সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র

আপডেট : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৮:০৮ এএম

বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে দুর্নীতিবিরোধী আইনের কঠোর প্রয়োগ ও স্বাধীন তদন্ত ব্যবস্থার মাধ্যমে দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গঠনের অঙ্গীকার করা হয়েছে। কিন্তু দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা কোনো একক আইনি পদক্ষেপে সম্ভব নয়; এর জন্য দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও জনসম্পৃক্ততার সমন্বিত প্রক্রিয়া দরকার। বর্তমান বাস্তবতায় সুশাসন প্রতিষ্ঠা ছাড়া এ লক্ষ্য অর্জন করা কঠিন বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

বাংলাদেশে সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতেই অনিয়ম ও দুর্নীতির বিস্তৃতি রয়েছে। ব্যাংক খাতে জালিয়াতি, ওভার ও আন্ডার ইনভয়েসের মাধ্যমে অর্থ পাচার, ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষগ্রহণ, অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এসব অপরাধ দমনে প্রধান ভূমিকা পালন করে দুর্নীতি দমন কমিশন, অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। বহুমাত্রিক দুর্নীতি ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে এ ক্ষেত্রে কাক্সিক্ষত ফল আসছে না।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গঠন একটি ধারাবাহিক সংস্কার প্রক্রিয়ার বিষয়। শক্তিশালী ও স্বাধীন তদন্ত সংস্থা, নিরপেক্ষ নিয়োগ প্রক্রিয়া, ডিজিটাল শাসনব্যবস্থা, দ্রুত বিচার এবং জনসম্পৃক্ত কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতে পারলে দুর্নীতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারই হবে এ লক্ষ্য অর্জনের প্রধান চাবিকাঠি। এজন্য নতুন সরকারকে প্রথমে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। পাশাপাশি দুদক আইনের সংশোধন, দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ না দেওয়া, দুদকের নিজস্ব প্রসিকিউশন ইউনিট গঠন ও জনগণের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোসহ বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারলে রাষ্ট্রের দুর্নীতি অনেকাংশে কমে আসবে।

তারা বলেছেন, দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গঠনের পূর্বশর্ত হলো সুশাসন। প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে জবাবদিহি, নজরদারি ও তদারকি ব্যবস্থা কার্যকর করা না হলে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। যেখানেই অব্যবস্থাপনা বা অনিয়ম ধরা পড়বে সেখানে দ্রুত বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত প্রশাসনিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে, যাতে তদন্ত সংস্থা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে। দুর্নীতি দমন শুধু আইন প্রয়োগের মাধ্যমে সম্ভব নয়; নাগরিকদের সচেতনতা ও সামাজিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষা, গণমাধ্যম ও সামাজিক প্রচারণার মাধ্যমে দুর্নীতিবিরোধী সংস্কৃতি তৈরি করা গেলে দুর্নীতির সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা কমবে।

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, আইন অনুযায়ী দুদক একটি স্বাধীন সংস্থা হলেও বাস্তবে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। যখন যে সরকার ক্ষমতায় আসে, তাদের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের কমিশন ও গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। ফলে কর্মকর্তারা অনেক সময় নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারেন না। দুর্নীতি দমন কার্যকর করতে হলে স্বচ্ছ, মেধাভিত্তিক ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত নিয়োগ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে। বিতর্কিত বা অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের নিয়োগ করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

দুদক কর্মকর্তারা বলেছেন, দুর্নীতি দমন কমিশন আইন ২০০৪ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি পাস হয়। আইনে ৩৮টি ধারা রয়েছে। কিন্তু কমিশন গঠিত হওয়ার পর ২১ বছর পার হলেও দুদক আইনের ৩৩তম ধারা অনুযায়ী নিজস্ব প্রসিকিউশন ইউনিটি গঠন করা হয়নি। কী প্রক্রিয়ায় নিজস্ব প্রসিকিউশন ইউনিট গঠিত হবে তার বিধিমালাও করা হয়নি। কোনো সরকারই প্রসিকিউশন গঠনের উদ্যোগ নেয়নি। যে সরকারই ক্ষমতায় আসে তারা তাদের দলীয় আইনজীবীদের পাবলিক প্রসিকিউটর হিসেবে নিয়োগ দেয়। সরকার দলীয় আইনজীবী দিয়ে দুদকের প্রসিকিউশন ইউনিট চালাতে হয়। দলীয় সরকার-সমর্থিত আইনজীবী হওয়ায় তাদের দলীয় একটি ম্যান্ডেট থাকে। তারা সেই ম্যান্ডেট মেনে মন্ত্রী, এমপি, আমলা, ব্যবসায়ী, রাজনীতিক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে করা মামলার বিচারকার্য পরিচালনায় তাদের দলীয় লোকজনকে বাঁচাতে তৎপর থাকে। দলীয় প্রভাবে আইনজীবীরা শক্তিশালীভাবে মামলা পরিচালনা না করলে আদালতে সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপনে দুর্বলতা তৈরি হয় এবং দুর্নীতিবাজরা আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যায়। তাই স্থায়ী, দক্ষ ও স্বাধীন প্রসিকিউশন ইউনিট গঠন করলে বিচারপ্রক্রিয়া কার্যকরী ও ফলপ্রসূ হবে।

