রমজান মাসের স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস

আপডেট : ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০১:৩৯ এএম

রমজানের খাবারদাবার অন্যান্য সময় থেকে খুব বেশি ভিন্ন হওয়া ঠিক নয়। এ মাসেও উচিত সাধারণ খাবার খাওয়া। যাতে করে শরীরের ওজন খুব বেশি বেড়ে বা কমে না যায়। সুস্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজন সুষম খাবারের। যাতে শরীরে জমানো টক্সিনগুলোকে ভেঙে শরীর থেকে বের করে দিতে পারে। ইফতারের সময়কার খাবার দুই ভাগে ভাগ করে খাওয়া স্বাস্থ্যসম্মত। প্রথম ভাগ মাগরিবের নামাজের পূর্বে আর দ্বিতীয় ভাগ মাগরিবের নামাজের পর। একসঙ্গে অধিক খাওয়া শরীরে নানাবিধ জটিলতা তৈরি করাসহ শরীরকে ক্লান্ত করে তুলতে পারে। লিখেছেন পুষ্টিবিদ এ বি সিদ্দিক

রমজান মাস রহমত ও বরকতপূর্ণ মাস। এ মাস মুসলমানদের জন্য ভারসাম্যপূর্ণ ও স্বাস্থ্যকর জীবনে পুনরায় ফিরে যেতে অফুরন্ত সুযোগ করে দেয়। স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ এবং নিয়মিত মানসিক ও শারীরিক অনুশীলন মাধ্যমে সমন্বয় ঘটে আমাদের শারীরিক ও আধ্যাত্মিক চাহিদার। এ মাসে রোজা রাখার মাধ্যমে আমরা অনায়াসে আমাদের খাদ্যাভ্যাসকে পরিবর্তন করতে পারি, সেই সঙ্গে পারি শরীরের জমানো টক্সিনগুলোকে ভেঙে শরীর থেকে বের করে দেয়। রোজা এভাবে আত্মসংযম ও নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনকে সহজ করে। রমজানে সবাই শারীরিক জটিলতা থেকে মুক্ত থেকে রোজা রাখার মাধ্যমে এ মাস থেকে সর্বোচ্চ উপকার পেতে পারে।

রমজান মাসে রোজা রাখার মাধ্যমে যে কেউ যেমন তার স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটাতে পারে, তেমনি অতিরিক্ত খাবার গ্রহণের মাধ্যমে বরকতপূর্ণ এই মাসে শারীরিক ক্ষতি ছাড়াও আত্মিক উন্নতিকে ব্যাহত করতে পারে। তাই রমজান মাসে খাবার গ্রহণের ব্যাপারে আমাদের সংযমী হওয়া দরকার, জানা দরকার রমজানের স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও ডায়েট সম্পর্কে।

রমজান মাসের খাবার-দাবার অন্যান্য মাসের স্বাভাবিক খাবার-দাবার থেকে খুব বেশি ভিন্ন হওয়াটা ঠিক নয়। আমাদের উচিত যতটা সম্ভব রোজার মাসে সাধারণ খাবার খাওয়া। যাতে করে আমাদের শরীরের ওজন খুব বেশি বেড়েও না যায় আবার একেবারে কমেও না যায়। সুস্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজন সুষম খাবারের। দরকার পরিমাণ মতো শস্য জাতীয় খাবার, শাকসবজি, ফলমূল, দুধসহ মাছ, মাংস বা ডিম। রমজান মাসেও এর ব্যতিক্রম নয়। তবে সারা দিন রোজা রাখার পর খাবার নির্বাচন ও গ্রহণের ক্ষেত্রে কিছু বিষয় খেয়াল রাখা দরকার।

দ্রুত হজম হয় এমন খাবারের পরিবর্তে বেছে নেওয়া দরকার এমন খাবার, যা হজম হতে বেশি সময় লাগে। অর্থাৎ এমন সব খাবার গ্রহণ করা, যা হজম হতে প্রায় ৮ ঘণ্টার মতো সময় লাগে। এ রকম খাবারের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো লাল চাল, লাল আটা, ওটস, বালি, নানান রকমের ডাল, শিমের বিচি ইত্যাদি।

খাবার নির্বাচনে দ্বিতীয় বিষয়টি হচ্ছে খাদ্য আঁশের উপস্থিতি। মূলত যেসব খাবারে খাদ্য আঁশ বেশি থাকে সেসব খাবারই হজম হতে বেশি সময় লাগে। শস্য জাতীয় খাবার ছাড়াও শাকসবজি, চামড়াসহ ফল, শুকনা ফল, বাদাম ইত্যাদি খাদ্য আঁশ সমৃদ্ধ খাবারগুলোর মধ্যে অন্যতম। তৃতীয় বিষয়টি হলো, অধিক ভাজা পোড়া ও চর্বি যুক্ত খাবার পরিহার করা। কারণ এ ধরনের খাবারে বদহজম, বুক জ্বালাপোড়া করাসহ শারীরিক ওজন বৃদ্ধিজনিত সমস্যা সৃষ্টির জন্য দায়ী। সর্বশেষ ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পানি। প্রতিদিন কমপক্ষে ৮ গ্লাস বিশুদ্ধ পানি পান করা প্রত্যেকের জন্য জরুরি। একসঙ্গে বেশি পরিমাণ পানি পান না করে ইফতার ও সাহরির মধ্যবর্তী সময়ে অল্প অল্প করে বারবার পানি পান করা ভালো।

যে খাবার খেতে পারেন

শস্য জাতীয় খাবার : লাল চাল, লাল আটা, বার্লি, ওটস, সেমাই ও সাগু দানা।

আমিষ জাতীয় খাবার : মাছ, মুরগির মাংস, মটরশুঁটি, শিমের বিচি ও ডিম (কুসুমসহ খেলে সপ্তাহে তিনটির বেশি নয়)।

দুধ ও দুধ জাতীয় খাবার : ননীবিহীন দুধ, দই, লাবাং ও ফ্যাটযুক্ত চিজ।

ফল ও শাকসবজি : সব ধরনের তাজা শাকসবজি, ফল ও চিনিবিহীন ফলের জুস।

রোজার মাসে স্বাস্থ্যকর কিছু খাবার যা প্রতিদিন খেতে পারেন :

খেজুর : চিনি, খাদ্য আঁশ, শর্করা, পটাশিয়াম ও ম্যাগনেশিয়ামের ভালো উৎস।

হালিম : একদিকে আমিষের ঘাটতি পূরণ করবে, অন্যদিকে দীর্ঘক্ষণ পেটে থাকবে।

আমন্ড : আমিষ সমৃদ্ধ খাবার।

কলা : শর্করার সঙ্গে সঙ্গে এ থেকে পাবেন পটাশিয়াম ও ম্যাগনেশিয়াম।

যা খাবেন না

শস্য জাতীয় খাবার : সাদা চাল, সাদা আটা, সাদা পাউরুটি।

আমিষ জাতীয় খাবার : ফ্রাইড চিকেন, চর্বিযুক্ত মাংস, খাশির মাংস ও কলিজা।

দুধ ও দুধ জাতীয় খাবার : পূর্ণ ননীযুক্ত দুধ, আইসক্রিম, মিষ্টি ও ছানা।

ফল ও সবজি : নারিকেল, সবজি ভাজা, চিনিযুক্ত ফলের রস।

স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর

  অতিরিক্ত চিনিযুক্ত খাবার,   ভাজা ও ফ্যাটসমৃদ্ধ খাবার,   সাহরির সময় অতিরিক্ত চা,

  অধিক লবণ সমৃদ্ধ খাবার,

কোন বেলায় কী খাবেন

সাহরির খাবার : সাহরির সময় হচ্ছে দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খাবার, তাই এটি যেন কোনোভাবেই বাদ না পড়ে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। যদিও সারা দিনের ক্ষুধা সাহরির মাধ্যমে নিবারণ করা সম্ভব নয়, কিন্তু আমরা যদি খাবার নির্বাচনের ক্ষেত্রে একটু খেয়াল রাখি তাহলে অনায়াসেই ক্ষুধাকে বিলম্বিত করতে পারি। সাহরির খাবার নির্বাচনে নজর দিতে হবে আমিষ, জটিল শর্করা ও খাদ্য আঁশের প্রতি।

সাহরিতে যা খাওয়া ভালো : লাল চালের ভাত এক থেকে দেড় কাপ মিক্সড সবজি ১ কাপ, মাছ বা মুরগি ১ টুকরা, ডাল ১ কাপ, সঙ্গে দই অথবা ননীবিহীন দুধ ১ কাপ।

স্বাস্থ্যসম্মত ইফতার

সারা দিন রোজা রাখার পর স্বাভাবিকভাবেই রক্তের গ্লুকোজের মাত্রা কমে যায়। সে জন্য ইফতারের শুরুটা হওয়া দরকার কিছুটা দ্রুত হজম হয় এমন ধরনের শর্করা জাতীয় খাবার দিয়ে। এ ছাড়া আমাদের পরিপাকতন্ত্র দীর্ঘক্ষণ খাবারবিহীন অবস্থায় থাকার কারণে একে খাদ্য পরিপাকের জন্য প্রস্তুত করতে প্রয়োজন হয় যেকোনো হালকা গরম তরল খাবার। সেই সঙ্গে দরকার পর্যাপ্ত পরিমাণ পানির। ইফতারের সময়কার খাবার কে দুই ভাগে ভাগ করে খাওয়া স্বাস্থ্যসম্মত। প্রথম ভাগ মাগরিবের নামাজের পূর্বে আর দ্বিতীয় ভাগ মাগরিবের নামাজের পর। একসঙ্গে অধিক খাওয়া শরীরের নানাবিধ জটিলতা তৈরি করাসহ শরীরকে ক্লান্ত করে তুলতে পারে।

ইফতারিতে যা খাওয়া ভালো

খেজুর ৩-৪টি, হালকা গরম ভেজিটেবল  বা  চিকেন স্যুপ ১ বাটি,  ছোলা সিদ্ধ আধা বাটি, যেকোনো ফলের জুস বা লাবাংগ ১ গ্লাস।

মাগরিবের নামাজের পর : পায়েস, দই চিড়া, ওটস ১ বাটি, কলা  বা  আপেল ১টা।

রাতের খাবার

রোজারে মাসে রাতের খাবারটা কিছুটা হালকা হলে ভালো। খাবারে সব রকমের ফুড গ্রুপ থেকে কিছুটা রাখা দরকার।

রাতের খাবার : ভাত ১ কাপ; মাছ বা মুরগি ১ টুকরা; সবজি ১ কাপ; সালাদ ১ বাটি

প্রতি বেলায় খেতে পারেন

৩টি খেজুর, ১ কাপ সবজির স্যুপ, ১ কাপ লাবাং লাচ্ছি বা কম ননীযুক্ত দুধ, ২ কাপ ভাত বা ২টি ছোট পাতলা রুটি, ১ কাপ সবজি, ১ কাপ সালাদ, ১ টুকরা ১০০ গ্রাম পরিমাণ মাছ অথবা মুরগির মাংস। মনে রাখবেন ইফতার এবং সাহরির সঙ্গে পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি পান করবেন। রক্তের গ্লুকোজের মাত্রা নিয়মিত পরিমাপ করুন।

ব্যায়াম

রমজানে সুস্থতা নিশ্চিত করতে ইফতারের ২ ঘণ্টা পর ১৫ থেকে ২০ মিনিট হেঁটে আসুন।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত