, আজন্ম নিদ্রাহীন।’

লেখক: সিইও ইটিসি ইভেন্টস লিমিটেড

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত