পুলিশের পোশাক নিয়ে যেন ‘চোর-পুলিশ’ খেলা চলছে। যারা ভাবছেন, পোশাক পাল্টে ফেললেই তারা সত্যিকার নিরাপত্তা সেবা দিতে পারবেন তাদের ভেতরে যে আতঙ্ক কাজ করছে ২৪-এর জুলাই থেকে, পোশাক কি তা উপড়ে ফেলতে পারবে? নাকি মানসিক ট্রমার ভয় ও মানসিক ভীতির অন্ধকার থেকে তাদের জনগণের নিরাপত্তা ও সেবার ধর্মে ফিরিয়ে আনা যাবে? আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব তারা পালন না করে, ফ্যাসিস্টের নির্দেশে দেশের ভেতরে যে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল, সেই মানসিকতার অন্ধকার থেকে নিজেদের বাইরে নিয়ে আনতে পারবে কি নতুন পোশাক? না, পারবে না। মানসিকভাবে তারা জনগণের বিপক্ষে সশস্ত্র ভূমিকা নিয়ে যে অপরাধ করেছিল, তা সহজে মুছে ফেলা যাবে না। পোশাক পাল্টে যারা এই কাজ করতে চেয়েছিলেন, তাদের বাহানা কমিশন-বাণিজ্য।
মনে রাখতে হবে, অতীতের পুলিশ আর হাসিনার ফ্যাসিবাদী পুলিশ এবং বর্তমান পুলিশ একই অন্বয়ে দাঁড়িয়ে নেই। এদের যদি জনগণের নিরাপদ প্রহরী হিসেবে তৈরি করতে হয়, তাহলে সবার আগে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। সেই প্রশিক্ষণে থাকবে সাংস্কৃতিক শিক্ষা। থাকতে হবে পুলিশের মৌলিক নীতি ও আদর্শবোধ। থাকতে হবে জনগণকে সেবা দেবার মনন ও মানসিকতা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নামে মানুষ হত্যার হাসিনার দৃষ্টিভঙ্গি যে মানবতাবিরোধী কাজ, সেটা তাদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বুঝতে হবে। তাদেরই সবকিছুর আগে মানসিক ও মানবিক প্রশিক্ষণ নিতে হবে। না হলে তারাই আবারও অন্যায় অর্ডার মেনে মানুষ হত্যার নগ্ন-নিষ্ঠুরতায় জড়াবে। আমরা কি ওই রকম পুলিশ ও তার প্রশাসনের কাজ দেখতে চাই? নাকি সিন্ডিকেট করে পোশাক পাল্টে নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দেবে তারা? যা প্রয়োজন নেই, সেই কাজের উদ্যোগ নেওয়া দুর্নীতি এটা সাধারণ মানুষও বোঝে। পুলিশের পোশাক পাল্টে নতুন পোশাকে তাদের মাঠে নামানোর পক্ষে ছিলেন হেডকোয়ার্টারের কয়েকজন কর্মকর্তা। জড়িত ছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের দুই উপদেষ্টা আর বাইরে থেকে কলকাঠি নেড়েছেন এক সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা। এই সিন্ডিকেট এতটাই শক্তিশালী যে, গত নভেম্বর মাসেই নতুন পোশাক পুলিশদের পরতে বাধ্য করা হয়। তড়িঘড়ি করে পোশাক পাল্টানোর ক্ষতি শতকোটি টাকা। এই ক্ষতির দায় কে নেবে? রিপোর্টে বলা হয়েছে, এক ডজন কর্মকর্তা ফেঁসে যাবেন এই অন্যায় ও অযৌক্তিক কাজের জন্য। অন্যায়, অন্যায্য ও নির্মম অপরাধের ক্ষত কি পুলিশ ঢেকে দিতে পারবে? এমনিতেই বর্তমান পুলিশ ২৪-এর রাজনৈতিক হত্যাযজ্ঞের পর ট্রমার মধ্যে। তাদের মানসিক শক্তি বাড়ানো উচিত ছিল। নতুন পুলিশ নিয়োগ করে সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি সামাল দেওয়া ছিল জরুরি কাজ।
পুলিশ যে আদর্শচ্যুত, ঘুষ-দুর্নীতির জন্য বিখ্যাত, আইনি কাজে তারা দুর্বৃত্তের মতো আচরণ করে, এখনো সড়ক থেকে তোলা তোলে তারা, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের চেয়ে তারা বাস-ট্রাক থেকে টাকা নিতে ব্যস্ত থাকে। সড়কে জ্যামে যাত্রীরা নাকাল হলেও তাদের বোধ জাগ্রত হয় না। এই পুলিশকে পোশাক পাল্টে দিলেই তারা ঘুষ খাবে না, তোলা তুলবে না, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করবে এমনটা ভাবাও অন্যায়। এই অন্যায়কেই প্রশ্রয় দিচ্ছে তারা। আবারও যদি পুরনো পোশাকে তারা ফেরে তারপরেও তাদের আচরণগত পরিবর্তন হবে না। পুরনো পোশাক কি কিনতে হবে না? নাকি যেগুলো জমা নেওয়া হয়েছে সেগুলো ফেরত দিলেই হবে? আমরা আর জনগণের টাকা ব্যয় হতে দেখতে চাই না পুলিশের কাপড়ের জন্য। আমরা নিরাপদ সমাজ ও রাজনৈতিক- সংস্কৃতিতে পরিবর্তন দেখতে চাই। যারা সিন্ডিকেট করে এই অপকর্ম করেছে, বাহিনীর বৃহত্তর স্বার্থে তাদের চিহ্নিত করা উচিত এবং তাদের বিচারের সম্মুখীন করা জরুরি। তাহলে ভবিষ্যতে এমন দুষ্কর্মে সাহসী হবে না কেউ।