দুদক কর্মকর্তারা বলেছেন, ২০০৪ সালে কমিশন গঠনের পর থেকে আইন সংশোধনের মাধ্যমে সংস্থাটিকে দুর্বল করা হয়েছে। দুদক দুর্নীতির অভিযোগের তদন্ত স্বাধীনভাবে করতে পারে না। দেশ থেকে প্রতি বছর যে বিশাল অঙ্কের অর্থ নানা কায়দায় বিদেশে পাচার হচ্ছে তারও তদন্ত করতে পারছে না। ২০১৫ সালে আইন সংশোধনের মাধ্যমে মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগের অনুসন্ধানের ও তদন্তের ২৭টি খাতের একটি দুদকের জন্য রেখে বাকি ২৬টি সিআইডি, এনবিআর, বিএফআইইউসহ বিভিন্ন সংস্থাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এ কারণে মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগ পেলেও দুদক কিছু করতে পারে না। দুদকের আইন সংশোধন করে সংস্থাটির ক্ষমতা ফিরিয়ে দিতে মন্ত্রিপরিষদ একাধিক চিঠি দিয়েছে। কিন্তু দুদকের মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগের তদন্তের ক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়া হয়নি। দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গঠন করতে হলে মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগের পুরো তদন্তের দায়িত্ব দুদককে দেওয়া উচিত।

বর্তমান বিধিমালায় অনুসন্ধান ও তদন্তের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকলেও জটিল আর্থিক দুর্নীতির ক্ষেত্রে তা বাস্তবসম্মত নয়। বিধিমালায় অনুসন্ধানের সময় প্রথমে ৪৫ কার্যদিবস ও পরে আরও ৩০ কার্যদিবসসহ ৭৫ দিন বলা আছে। আর তদন্তে প্রথম ১২০ কার্যদিবস ও পরে ৬০ কার্যদিবসসহ ১৮০ কার্যদিবস নির্ধারণ করা আছে। অনেক তদন্ত নথি সংগ্রহ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও আর্থিক বিশ্লেষণের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় দীর্ঘ সময় দরকার। নির্দিষ্ট সময়সীমা কখনো কখনো মামলার গুণগত মান ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং আসামিপক্ষ আদালতে এটিকে আইনি দুর্বলতা হিসেবে ব্যবহার করে। তাই সময়সীমার ক্ষেত্রে প্রশাসনিক আদেশ দেওয়া যেতে পারে।

দুদকের সাবেক মহাপরিচালক (লিগ্যাল ও প্রসিকিউশন) এবং সাবেক সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ মইদুল ইসলাম বলেন, ‘দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গঠনে প্রথমত সুশাসন কায়েম করতে হবে। সুশাসন বলতে প্রশাসনের সর্বত্র জবাবদিহি, নজরদারি ও তদারকির কথা বোঝায়। যেখানে অব্যবস্থাপনা দেখা যাবে, যেখানে দুর্নীতি পাওয়া যাবে সেখানে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। এরপর দুদককে শক্তিশালী করে স্বাধীন ও মুক্তভাবে কাজ করতে দিতে হবে। সেখানে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ যেন না হয়। রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ যেন না হয়। বিচারের জায়গাটা পরিষ্কার করতে হবে। বিচার দ্রুত ও দৃশ্যমান করতে প্রয়োজনে আলাদা আদালত করা যেতে পারে। সরকার মুখে যা বলে তা যেন তাদের অন্তরেও থাকে। তাদের নিজেদের লোকজনকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এসব করতে পারলে সত্যিকার অর্থে দুর্নীতি দমন কাজে আসবে।’

তিনি বলেন, ‘যারা প্রভাবিত হবেন, যারা অন্যের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আসামি বা দুর্নীতিবাজদের পক্ষে কাজ করবেন, তাদের সহায়তাকারী কাউকে যেন নিয়োগ দেওয়া না হয়। সেটা প্রেষণেই হোক বা কমিশনেই হোক। দুদকের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি দমন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে, যাতে দুদকের ভেতরেও কেউ দুর্নীতিবাজের সহায়ক হলে তাদের শাস্তির মুখোমুখি করতে হবে।’

মইদুল ইসলাম বলেন, ‘দুদকের নিজস্ব প্রসিকিউশন থাকা দরকার। উচিত হবে ভাড়া বা চুক্তিভিত্তিক আইনজীবী বাদ দিয়ে নিজস্ব প্রসিকিউশন ইউনিট গঠন করা হয়। এটি করলে আদালতে মামলা পরিচালনায় সফলতা পাওয়া যাবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত