‘খন্ডযুদ্ধ’ প্রভাব দ্রুত কাটবে

আপডেট : ০২ মার্চ ২০২৬, ০২:১১ এএম

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ইরানে সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হয়েছেন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এ সংঘাতকে খন্ডযুদ্ধ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মার্কিন ঘাঁটিসহ ইসরায়েলে ইরান থেমে থেমে হামলা করছে। তবে দীর্ঘ মেয়াদে দেশটি এটি বজায় রাখতে পারবে না বলে অনেকের ধারণা। পাশাপাশি ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা দিলেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে এলে বিশ্ববাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ পথটি সচল হয়ে উঠবে। কারণ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করে বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যে তাদের যে নিরাপত্তাজনিত হুমকি ছিল, তা কেটে গেছে। অর্থাৎ ট্রাম্পের কথায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর বাড়তি আক্রমণ না করার ইঙ্গিত পাওয়া যচ্ছে। ফলে আরব অঞ্চলের চলমান সংঘাতের প্রভাব দ্রুত কেটে যাবে বলে ব্যবসায়ী ও বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরানের ওপর এবং তাদের নেতার ওপর মার্কিন আঘাত মধ্যপ্রাচ্যকে নতুন অস্থিরতার মুখে ঠেলে দিয়েছে। সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে।

জানা গেছে, মধ্যপ্রাচ্যে যে কোনো সংকট তৈরি হলে বিশ্ব জুড়ে একটি চিন্তাই প্রথম আসে, সেটি হলো জ্বালানি তেলের দামের কী হবে। ইরানের হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ পরিবাহিত হয়। সংঘাত তীব্র হলে সরবরাহ বিঘিœত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে, তাতে অবধারিতভাবেই তেলের দাম বাড়বে। যা ইতিমধ্যে ২০ শতাংশ বেড়ে ৭৩ ডলারে অবস্থান করছে। আর গতকাল রবিবার আন্তর্জাতিকভাবে সাপ্তাহিক ছুটি থাকায় পণ্যটির বাজার পরিস্থিতির চিত্র বুঝা যাচ্ছে না। তবে, আজ সোমবার বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সঙ্গে সোনার দামও বাড়তে পারে।

আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, সংঘাত সীমিত পরিসরে থাকলেও অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ৮০ ডলার ছুঁতে পারে। তবে দীর্ঘ সময়ের জন্য সরবরাহ ব্যাহত হলে ১০০ ডলার বা তারও বেশি উঠতে পারে।

যুদ্ধ পরিস্থিতির বিষয়ে বাংলাদেশের ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান সরকারের পাল্টা শুল্কনীতির কারণে বিশ্ববাণিজ্য গত বছর থেকে টালমাটাল অবস্থা। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা, নতুন করে চাপ তৈরি করেছে। ইতিমধ্যে বাণিজ্য জাহাজ চলাচলে সতর্কতা দেখাচ্ছে। রপ্তানি কার্যক্রম আপাতত স্থগিত রয়েছে। উড়োজাহাজ চলাচল সীমিত করা হয়েছে। ক্রেতারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রয়েছে এবং বাণিজ্য পরিস্থিতি নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন। ফলে চলতি বছর বিশ্ববাজারে অস্থিরতা বজায় থাকবে বলে ধারণা করছেন তারা।

বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি- বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ চলছে। যে কোনো যুদ্ধই ব্যবসায়ীদের জন্য চিন্তার কারণ। অনেকে জানতে চাচ্ছে, আমাদের অবস্থা কী? বিষয় হচ্ছে- হরমুজ প্রণালি দিয়ে আমাদের কোনো পণ্য যায় না। তবে রাস্তাটি বন্ধ করা হয়েছে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রভাব পড়তে পারে। যা এই মুহূর্তে আমাদের ওপর আসবে বলে মনে হচ্ছে না। তবে- যুদ্ধ যত তাড়াতাড়ি শেষ হবে, ততই আমাদের জন্য মঙ্গল হবে। 

বিশ্লেষকরা বলছেন, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার জেরে সাধারণত আর্থিক বাজারে অনিশ্চয়তা ছড়িয়ে পড়ে। অর্থাৎ ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান সংঘাত আঞ্চলিক মিত্র বা তাদের সহযোগী গোষ্ঠীর মধ্যে ছড়িয়ে পড়লে যুদ্ধ পরিস্থিতি আরও বিস্তৃত হবে। এতে বিশ্বঅর্থনীতিতে অস্থিরতা ও চাপ দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা বাড়বে।

এ প্রসঙ্গে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা বা যুদ্ধের প্রভাব নির্ভর করবে এর স্থায়িত্ব কতদিন হবে? এর ওপর নির্ভর করবে অস্থিতিশীলতার অবস্থা। সেটা এখনো বলা সম্ভব না। কারণ যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের প্রধান প্রভাবশালী দেশ। ইরান তাদের সঙ্গে কতটা কুলাবে সেটি দেখার বিষয়। আমি মনে করি, ইরানের সেই পরিমাণ শক্তি বা সামর্থ্য নেই। ফলে এই আক্রমণ ও পাল্টা আক্রমণ দীর্ঘায়িত হবে বলে মনে হয় না। তবে ২৮ ফেব্রুয়ারির ঘটনায় বিশ্ব জুড়ে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। স্থল ও আকাশপথ অনেকটা বন্ধ হয়ে পড়েছে। বিমানবন্দরে বাংলাদেশ থেকে অন্য দেশে যেতে সমস্যা হচ্ছে। বিশেষ করে, আরব কেন্দ্রিক অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে একই সমস্য বিরাজ করছে। এ ধরনের পরিস্থিতি আগামী এক দুই সপ্তাহ থাকতে পারে। একে সাময়িক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা যাবে। দীর্ঘমেয়াদি নয়। আর এর ফলে অর্থনীতিতে তেমন কোনো প্রভাব আসবে না।

তিনি বলেন, এখন প্রশ্ন হচ্ছে আসলেই কি পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে। কথা হচ্ছে স্পষ্টভাবে এসব বিষয়ে বলা কঠিন। তবে- ইরানে যুক্তরাষ্ট্র আক্রমণ করবে, এটি বেশ কিছুদিন থেকে ধারণা করা হচ্ছিল। এদিক বিবেচনায় ইতিমধ্যে জ্বালানি তেলের দাম এক দফায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে ব্যারেল ৭০ থেকে ৭২ ডলারে উঠেছে। আজ (গতকাল) রবিবার হওয়ায় বাজার পরিস্থিতি বুঝা যাচ্ছে না। আগামীকাল (আজ) কী হয় তা দেখার বিষয়। যাই হোক- যে কোনো অস্থিতিশীল পরিস্থিতি দেশ বিদেশে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রভাব তৈরি করে এবং হচ্ছে। ফলে বলা যচ্ছে- যুদ্ধ দীর্ঘ মেয়াদে না হলে, দৃশ্যমান প্রভাব হবে না। চলমান সংকট দ্রুত কেটে যাবে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত