কবির মায়ের ভাষায় লেখা

আপডেট : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৩:২৯ এএম

পুনঃপাঠ
শামসুর রাহমান

এই মাতোয়ালা রাইত

 

হালায় আজকা নেশা করছি বহুত। রাইতের

লগে দোস্তি আমার পুরানা, কান্দুপট্টির খানকি

মাগীর চক্ষুর কাজলের টান, এই মাতোয়ালা

রাইতের তামাম গতরে। পাও দুইটা কেমুন

আলগা আলগা লাগে, গাঢ়া আবরের সুনসান

আন্দরমহলে হাঁটে। মগর জমিন বান্ধা পাও

 

আবে, কোন্ মামদির পো সামনে খাড়ায়, যা কিনার,

দেহস না হপায় রাস্তায় আমি লামছি, লৌড় দে;

না অইলে হোগায় লাথ্থি খাবি, খাবি চটকানা গালে।

গতরের বিটায় চেরাগ জ্বলতাছে বেশুমার।

 

আমারে হগলে কয় মইফ্ফার পোলা, জুম্মনের

বাপ, হস্না বানুর খসম, কয় সুবরাতি মিস্ত্রি।

বেহায়া গলির চাম্পা চুমাচাট্টি দিয়া কয়, ‘তুমি

ব্যাপারী মনের মানু আমার, দিলের হকদার।’

 

আমার গলায় কার গীত হুনি ঠাণ্ডা আঁসুভরা

আসলে কেউগা আমি, কোনহানতে আইছি হালায়

দাগাবাজ দুনিয়ায়, কৈবা যামু আখেরে ওস্তাদ

চুড়িহাট্টা, চানখাঁরপুল, চকবাজার, আশক

জমাদার লেইন, বংশাল; যেহানেই মকানের

ঠিকানা থাউক, আমি হেই একই মানু, গোলগাল

মাথায় বাবরি; থুতনিতে ফুদ্দি দাড়ি, গালে দাগ,

যেমুন আধুলি একখান খুব দূর জামানার।

 

আমার হাতের তালু জবর বেগানা লাগে আর

আমার কইলজাখান, মনে অয়, আরেক মানুর,

গতরের বিতরে ফাল পাড়ে; একটুকু চৈন নাই

মনে, দিল জিঞ্জিরার জংলা, বিরানী দালান। জানে

হায়বৎ জহরিলা কেঁকড়ার মতন হাঁটা-ফিরা

করে আর রাইতে এমুনবি অয় নিজেরেও বড়

ডর লাগে, মনে অয় যেমুন আমিবি জমিনের

তলা থন উইঠা আইছি বহুত জমানা বাদ।

 

 

এ-কার মৈয়ত যায় আন্ধার রাইতে? কোন ব্যাটা

বিবি-বাচ্চা ফালাইয়া বেহুদা চিত্তর অইয়া আছে?

একলা কাঠের খাটে বেফিকির? নোওয়াব যেমুন,

বুঝছোনি হউরের পো, এলা আজরাইল আইলে

আমিবি হান্দামু হ্যাষে আন্ধার কব্বরে। তয় মিয়া

আমার জেবের বিতরের লোটের মতই হাচা মৌত।

 

এহনবি জিন্দা আছি, এহনবি এই নাকে আহে

গোলাব ফুলের বাস, মাঠার মতন চান্নি দিলে

নিরালা ঝিলিক মারে। খোওয়াবের খুব খোবসুরৎ

মাইয়া, গহীন সমুন্দর, হুন্দর পিনিস আর

আসমানী হুরীর বারাত; খিড়কির রৈদ, ঝুম

কাওয়ালীর তান, পৈখ সুনসান বানায় ইয়াদ।

এহনবি জিন্দা আছি, মৌতের হোগায় লাথথি দিয়া

মৌত তক সহিসালামত জিন্দা থাকবার চাই।

 

তামাম দালান কোঠা, রাস্তার কিনার, মজিদের

মিনার, কলের মুখ, বেগানা মৈয়ত, ফজরের

পৈখের আওয়াজ, আন্ধা ফকিরের লাঠির জিকির

হগলই খোওয়াব লাগে, আর এই বান্দাবি খোওয়াব!

পুরান ঢাকা

 

হাফিজ রশিদ খান

বেঅফা

শোগে পরান পাডি যা’র

আঁর কথা কেউ ন র্হ আর

অঘাডত্ ঘাড গরিলাম, অ-পথত্ পথ

দেশ-বিদেশর টিঁয়া জুগাই

কত গইল্লাম মিন্নত

 

দেশর ভিতর দেশর চেঁ’রা বদলাই দিলাম

চকচইক্যা বেয়াগ গাড়ি লই-লই

আইলাম আর গেলাম।

 

রিসোর্ট বানাই জঙ্গল কাডি

এডের ভিতর শীতলপাডি

বিছাই-বিছাই তোঁয়ারা সুগর ঘুম য’র

আঁর কথা ত ন’ ল‘র!

চট্টগ্রাম

মাহবুব হাসান

সে বেহুঁশ নাগর

 

গতরে হান্জা বেলের আগুন জ্বালইয়া তুমি

পরী ক্যান অইল্যা?

তুমারে দেইখ্যা তো মন ভরে না রে

আমি কি খামাখাই চাইয়া থাহি কামচোর ভাবের ভাও,

বিহানে উইঠা দেহি তুমার লাহান এক ফাও বেডা

খারায়া খারায়া ফুচকি দেয় আন্দার গরে

তারে দেকবার নাগে ক্যাইলা এ্যাক নগর নাগর

নাকি হ্যায় ইতর এ্যাক বেগানা মানুষ

তার হুঁশ কম নইলে কি উঁকি দেয় আমার ’পর?

 

গতরে গতর মিশে য্যান পানির শয়ন

খাদ্য খাই, চুমা খাই, ধানকাটা কাঁচির মতন

কোদালের কোপ য্যান খাবলে তুলে আমার সতর,

উদলা গা বুক দেহি আইটাই করে,

ইডা কিয়ের দশা, কোন বাগডাসে ধরলো আমারে,

চিনি না তাহার রূপ,

হে চইড়া আছে আমারই সোন্দর পরাণে!

টাঙ্গাইল

 

ওমর কায়সার

কলেরগানত

 

নিশি রাইতুত উদাউদি

ফরান যারগুই ফাডি

যেন্ কি আঁর সিনার উদ্দি

হনে যারগুই হাডি।

 

চান্নি ফরে দুইন্যা ভাসের

গাছত ফুডের ফুল

ভরজোয়ারত ডুবি গেইয়ি

সুর দইরগার কুল

 

হারে হইয়ুম, হন উনিবু

মনর দুঃখ মনত

আঁর কষ্ট বাজের আঁর

নিজর কলরগানত।

চট্টগ্রাম

 

দিলারা হাফিজ

বুজি গো

 

এহনও তুমার লাইগ্যা মনডা আঁকুপাঁকু করে বুজি,

গুইদা কালে তুমারে দেইখ্যা ফ্যাল ফ্যালিয়া চাইয়া থাকতাম,

কত ডক আছিলা তুমি

তুমার গতরডা আছিলো দুধের মতো ধলা

আর চাঁন-জুসনার নাগাল ফকফকা,

কালা কাজলের চোক দুইডা তুমার

কত কতা কইতো হারাবেলা

 

তুমি হ্যাইসলে ডালিমের কুঁয়া খুইল্যা পড়তো

কতজনে বিয়া করতে চাইছিল

কাউরে বিয়া কল্লা না,

দ্যাশে মুক্তি যুদ্ধ আইলো, তুমিও ঝাপাইয়া পল্লা

কুনে যে চইল্যা গ্যালা যুদ্ধের নয় মাসে

কেও তুমারে খুঁইজ্যাও পাইলো না।

বিজয়ের দিনে হ¹লে ফিরা আইলো,

তুমি আইল্যা না।

পরে হুনলাম, পাকিরা তুমারে নির্যাতন কইরা

মাইরা ফালাইচে।

এহন এ্যালাকার মাইনষে কয়,

তুমি বীরঙ্গনা নারীর খ্যাতাব পাইচো।

 

এ্যাতে কার কি অইচে, বুজি?

 

তুমার মায় কাঞ্চি কোনাত বইয়া

কান্দে, আর কান্দে খালি, কান্দে

চোক দুইডারে আন্দা কইরা ফালাইচে!

 

বছর বছর বিজয়ের দিনডা আইলেই

বুজি, তুমার কত কতা যে মনে পড়ে

হুদা আমি না, বেবাকেই তুমার কতা কয়॥

মানিকগঞ্জ

ফরহাদ নাইয়া

বাড়ি

চুলায় রানতেছি ঘর

সেই ভালো তুমি আমার পর

জানলা গইলা ঝোল

বাপের শরীর সিদ্ধ হয় না

পাষাণ গন্ডগোল।

মা আমার নুনের মতো

পানিতে যায় গলে

ছোট্ট বোন আমেনারে

লইয়া পিঠের তলে

ঘরের কপাট টগবগাইয়া

ভাইসা ওঠে জলে।

কাঁথা বালিশ তেলে ভাজা

আর মরিচ মাখা ওসসা

একটুখানি কসাইতেই

ভাইসা ওঠে নুরজাহানের গোসসা

এবার বোনের কথা বলি

বুইনটার আমার জীবন সিদ্ধ

ফুটা পাইলার তলি

আর আছে এক নানি

প্যাজ মরিচে মিইশা যাওয়া

 জীবন পানি পানি।

বরগুনা 

মুস্তাফিজ শফি

তোর নামে তবু মুই জাগি

জলমল জুনাখ রাইত শরমিন্দা ফাওয়ে পাড়া দিলে উঠানো আমার

আমিতো ফাগল-ফানাফিল্লা চান্দর লাখান মুখখানা লইয়া তোর

চউকর সামনে দেখি দুলি দুলি যায় পূবর বাড়ির দুইচালা পূজা ঘর

কইলজার ভিতর টান দিয়া যায়, আঙরার মতোন অন্তর ছারখার।

 

খিড়কি খুলে দূরর মছিদও ডাক দেয় হুনি ইবাদত বন্দেগির নামে

না পূজা, না নমাজ কিছই অয় না আমার এই পুড়া জিন্দেগিতে

তুইতো জানছ শিউলি, এই বুক ফানাফানা কার ফিরিতিতে

কার নামে উজান বাই, কার নামে ভিড়াই নাও শরীলর ঘামে।

 

এই ফিরিত বুঝে না জুনাখ, দিলে শুধু মরণের ঘাই দিয়া যায়

সবই মুই টের ফাই, তবু তোর নামর জিকিরে বান্ধি বাউলা মন

তোর নামে নীশি রাইতে অছিন ফুল ফুটে, আওর ডাকে আয়

আমার অয়না যাওয়া, সবকিছু যায় ভাসি গাঙর পানির মতোন।

 

কিতা দোষ আছিল মোর, জানি না কিতা দোষে অইলামরে বিবাগী

কেউ নাই, কিছু নাই চান্দর আলোয় তোর নামে তবু মুই জাগি।

সিলেট

 

পরাগ রিছিল

আমানি খুসুক

 

না’সংখো হা’গিল সাকখো

     নিক্কেত না

        বা’সিকিন আঙা নেংআ

 

আমা আগানা

 

হুনোনিন আমা

     খু’রিও রাআই খুদ্দুমা

        সিন্নিঙা খু’সুক আমানিখো।

 

মায়ের কথা

 

তোমাদের পৃথিবীর

     মুখ দেখাতে

         কত যে কষ্ট হয়েছে

 

বলেছিলেন মা...

 

তারপর মায়ের

     কোলে চুমুতে

         শিখেছি কথা মাতৃভাষার।

গারো ভাষার কবিতা

ও বাংলায় অনুবাদ

এথেন্স পাটোয়ারী

হাসপাতাল

 

হইল্যা হইল্যা ঢাকা শঅর মুয়ের মইধ্যে আছিলো হানি কতাডা।

হোলাহাইন আঁরে হানি কই ডাকতো ‘ওই হানি’

আঁরে চেতাইতো আঁই চেইত্তাম না।

আঁই দেখতাম বে¹ুনের মুয়ে মুয়ে আ¹োও মা’র মুখ, মা’র কতা।

 

হোলাহাইন গীত ধইরতো আঁরে ঘিরি

                                       ‘রাম, শ্যাম, যদু, মধু

                        জানি হানি মনের রইছে কোন বধূ।’

 

ইয়ানো হানি দুই টেঁয়্যাই কিনোন লাগে।

আ¹োও মা কইছে, বইশাঘ মাইয়া রইদে হাতোর হরাণ যদি ধড়হরায় হ্যাতেরে হানি দিতো অয়, হানি অইলো হাতোরের দম।

আঁর এই ঢাকা শঅর, ইয়ানো দম কিনোন লাগে, বাঁইচ্চা থাওন কিনোন লাগে।

 

আঁর ঢাকা শঅর ভাল্লাগে না।

ইয়ানের মানুষ বে¹ুন অইছে হাত্তুর

আর এ্যাই হাত্তুর এগুনের ভাষা অইছে স্পোকেন ইংলিশ।

আঁই এইসব ইংলিশ ফিংলিশ উরপে খাঁড়াইতাম হারিনা।

আঁর ঠাংঙও হিয়াইল্লা হিচোল খাই হড়ি যায়,

আঁ¹ো মা’র কতার উরপে।

 

আঁই অন থাই উত্তরমি গ্যারাম ম্যালা দূর

আর কাছে মনে অয় আ¹ো গ্যারাম ইজ্জা

এক্কান হাসপাতাল, হিয়ানো আর মারে রাই আঁই হতিবার।

নোয়াখালী

 

দিপংকর মারডুক

কইতে দাও দুঃখ্যের মরা

 

কিয়া ভাবর? হে বসন্ত অনেক দূর!

হথের যত হেম-হিরিতি আছে হারাইবে বলে

দুঃখ্যের মরা দিও হ্যাতেরে। বাইরে যা দুনিয়া

কোন সময় ছোঁয় আগুন কিংবা ঘোষণা করণের আগে

হিম-ঠাণ্ডা-শীতল যৌনতার সুখ

হগল কিছুই ন্ডর মাপনের স্কেলে হরিণচরিত মানস;

কইতাম হারি, যাইবেল্লাই প্রত্যক্ষ কোনো বৃক্ষ এবং

হুরা বৈদ্যুতিক তরঙ্গের সম্পর্ক স্থাপন হড়ি আছে,

হ্রয়াস ও হ্রচ্ছায়ায় তুঁই কুয়ার বিন্যাস।

আন্ধার রাইতে যে সম্ভাবনাসহ আরোপিত কইচ্ছি

মুখোস্থ বাদামপাতার রইদে মাথা কাডি গেছে তাঁর;

ছুঁড়ি মারো দিগন্তরেখা, গ্যারামে শেষ  আর

ইয়ানে ইক্কিনি বাতাসের হাগুন চৈত্র মাস।

            ফেনী

শারদুল সজল

এ ভাষা আমার

 

এ ভাষা আমার প্রথম সুর, প্রথম নিঃশ্বাসের উদিত ভোর

দুচোখে চেয়ে দেখা মায়ের মুখের অপলক নূর

 

এ ভাষা আমার প্রিয় ছবি, শ্যামল মায়ার সুশীতল ঘনছায়া

হিজলতলে পাটিঘুম-গল্পে আনন্দে গান গাওয়া

 

এ ভাষা আমার হাসিমাখা মুখ, বাল্য-বাংলার বধূ চিরসবুজ মাঠ

 

নকশীকাঁথার ওমপ্রিয়তার জড়ানো শস্য কোমল পাঠ

 

এ ভাষা আমার ফুল ও ফসলে কুয়াশা শীতে মিষ্টিমধুর রসে

গ্রীষ্ম হেমন্ত শীত বসন্ত অগ্রহায়ণ বর্ষা মিশে  

 

এ ভাষা আমার মাটি মানুষে তৃষিত আত্মার শান্তি সজলপুর

চাষি, চাষাবাদ আমি সজীবন স্বপ্ন সমধুর!

 

এ ভাষা আমার রক্তে ফুটানো সরব বর্ণমালা

বুকের পাঁজরে তুলে রাখা মা, মা, প্রিয় পঙ্তিমালা

 

এ ভাষা আমার অমৃত কথা নদী অমৃত প্রাণ

অমৃত প্রাণের সুরভী অমৃত গান

 

এ ভাষা আমার ফুলের সুবাস বহে বারো মাস

জন্ম জন্মান্তরে রক্ত দিয়ে করেছি তার চাষ

 

এ ভাষা আমারশুরু থেকে শেষ, শেষ থেকে শুরু অতীত ভবিষ্যৎ

পৃথিবীর বুকে ভাষা কিংবদন্তি সালাম বরকত

 

এ ভাষা আমার বিশাল বিস্তীর্ণ ধান সবুজের সোনালি কাদা

অস্তিত্বের ভেতর গ্রথিত চিরদিন আমার সোনার বাংলা

ঢাকা

 

শুভাশিস সিনহা

নুয়া করে চিনুরি মেয়েক

 

যে ঠারে মাতুরি কথা, অহানই ঠারহান নাবে

মেয়েকে মেয়েকে শাত’পারের যে ঠার, তার জিঙে

আরাক আহান থার বিতরে

বিতরে বাগাচুরা

ফঙেদে হাজানি নার শৃঙ্খলার দুনিয়ার ডরে

আহিগি দেখের ঠার, কানহানি হুনের ঠার, প্রাণে

তঙাল ধমনিপথে নিয়ত ঠারর আনাগোনা

ইংগ ইয়া থাইলেউ থাউরি গোপন ঠারে ঠারে

মোর দেহ এগ নিজে মূর্তিমান ঠারভগবান।

 

মেয়েকর দাগে দাগে হাজিয়া যে অর্থ নিকুলের

অহানই নাবে অর্থহান; জরমজঞ্জালে, ঘামে

রকতে রকতে তার যে চিন মাঙর, থায়া থায়া

ফঙর তা চিকারিনো, ইকরের নুয়া করপেক

মি তার বিতরে গিয়া নুয়া করে চিনুরি মেয়েক। 

 

অক্ষর নতুন করে চিনি

 

যে ভাষায় কথা বলি, সেটাই কেবল ভাষা নয়

অক্ষরে অক্ষরে ফুটে ওঠে যে ভাষাটি, তার চেয়ে

আরেকটি ভাষা থাকে ভেতরে ভেতরে ভাঙাচোরা

প্রকাশ্যে যায় না আনা শৃঙ্খলার দুনিয়ার ভয়ে

এ চোখ দেখে সে ভাষা, কান শোনে সে-ভাষার ধবনি

আলাদা ধমনিপথে নিয়ত ভাষার আনাগোনা

চুপ হয়ে থাকলেও থাকি কোনো নীরব ভাষায়

আমার এ দেহ নিজে মূর্তিমান ভাষা ভগবান।

 

অক্ষরের দাগে দাগে সেজেগুজে যে অর্থ প্রকাশ

পায়, শুধু তা-ই অর্থ নয়, জনমজঞ্জালে ঘামে

রক্তে রক্তে হারায় যে চিহ্নগুলি তার, থেকে থেকে

ভাসে চিৎকারে, বাজে নতুন ভাষার রিনিঝিনি

ভেতরে প্রবেশি তার অক্ষর নতুন করে চিনি।

বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি কবিতা ও বাংলায় অনুবাদ

 

পুনঃপাঠ

সৈয়দ শামসুল হক

পরানের গহীন ভিতর ৩০

 

আরে ও ইসের বেটি, চুলে দিয়া শিমুলের ফুল

যাস কই, কই যাস? যুবকের মাঝখান দিয়া?

মানুষ গাঙ্গের মতো, বানে ভাসে তারো দুই কুল-

সে পানি কাতান বড়, খলবল রঙ তার সিয়া।

 

আরে থাম, কই যাস? তবু যায় ঘুরনান দিয়া?

শিমুল যতই লাল সেই লাল তবু কিছু কম

যত লাল যেইখানে দেহ তর লুকায় শরম।

খাড়া না করুক দেখি একবার কেউ তরে বিয়া।

 

বেবাক পানির টান সেইকালে নরোম সোঁতায়,

তখন পরীর রানী সেও কিনা অতি বাধ্য বশ,

তখন দেখিনা তুই আইলের বেড়া নি ভাঙ্গস,

তখন শরম দেখি থাকে তর কেমন কোথায়?

 

নষ্ট তর পায়ে পায়ে স্বন্নলতা অনন্তের মূল,

দিবিনে তখন তুই সিঙ্গারের আসল মাশুল।।

মুজিব ইরম

সিলট্যা কবিতা

 

ইতা তো আমার যতো কপালর দোষ

নাইলে তোমারে নি গো আমি

ছাড়ি আইতাম পারি...

 

তুমিও কিওর লাগি পর করি লাইছো

তুমিও কিওর লাগি মুখ ফিরাই লাইছো

ফাউরি লাইছো নাম

ঠিকানা আমার...

 

আমি নি খাইস করি করেছি গলদ

আমি নি খাইস করি

অবতরি মাথা কুটি

অবতরি কান্নাকাটি করি

শরমিন্দা হই

লিখি সিলট্যা কবিতা

অবতরি ঝাৎ করি ওঠে কলিজা আমার...

 

আমি যে কিতার লাগি হইছি রেজিল

আমি যে কিতার লাগি হইছি বৈতল

নিরলে ভাবিও

ইতা তুমি ইয়াদ করিও

ইতা তুমি ফাউরি না যাইও...

পুনঃপাঠ

মোহাম্মদ রফিক

মাগো, মা

 

মাগো, তবে কাদের বাড়ির খুদে

         ভরে উঠল ভাঙাথালা

         কান্নায়, চিৎকারে

মাগো, তবে কাদের ঘরের ত্যানা

         আমাকে জড়িয়ে নিল

         রক্ত হিম সরোবরে

মাগো, তবে কাদের গ্যাঁজালো পান্তা

         পেটের ভিতরে ঢুঁড়ছে

         বেদম হাত পা

মাগো, মা কাদের সোহাগে ঘেন্নায়

         ভিড়মি খেতে খেতে যেন

         ফুল ফুটছে তারা ডাকছে

শরীরের কন্দরে কন্দরে ক্ষত ফাটছে

         যেন মসলা পিষে পিষে কেউ

         মাগো, ধুয়ে ফেলছে পাটা।

পুনঃপাঠ

ওমর আলী

আমি কিন্তু যামুগা

 

আমি কিন্তু যামুগা। আমারে যদি বেশি ঠাট্টা করো।

হুঁ, আমারে চেতাইলে তোমার লগে আমি থাকমু না।

আমারে যতই কও তোতাপাখি, চান, মণি, সোনা।

আমারে খারাপ কথা কও, ক্যান চুল টেনে ধরো।

 

আমারে ভ্যাংচাও ক্যান, আমি বুঝি কথা জানিনাকো।

আমার একটি কথা নিয়ে তুমি অনেক বানাও।

তুমি বড় দুষ্টু, তুমি আমারে চেতায়ে সুখ পাও,

অভিমানে কাঁদি, তুমি তখন আনন্দে হাসতে থাকো।

 

শোবোনা তোমার সঙ্গে, আমি শোবো অন্যখানে যেয়ে

আর এ রাইতে তুমি শুয়ে রবে একা বিছানায়,

দেখুম ক্যামন তুমি সুখী হও আমারে না পেয়ে,

না, আমি, এখনি যাইতেছি চলে অন্য কামরায়।

পাবনা

মাহবুবা ফারুক

স্বভাব দুষ

 

হাতের লাগালে পাইলে তারে সস্তা মনে অয়,

না পাইলে তারে তহন খুব পাইতে মনে লয়।

মানুষের খাইছলত বদলায়না কুনুদিন,

পাইতে চাইয়া দৌড়ায়া তবু কাডে নিশি দিন।

পাইলে ভালা লাগে না পাইলে হায় আফসুস,

ভালা মন্দের খবরে ব্যস্ত যার যার ফুসফুস।

ভাইঙ্গা পইড়া আবার উইট্যা খাড়োয় মানুষ,

এইডাই হাছা যত কও মানুষের স্বভাব দুষ।

নেত্রকোনা

 

টোকন ঠাকুর

ঝিনেদার ভাষা

 

‘ও বু, কিরোম আছির?’

 

‘আমি আর কিরোম থাকপো রে বু? তোর দুলোভাই আমারে একলা রাকে কনে যায়ে ম’লো কেউ তো কতি পাতেছে না। বাঁশবাগানের পতের দিকি চায়ে চায়ে আর কত দিন যায়? আমি যে ক্যাম্বা বাঁচে আচি তা আমার আল্লা জানে আর আমি জানি। মাজেমদ্যি আমার মনের মদ্যি কী যে মনে অয় তা তো আর অন্য কারও কতি পারিনে। আমি খালি নিজি নিজি টের পাই, আমার যেন কিচুমিচু হয়ে হয়ে যাচ্চে। কী করব রে বু, হাউমাউ করে কানতি ইচ্ছে করে। কিন্তুক কানতিউ তো পারিনে, কানলি মানষি কবিনি, ওরে, জামালের বউ অ্যাম্বা কান্দে ক্যা? ভূতি ধল্লো নাকি? আমার কতা বাদ দে। তোর কতা ক। এই দুক্কুরবেলায় তুই কী জন্যি আলি?

‘আমার নতুন বর তো আজ নাত্যিই আসার কতা। কিন্তু বেলা যে আজকে আর যাতিই চাচ্চে না। আমি কিরোম আচি তা আমি নিজির মুকি নিজি কবো ক্যাম্বা?

সকালেত্যেই মনডার মদ্যি কিরোম যে ঠেকতেচে ক তো রে বু, সবাই তো জানতেছে যে, মিজ্জাপুরির ওই বর বিটাডা আজ আমারে বাড়িতি আসপিনি, সারানাত আমারে নিয়ে কুনার ঘড্ডায় দরজায় খিল আটকায়ে দিয়ে শুবিনি। তবু মিজ্জাপুরির বিটাডারে কেউ কিচু কবিনানে। আর কয়দিন আগে উত্তরপাড়ার ফজলু আসে আমার ঘরের জালার ধারে দাঁড়ায়ে ছিল বলে কত কতা! সবাই কলো, ফজলুর হাবভাব ভালো না। তালি মিজ্জাপুরির বিটাডার চরিত্র ভালো? বিয়ে কল্লি চরিত্র ভালো থায়ে? গেলাম রে বু, বাড়ি যাই গে।’

‘একনি যাবি ক্যা? সন্দে হতি তো আরও দেরি আছে। আর ইট্টু থাকপি নে?’

না, যাই। নাত্যিরি যে আসতেচে তার জন্যি মনডার মদ্যি কেমন কেমন যেন খই-খই করতেছে। খালি মনে হচ্চে, ঐ বিটাডা এট্টা প্যাটে খিদে লাগা সাঁওতাল, তা না হলি আমার নিজিরি এত খরগোশ খরগোশ মনে হচ্ছে ক্যা?

ঝিনাইদহ

জুয়েল মোস্তাফিজ

ও গে মাগে...

ছ্যাঞ্চার পানি যাদু জানে...

কাজল জানে না সান্ধের যাদু...

কামাসুতের দেহের পানি কেন জানি লবণ লবণ লাগে...

হারঘে কি আর তোরঘে মতন  দুপ্পহার আছে? হামরা ভাতারের ভাতে প্রহর গুনি রোজ...

দ্যাশ ট্যাশ যাই কহো না... হামরা দ্যাশের কেহ না।

হামি এক মা। হার ভাল্লাগে যখন কেহ হাকে মাগে কইহ্যা ডাকে...

চাঁপাইনবাবগঞ্জ

হেনরী স্বপন

বইরশাইল্ল্যা পোলা

মোগো দ্যাশে জাগা জমি আলহ্যে য্যাগো কোলা

হরতে হ্যারা ফাই ফুডানি বইরশাইল্ল্যা পোলা।

 

হ্যারাই আলহ্যে আডে-মাডে গাঁও গ্যারামের গোদা

জাল-জাইল্যাতি মোকদ্দমা হরতে এ্যরা সব্বোদা।

 

কুড়ায় কুড়ায় জাগা জমি আলহ্যে জোমিদারি

আইল্ল্যা চাষার বেইজ্জ্যোতি নিহা হরতে রাঢ়ি।

 

জালেম জুলুম জোদদারি আকাইম্মা কাজ য্যাতো

টাউটারিতে আলহ্যে হ্যেরা কেদ্দ্যারিতে খ্যাতো।

বরিশাল

 

দৃষ্টি দিজা

নিরাই ভাবনা

 

ভাবো, ফেব্রুয়ারির একুশে হক্কল মায়ের জিহ্বাত ক্যানসার

ভাবো, হাওরের কইন্যার চুলের গোছা পাতলা হই যার পিসিওএসে

ভাবো, কানা টিনর ড্রামও একটা কৈও আটকালো না

ভাবো, ভাবো আর যত চিন্তা কর তত বেআকল অই যাও

ভাবো, ভাবো আর যত চিন্তা কর কূলকিনারা নাই

ভাবো, অথচ গাঙ্গ নাই পানিফুটা সাতরাইবার আর

 

ভাবো, খালি ভাবো আরো, মাত মাতো না কিচ্ছু

তবু, লোকে বলে রে, চালচলন ভালা না আমার

তবু, লোকে বলে রে ইতা কোন জাত মাত মাতস বেটি?

আর, ট্রাস্ট করো,

            সুয়ের টু ব্রিটিশ আমি সত্যই আর মাতি না একটা টুঁ শব্দও।

হবিগঞ্জ

 

নুসরাত নুসিন

সুদূরডাঙা

 

ও ছাবিকুন, চলেক যাই শুকন্যা পাতা কুড়াই

ভিনস্বরে কোকিল ডাকে ভরদুপুর ওই বাতাসে

তুই-মুই আড়াত বসি গল্পো করিম গন্ধসমেক

দ্যাখ, পানির নালা; চৈত্রধানে মাঠ সাজছে

তুই ক্যানবা লজ্জা করিস্, কথা না কইস্

সাঁতাল কবরগুল্যা রোইদে পোড়ে চ্যাংমারিতে

গোছল করে আইলে বসে চৈত্রমাঠে জনে জনে

কানু টুডু বাঁশের কঞ্চি কাটে আড়ার ধারে বসে

বনকরবী স্কুল থেকে চলেক যাই মিঞ্জিরি বনে

তারপরে চ্যাংমারিতে নাওছড়ায় শাপলা তুলে

বড়কাঁঠালের দিকে যায়া শুকন্যা পাতা কুড়াই

শালফুলের ডাক আসছে দ্যাখ বারে বারে

দুই সতীনের ঘাট হু-হু করে মাঝপাতারে

নাওছড়ায় নাও নাই, আছে সবার মুখে মুখে

কাউয়্যা হাগত বটের তলায় ও উড়ত ধুলা

ভররাইতোত ভূতের স্বপন দ্যাখে মন্ত্রীদাদা

ও ছাবিকুন, চলেক যাই ওই সুদূরডাঙা

বইখাতা সব ফ্রকের ভিতর থাক্ লুকানো

শালফুলের ডাক আসছে দ্যাখ বারে বারে

দুই সতীনের ঘাট হু-হু করে মাঝপাতারে

দিনাজপুর

 

পিয়াস মজিদ

এমুন বৃষ্টিবাদলা

 

এখন হইতাছে

কিন্তু এই বৃষ্টি এখনেরই না

যেন কোন অচিনকালের

ওমানো গন্ধের ওপর

টিপটিপ বৃষ্টি পড়তাছে

স্মৃতিরে ছেড়াবেড়া কইরা দিতেছে

তুমি বাইরে দাঁড়াইয়া ছিলা কোন ভাদুর মাসে

এখন তোমার ভিতরের ঘরে ঢুইকা

বৃষ্টি তোমার ঝাঁপটাইতাছে

এমুন ময়লা দুনিয়া

আদিকাল থাইকা বৃষ্টি আইসা

এই এখন তার সব ধোয়াপাকলা সারতাছে

আব্বা কখন বাজারে গেছে

ছাতা নিয়া যায় নাই

বেবাক মাছ আর শাকপাতা চুবা

কবরের মইধ্যে আব্বাও চুবাচুবা

এমন মুর্দাভিজা বৃষ্টির দিনে

আমি জিন্দেগিভর আর ইশকুলে যামু না

আমগো সব সিলেবাস ভিইজ্যা গেছে

আগুনেরও ১২টা বাইজ্যা গেল বইলা

তবু জারি আছে ঘরে ঘরে আম্মার চুলা

এমুন গাদলার দিনে

তোমার প্রেমেরে আমি

কোলে কইরা ঘুম পাড়ামু

জাইগা ওইঠা সে দেখুক

কয়শ বছর আগের আমার বৃষ্টিভিজা লাশ

ভাইস্যা উঠতাছে পিরিতির নতুন পানিতে।

মেহেরুবা নিশা

হারায় গিছিরে মনা

 

ডরপাওয়া হরিণীডাও কান্দিল সিদিন।

জানিনে কুন হারানো সুখের জন্যি

বুক ভাসিছে তার!

 

মরা পাহাড়ডা

পথ আটকে দেছে দেহো;

আমিও হারায় গিছিরে, মনা!

পাচ্ছিনে নিজেরে খুঁইজে আর!

 

রাইতের বুকির মদ্যিও যে

এতো এতো দুখ

কত চাপ চাপ ব্যথা

কারে আর কব, কও!

 

 

ইট্টুসখানি যদি কেউ ধইরতো আইসে

মায়ার ফান্দে জড়ায়ে

কয়ে দিতি পাত্তাম আমি,

কিরাম তোলপাড় করা ঢেউ উঠিল সিদিনকের

আমার বুকির মদ্যি!

যিখিন আমি লুকোয় রাখিছি

আমার গুপন পুহুরখানি।

 

বুক ফুলোয়ে কত শত মিছে কতা কয় কতজনে!

আমারও না হয় কেউ দেলে ইট্টু মিছে সান্ত¡না...

যশোর

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত