নবজাগরণের নতুন একুশে

আপডেট : ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৭:৫৬ এএম

ভিন্ন আবহে এবার পালিত হলো অমর একুশে ফেব্রুয়ারি। ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত ১২টা ৮ মিনিট। জাতীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রথা অনুযায়ী এবার তার শহীদ মিনার ত্যাগ করার কথা। কিন্তু মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে প্রচলিত প্রথা ভাঙলেন তিনি। ভাষাশহীদদের আত্মার শান্তি কামনায় অংশ নিলেন দোয়া ও মোনাজাতে। শহীদ মিনারে দাঁড়িয়ে দুই হাত তুলে প্রধানমন্ত্রীর মোনাজাত রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার ভিন্নমাত্রা যোগ করেছে। বিষয়টি খুবই ইতিবাচকভাবে দেখছেন সবাই। অবশ্য, এবারে সবচেয়ে বেশি আলোচিত ঘটনা জামায়াত আমিরের শহীদ মিনারে ফুল দিতে আসা। এর আগে এই দলের পক্ষ থেকে কখনোই ভাষাশহীদদের শ্রদ্ধা জানিয়ে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়নি।

গতকাল শনিবার জাতি শোক-শ্রদ্ধায় স্মরণ করেছে ভাষাশহীদদের। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ভাষা আন্দোলনের বীর শহীদদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানাতে সর্বস্তরের মানুষের ঢল নামে। নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠনের পর এবার যেন এসেছে এক নতুন একুশে ফেব্রুয়ারি। রোজার মধ্যেও বিপুল মানুষের অংশগ্রহণকে এবার দেখা হয়েছে নবজাগরণ হিসেবে। গতকাল ভোর থেকেই রাজনৈতিক দল, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে শহীদ বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়। ভাষাশহীদদের স্মরণে কালো ব্যাজ ধারণ, প্রভাতফেরি ও শ্রদ্ধা নিবেদনের মধ্য দিয়ে জাতি গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের আত্মত্যাগী বীরদের। তাছাড়া, ঢাবিতে শহীদদের স্মরণে হয় প্রভাতফেরি ও মৌন মিছিল।

শ্রদ্ধা নিবেদন করতে আসা মানুষের পদচারণায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকা হয়ে ওঠে মুখর ও আবেগঘন। একইভাবে দেশের জেলা ও উপজেলা-পর্যায়ের শহীদ মিনারগুলোয়ও ভোর থেকে শুরু হয় পুষ্পার্ঘ্য অর্পণের কর্মসূচি।

একুশের প্রথম প্রহরে রাত ১২টা ১ মিনিটে প্রথম রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। রাত ১২ টা ৮ মিনিটে শ্রদ্ধা জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এ সময় মন্ত্রিসভার সদস্যরাও  তার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর পর বিএনপি ও জিয়া পরিবারের পক্ষ থেকে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন তারেক রহমান। পুষ্পস্তবক অর্পণের পর প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান এবং কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমান মহান ভাষাশহীদদের স্মৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে এক মিনিট নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন।

এ সময় মাইকে অমর একুশের কালজয়ী গান, ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি’ বাজতে থাকে। পুষ্পস্তবক অর্পণের পর রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থেকে ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। প্রথা অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী পুষ্পস্তবক অর্পণের পরপরই শহীদ মিনার ত্যাগ করেন। তবে এবার সেই প্রথার বাইরে গিয়ে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণেই দোয়া মাহফিলে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী।

দোয়া পরিচালনা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদের জ্যেষ্ঠ ইমাম ও খতিব হাফেজ মাওলানা নাজির মাহমুদ। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের রুহের মাগফিরাত কামনা করে মোনাজাত করা হয়। এ সময় বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জন্যও দোয়া করা হয়। পাশাপাশি দেশ ও জাতির কল্যাণ এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের সফলতা কামনা করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের সদস্যরাও শহীদদের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত এবং দেশ ও জাতির কল্যাণ কামনায় বিশেষ মোনাজাতে অংশ নেন।

জানা যায়, ১৯৫৩ সালে ভাষাআন্দোলনের প্রথম বর্ষপূর্তিতে শহীদদের স্মরণে দোয়া অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সর্বশেষ ১৯৭২ সালে একবার শহীদের স্মরণে দোয়া করা হয়। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতায় শ্রদ্ধা নিবেদন হলেও মোনাজাতের এমন প্রকাশ্য আয়োজন আর দেখা যায়নি। ফলে এবারের ঘটনাকে অনেকে একটি নতুন দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন।

এর আগে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে এলে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক নিয়াজ আহমদ খান। পরে তিন বাহিনীর পক্ষে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ নাজমুল হাসান এবং বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন শ্রদ্ধা জানান।

এরপরই সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে ১১ দলীয় জোটের নেতারা শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এ সময় বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, এনসিপি সদস্য সচিব আখতার হোসেনসহ জোটের সংসদ সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। পর্যায়ক্রমে শ্রদ্ধা জানান মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. নাসিমুল গনি, প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী ও আপিল বিভাগের বিচারপতিরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে উপাচার্য অধ্যাপক নিয়াজ আহমেদ খান পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাদা দলের নেতারা পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। পরে ডাকসুর পক্ষ থেকে ভিপি সাদিক কায়েম, জিএস এস এম ফরহাদের নেতৃত্বে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়।

এরপর ঢাকায় নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, হাইকমিশনার ও কূটনীতিক, নির্বাচন কমিশন, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব, নেতা, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), গণ অধিকার পরিষদ, এনডিএম, এবি পার্টি, বিজেপি, জেপি, সিপিবি, বাসদ, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ, জেএসডি এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন শ্রদ্ধা নিবেদন করে। এ ছাড়া ছাত্রদলের পাশাপাশি ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রফ্রন্ট ও ছাত্রমৈত্রীর নেতাকর্মীরাও উপস্থিত ছিলেন। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ ঢাকার প্রধান কলেজগুলো, ইনকিলাব মঞ্চ, জুলাই ঐক্য ও জুলাই মঞ্চের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা জানানো হয়।

সকালে পুষ্পস্তবক অর্পণ শেষে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন বলেন, অতীতের বিভাজন ভুলে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলাই এখন সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ কাজ। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মূল শক্তিই ছিল ঐক্য, সেই চেতনাকে আমাদের ধরে রাখতে হবে। বিভেদের রাজনীতি দেশকে কখনো সামনে এগিয়ে নিতে পারে না; এটি কেবল জাতিকে পিছিয়ে দেয়। বর্তমান সরকার এমন একটি রাজনৈতিক পরিবেশ গড়ে তুলতে বদ্ধপরিকর, যেখানে দীর্ঘদিনের সামাজিক ও রাজনৈতিক বিভেদ দূর হবে এবং একটি সুস্থ সমঝোতার সংস্কৃতি শক্তিশালী হবে।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, মহান একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের জীবনে একইসঙ্গে শোক, শক্তি, গৌরব ও সাহসের প্রতীক। ন্যায়ের প্রশ্নে সদা আপসহীন সংগ্রামের প্রেরণা। আমাদের মুখের ভাষা বাংলার মর্যাদা রক্ষায় ১৯৫২ সালের এ দিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে শাহাদাতবরণ করেন রফিক, শফিক, জব্বার, বরকত, শফিউদ্দিন, সালামসহ আরও অনেকে। তাদের সবার স্মৃতির প্রতি আন্তরিক শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি।

উল্লেখ্য, রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার ওপর গুলিবর্ষণে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ অনেকেই শহীদ হন। তাদের আত্মত্যাগের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৯৯ সালে ইউনেসকো ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণা করে। সেই থেকে বিশ্ব জুড়ে দিবসটি ভাষার মর্যাদা ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য রক্ষার অঙ্গীকার নিয়ে পালিত হয়ে আসছে।

বাধার মুখে জাতীয় পার্টির নেতারা : শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে বাধার মুখে পড়েছেন জাতীয় পার্টির (জাপা) নেতাকর্মীরা। সেখানে এনসিপি নেতাকর্মীরা তাদের দেখে ‘ভুয়া ভুয়া’ স্লোগান দেন বলে জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। গত শুক্রবার রাত ২টার দিকে রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। পরে জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ না করেই সেখান থেকে চলে যান।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ফুলের তোড়া হাতে জাতীয় পার্টির কয়েকজন নেতাকর্মী শহীদ মিনারে প্রবেশ করেন। তবে সেখানে দলটির কেন্দ্রীয় কোনো পরিচিত নেতাকে দেখা যায়নি। পুষ্পস্তবক অর্পণের পর জাতীয় পার্টির ব্যানার দেখে এনসিপির নেতাকর্মীরা ‘ভুয়া ভুয়া’ সেøাগান দিতে শুরু করেন। একপর্যায়ে জাতীয় পার্টির ব্যানার ও ফুলের তোড়া কেড়ে নেওয়া হয়।

শহীদদের স্মরণে ঢাবিতে প্রভাতফেরি : ভাষা আন্দোলনের শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন হিসেবে মৌন মিছিল ও প্রভাতফেরি বের করা হয়। শনিবার সকাল সাড়ে ছয়টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘স্মৃতি চিরন্তন’ চত্বর থেকে মৌন মিছিল ও প্রভাতফেরি শুরু হয়ে উদয়ন স্কুল হয়ে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গমন করে। পরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়। এতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খান নেতৃত্ব দেন।

এ দিনটিকে কেন্দ্র করে গতকাল বাদ আসর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদ মসজিদুল জামিয়াসহ সব হলের মসজিদ এবং আবাসিক এলাকার মসজিদে ভাষাশহীদদের রুহের মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করা হয়। এ ছাড়া, অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়েও শহীদদের আত্মার শান্তি কামনা করে বিশেষ প্রার্থনা করা হয়।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত