চারিত্রিক উৎকর্ষ সাধনের মাস রমজান। এই মাসটি আমাদের সামনে আসে ধৈর্য ও তিতিক্ষার পরীক্ষা হয়ে। প্রতিটি রোজাদার ব্যক্তির লক্ষ্য থাকে সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টি অর্জন এবং নিজের গুনাহ মাফ করিয়ে নেওয়া। কিন্তু অজ্ঞতা বা অবহেলার কারণে অনেক সময় আমাদের ইবাদতগুলো প্রাণহীন হয়ে যায়। রোজা কেবল খাদ্য ও পানীয় ত্যাগের নাম নয়, বরং এটি জিহ্বা, চোখ ও মনের কুপ্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণের একটি ঢাল। এই ঢালকে কলুষিত করে এমন কাজগুলো চিহ্নিত করে তা থেকে দূরে থাকাই হলো প্রকৃত তাকওয়া। ইমানের পূর্ণতা এবং জান্নাতের পথ সুগম করতে হলে সুন্নাহর প্রতিটি নির্দেশনা অক্ষরে অক্ষরে পালন করা জরুরি। যখন একজন মানুষ তার প্রাত্যহিক ভুলগুলো শুধরে নিয়ে নেক আমলের দিকে অগ্রসর হয়, তখনই তার রোজা সার্থক হয়। ব্যক্তিগত অভ্যাস এবং সামাজিক আচরণের ক্ষেত্রে যে বিষয়গুলো রোজার হক নষ্ট করে, সেগুলো বর্জন করার দৃঢ় সংকল্প প্রয়োজন। রমজানে বিরত থাকা দরকার এমন কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করা হলো।
সাহরি না খাওয়া : অনেকে সাহরি খান না, অনেকে রাতের প্রথম ভাগে খেয়েই শুয়ে পড়েন। এটা সুন্নাহ পরিপন্থি। কারণ ইহুদি ও খ্রিস্টানরা সাহরি খায় না। হাদিসে এসেছে, হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘আমাদের ও আহলে কিতাবিদের রোজার মাঝে পার্থক্য হলো সাহরি গ্রহণ।’ (সহিহ মুসলিম ২৬০৪) অর্থাৎ তারা সাহরি খায় না। আমরা সাহরি খাই।
বিলম্বে ইফতার করা : রোজার পূর্ণ সওয়াব পাওয়ার জন্য বিলম্বে ইফতার করা থেকে বিরত থাকতে হবে। সাহাবি হজরত আবু জর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘দ্বীন বিজয়ী হবে, যে যাবৎ মানুষ দ্রুত ইফতার করবে। কারণ ইহুদি-নাসারারা তা বিলম্বে করে।’ (সুনানে আবু দাউদ ২৩৫৫)
লাইলাতুল কদর তালাশ না করা : রমজান মাসে এমন একটি রাত রয়েছে, যা হাজার মাসের চেয়ে উত্তম। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘কদরের রাত হাজার মাসের চেয়েও উত্তম।’ (সুরা কদর ৪) হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) (রমজানের) শেষ দশ দিন লাইলাতুল কদর তালাশ করার নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, ‘তোমরা রমজানের শেষ দশ দিনের বেজোড় রাতগুলোতে কদরের রাত খোঁজ।’ (সহিহ বুখারি ২০২০)
মিথ্যা বলা ও অন্যান্য পাপ কাজ করা : একজন রোজাদার মিথ্যা কথা বলা ও অন্যান্য পাপ কাজ করা থেকে বিরত থাকবে। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও কাজ এবং মূর্খতা পরিত্যাগ করতে পারল না, তার রোজা রেখে শুধু পানাহার বর্জনে আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই।’ (সহিহ বুখারি ৬০৫৭)
সুন্নত ত্যাগ করা : আমাদের প্রত্যেকটি আমল হতে হবে সুন্নত মোতাবেক। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, হাদিসে এসেছে, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘এমন অনেক রোজাদার আছে, যার রোজা থেকে প্রাপ্তি হচ্ছে শুধু ক্ষুধা ও তৃষ্ণা। তেমনি কিছু নামাজি আছে যাদের নামাজ কোনো নামাজই হচ্ছে না। শুধু যেন রাত জাগছে।’ (মুসনাদে আহমদ ৮৮৪৩)
দান-সদকা না করা : পুণ্য অর্জনের মাস রমজান। এ মাসে রোজা-নামাজ ইত্যাদির পাশাপাশি দান-সদকার মাধ্যমেও ফজিলত অর্জন করতে হবে। বেশি বেশি দান-সদকা করার চেষ্টা করতে হবে। এতিম, বিধবা ও গরিব-মিসকিনদের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে হবে। যাদের ওপর জাকাত ফরজ তাদের হিসাব করে এ মাসে জাকাত দেওয়া উত্তম। কেননা হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) এ মাসে বেশি বেশি দান-খয়রাত করতেন। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসুল (সা.) ছিলেন মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দানশীল আর রমজানে তার এ দানশীলতা আরও বেড়ে যেত।’ (সহিহ বুখারি ১৯০২)
অপচয় ও অপব্যয় করা : প্রয়োজনের অতিরিক্ত অপচয় করা থেকে বিরত থাকা আবশ্যক। অনেকে রমজান মাসে ইফতার বা সাহরিতে এমন খরচ করেন, যার প্রয়োজন নেই। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘হে বনী আদম! তোমরা প্রতি নামাজে তোমাদের সাজসজ্জা পরিধান করো এবং খাও, পান করো, তবে অপচয় করো না। নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদের পছন্দ করেন না।’ (সুরা আরাফ ৩১)
তাড়াহুড়া করে কোরআন খতম করা : শুধু খতম দেওয়া বা পড়া শেষ করার জন্য তাড়াহুড়ো করে কোরআন পড়লে কোরআনের হক আদায় হয় না। বিশেষ করে খতমে তারাবিতে খতম শেষ করা বা ২০ রাকাত তারাবি শেষ করার জন্য তাড়াহুড়ো করে কোরআন পড়া উচিত নয়। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে কোরআন সুন্দর উচ্চারণে পড়ে না, সে আমার উম্মতের মধ্যে শামিল নয়।’ (সহিহ বুখারি ৭৫২৭)
ফরজ নামাজ আদায়ে অলসতা করা : রোজা পালনের সঙ্গে সঙ্গে ফরজ নামাজ জামাতের সঙ্গে আদায় করতে হবে। অনেকে ফরজ নামাজ আদায়ে উদাসীন থাকেন, যা গ্রহণযোগ্য নয়। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘অতএব সেই নামাজ আদায়কারীদের জন্য দুর্ভোগ, যারা নিজেদের নামাজে অমনোযোগী।’ (সুরা মাউন ৪-৫)
দুনিয়ার ব্যস্ততায় মগ্ন থাকা : ইবাদতের মাস রমজানে বেশি বেশি আমলের কথা রয়েছে। কিন্তু আমরা অনেকেই ব্যস্ত থাকি দুনিয়াবি কাজে। এটা কাম্য নয়। এ মাসে বেশি বেশি দোয়া-ই¯েগফার করা উচিত। হাদিসে এসেছে, ‘ইফতারের মূহূর্তে আল্লাহতায়ালা বহু লোককে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়ে থাকেন। মুক্তির এ প্রক্রিয়া রমজানের প্রতি রাতেই চলতে থাকে।’ (জামিউস সাগির ৩৯৩৩)
রমজানের সওয়াব ও ফজিলত পূর্ণমাত্রায় পেতে হলে আমাদের প্রতিটি আমল হতে হবে রাসুল (সা.)-এর সুন্নাহ অনুযায়ী। সাহরি ও ইফতারের ক্ষেত্রে সময়ের সঠিক ব্যবহার এবং ইহুদি-নাসারাদের রীতির বিপরীতে চলা ইমানের অন্যতম দাবি। আল্লাহতায়ালা এই মাসের বরকতে আমাদের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দিন এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তির যে প্রক্রিয়া প্রতি রাতে চলে, তাতে আমাদের নাম অন্তর্ভুক্ত করুন। সঠিক আমলের মাধ্যমেই আমাদের সিয়াম সাধনা সফল হোক।
লেখক : ইমাম, খতিব ও মাদ্রাসাশিক্ষক