ভয় আর উৎকণ্ঠায় থমকে গেছে ইরানের স্বাভাবিক জীবন

আপডেট : ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০২:১৫ এএম

ইরানের আকাশে-বাতাসে এখন যুদ্ধের দামামা। যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক হামলার গুঞ্জনে দেশটির শহরগুলোতে নেমে এসেছে চরম অস্থিরতা। দিন কাটছে গভীর উদ্বেগে, আর রাত কাটছে নির্ঘুম। গত ৫০ দিনেরও বেশি সময় ধরে চলা সরকারবিরোধী আন্দোলন দমনের পর উদ্ভূত পরিস্থিতিতে জনমনে এখন কেবলই অনিশ্চয়তা।

ইরানের তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশ এখন সারাক্ষণ প্লেন ও জাহাজ ট্র্যাকিং অ্যাপগুলোতে চোখ রাখছে। বাইরে থেকে কোনো হামলা আসছে কি না, তা নিয়ে যেমন ভয় আছে, তেমনি আন্দোলন দমনের পর অনেকের মধ্যে গোপনে বা প্রকাশ্যে বিদেশি হস্তক্ষেপের প্রত্যাশাও দেখা যাচ্ছে। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক অবস্থানে সেই আশায় ভাটা পড়েছে। বিক্ষোভকারীদের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিলেও ট্রাম্প এখন কূটনীতির দিকে বেশি ঝুঁকেছেন বলে মনে করা হচ্ছে।

আন্দোলন দমনে সহিংসতার মাত্রা নিয়ে বিতর্ক রয়েই গেছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা 'হারানা' জানিয়েছে, নিহতের সংখ্যা অন্তত ৭,০০৭ জন, যার তদন্ত এখনো চলছে। যদিও ইরান সরকারের সরকারি হিসাবে এই সংখ্যা ৩,১১৭। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি মাই সাতো জানিয়েছেন, ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট ও ব্যাপক ধরপাকড়ের কারণে সহিংসতার প্রকৃত ভয়াবহতা নিরূপণ করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

চলতি সপ্তাহে জেনেভায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে তৃতীয় দফার আলোচনা কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয়েছে। যদিও কিছু অগ্রগতির আভাস পাওয়া গেছে, তবে আলোচনার ব্যর্থতা বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, পিছু হঠার চেয়ে আঞ্চলিক যুদ্ধ বেছে নেওয়া ইরানের বর্তমান নেতৃত্বের জন্য অস্বাভাবিক নয়। এমনকি সামরিক হামলার মুখে ইরান 'পোড়ামাটি নীতি' গ্রহণ করতে পারে বলেও গোয়েন্দা পর্যবেক্ষকরা সতর্ক করেছেন।

মানবাধিকার কর্মী ও আইনজীবীদের ওপর অব্যাহত চাপ, নজরদারি ও গ্রেফতারের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মাই সাতো। তিনি একে ইরানের মানবাধিকার ইতিহাসের অন্যতম 'অন্ধকার সময়' বলে অভিহিত করেছেন। অন্যদিকে, সরকারি ঘরানার সোশ্যাল মিডিয়া চ্যানেলগুলোতে দুটি ভিন্ন সুর শোনা যাচ্ছে। এক পক্ষ আলোচনার মাধ্যমে শান্তি চাইছে, অন্য পক্ষ এই লড়াইকে 'ভালো ও মন্দের' অনিবার্য যুদ্ধ হিসেবে দেখছে।

ইরানের নববর্ষ নওরোজ সামনে থাকলেও বাজারে কোনো আমেজ নেই। ৬২ শতাংশের বেশি মুদ্রাস্ফীতি আর মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় জনজীবন বিপর্যস্ত। ব্যবসায়ীরা বলছেন, অনিশ্চয়তার কারণে ক্রেতা নেই বললেই চলে। এরই মধ্যে সাধারণ মানুষের মধ্যে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে দেখা যাচ্ছে। জরুরি প্রয়োজনে শুকনো খাবার, টর্চলাইট ও পানির বোতল মজুত করছেন অনেকেই।

মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে বেশকিছু দেশ তাদের নাগরিকদের ইরান ছাড়ার পরামর্শ দিয়েছে। আগামী কয়েক সপ্তাহ ইরানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে কূটনীতির ক্ষীণ আশা, অন্যদিকে যুদ্ধের চরম বিভীষিকা- এই দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে কোটি কোটি ইরানি এখন এক অমীমাংসিত সংকটের প্রহর গুনছে।

সূত্র: বিবিসি

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত