প্যারামাটা পার্কের সবুজে ঋতুদের মিশে যাওয়া

আপডেট : ০২ মার্চ ২০২৬, ১২:১৯ এএম

কমনওয়েলথ ব্যাংক স্টেডিয়ামের গা ঘেঁষে বিস্তৃত প্যারামাটা পার্ক। মাঝখান দিয়ে বয়ে চলেছে ছোট্ট প্যারামাটা নদী। ছিমছাম স্টেডিয়ামের এক প্রান্তে অ্যাক্রেডিটেশন বিতরণ সেন্টারের দায়িত্বে জনাপাঁচেক বৃদ্ধ নারী-পুরুষ। এরা সবাই ওমেন্স এশিয়ান কাপের স্বেচ্ছাসেবক। মিডিয়া পাসের খোঁজে সংবাদকর্মীরা উপস্থিত হতেই তাদের মধ্যে সে কী ব্যস্ততা। হাসিমুখে একজন বসতে বলছেন। আরেকজন এসে ছবি তুলে নিয়ে যাচ্ছেন। আরেকজন কাগজে স্বাক্ষর নিতে ব্যস্ত। একজন এসে কফি খাওয়াতে চাইলেন। একজনের কাজ তারা পাঁচ-ছয়জন মিলে ভাগ করে নিচ্ছেন। অবসর জীবনে হঠাৎ পাওয়া ব্যস্ত হওয়ার সুযোগটা তারা ভীষণ উপভোগ করছেন। তাদের অমায়িক ব্যবহারে দ্বিতীয়বারের মতো মুগ্ধ হলাম। প্রথম মুগ্ধতার আবেশ ছড়িয়ে দিয়েছিল স্টেডিয়াম ও আশপাশের সৌন্দর্য। জোড়া মুগ্ধতার আবেশ নিয়ে মিডিয়া অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড হাতে বের হতেই থমকে দাঁড়াতে হলো! যাদের অনুসরণ করতে, যাদের গল্প ভক্তদের কাছে পৌঁছে দিতে স্বদেশ থেকে সিডনি উড়ে আসা, সেই বাংলাদেশ নারী ফুটবল দল একেবারে হাত ছোঁয়া দূরত্বে দাঁড়িয়ে! শেষ মুহূর্তের ব্যস্ত অনুশীলন সূচির ফাঁকে তারা এসেছেন প্যারামাটা পার্কের সবুজে মিশে যেতে।

সকালে সিডনির আরেক প্রান্তে জুবিলি স্টেডিয়ামে অনুশীলন সেরে হোটেলে ফেরা দলের ফুটবলাররা লাঞ্চ সেরেই বের হয়েছিলেন হাঁটাহাঁটি করতে। তিনদিন আগে পার্ক রয়্যাল হোটেলে উঠেছে বাংলাদেশ দল। হোটেলটা প্যারামাটা নদীর ধারে, কমব্যাংক স্টেডিয়ামের খুব কাছে। দুপুর খাওয়া শেষে হাঁটতে হাঁটতে সবাই চলে এসেছেন স্টেডিয়ামের আঙিনায়। দুদিন পর এখানেই তাদের চীন পরীক্ষা। বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের এবারের লক্ষ্য দশম শিরোপা। গ্রুপে শক্তিশালী উত্তর কোরিয়া আছে, তাই প্রথম ম্যাচের নবিশ প্রতিপক্ষকে (বাংলাদেশ) একরত্তিও ছাড় দেবে না চীন, সেটা বলাই যায়। অগ্নিপরীক্ষার আগে পরীক্ষা কেন্দ্র ঘুরে দেখার সুযোগটা তাই হাতছাড়া করতে চাননি ঋতুপর্ণা, আফঈদা, মারিয়ারা। আর স্টেডিয়াম দেখতে এসে বাড়তি হিসেবে তারা মিশে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন অনিন্দ্য সুন্দর প্যারামাটা পার্কে। 

নিরাপত্তার বাড়াবাড়ি রকমের কড়াকড়ি নেই স্টেডিয়াম আঙিনায়। স্টেডিয়াম লাগোয়া ওল্ড কিংস ওভাল গ্রাউন্ডে এক দল তরুণী ক্রিকেটার মনোযোগী খেলায়। গ্রাউন্ডের চারদিকের কাঠের প্রাচীরের বাইরে উপস্থিত এক দল মানুষ। রবিবার সাপ্তাহিক ছুটি। তাই সিডনি শহরজুড়ে ছড়িয়ে থাকা সবুজ মাঠগুলোতে অনেক মানুষের আনাগোনা। স্কুলপড়–য়া বাচ্চারা ব্যস্ত ক্রিকেট, ফুটবল খেলায়। মাঠের পাশে তাদের অভিভাবকদের যেন পিকনিকের আয়োজন। ব্যাগভর্তি খাবার সঙ্গে নিয়ে এসে তারা খেলা দেখছেন, আবার ব্যস্ত সপ্তাহ শেষে প্রিয় মানুষের সঙ্গে দারুণ সময় কাটাচ্ছেন। কমব্যাংক স্টেডিয়াম লাগোয়া মাঠ ও পার্কে তাই অনেক মানুষের আনাগোনা। মারিয়া, মনিকারাও এখানে এসেছেন কঠোর অনুশাসন থেকে খানিকটা মুক্তি পেতে। সঙ্গী দলের নিরাপত্তা অফিসার ও লিয়াজোঁ অফিসার। হেড কোচ, ম্যানেজার নেই বলেই মেয়েরা ব্যস্ত হয়ে পড়লেন অনিন্দ্য সুন্দর পরিবেশে নিজেদের ফ্রেমবন্দি করতে। দূর থেকে তাদের দেখে মনেই হয়নি কয়েক ঘণ্টা পরেই এই স্টেডিয়ামে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পরীক্ষায় নামতে হবে তাদের।   

এর মাঝেই খবর ছড়িয়েছে ম্যাচের আগের দিন অফিশিয়াল ট্রেনিং সেশনটা কমব্যাংক স্টেডিয়ামে করার সুযোগ পাবে না কোনো দল। এএফসি এই টুর্নামেন্টে নতুন এই নিয়ম করেছে, আগের দিন ম্যাচ ভেন্যুতে অনুশীলন করার চিরায়িত সুযোগটা রাখা হয়নি। তাই হয়তো দুদিন আগে স্টেডিয়াম আঙিনায় ঘুরেফিরে আফঈদাদের একটু ধাতস্ত হওয়ার চেষ্টা।

চীনের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচ। একে তো বর্তমান চ্যাম্পিয়ন, তার ওপর সিডনি জুড়েই চীনা মানুষের ছড়াছড়ি। কমব্যাংক স্টেডিয়ামের গ্যালারির একটা বড় অংশই থাকবে চীনাদের দখলে। তাই বলে প্রবাসী বাংলাদেশিরাও পিছিয়ে নেই। আঙিনায় প্রিয় দলের খেলা দেখতে তারাও উন্মুখ। বেশ ভালো দামে আগেভাগেই টিকিট সংগ্রহ করেছেন অনেকে। পরিবারসহ ঋতুদের খেলার সাক্ষী হতে অনেকে আগেভাগে ছুটিও নিয়ে রেখেছেন। তাদেরই একজন ওয়াহিদুজ্জামান তালাত। ২১ বছর ধরে আছেন সিডনিতে। চাকরির পাশাপাশি আবাসন ব্যবসায় জড়িত। স্ত্রীও বড় চাকুরে। দুই সন্তান নিয়ে এই দম্পতি খেলা দেখবেন বলে দেশ থেকে জার্সি আনিয়েছেন। জানালেন, তাদের মতো অনেক পরিবার প্রস্তুতি নিয়েছে গ্যালারি থেকে গলা ফাটানোর। তাদের একটাই চাওয়া ইতিহাসের পা রাখার দিনটি বাংলাদেশের মেয়েরা স্মরণীয় করে রাখুক ভালো ফুটবলে।

বাস্তবতা তাদেরও জানা। তাই আগ বাড়িয়ে কেউই চীনকে হারানোর প্রত্যাশার কথা বলছেন না। তালাত বলেন, ‘আমরা ছয়-সাতজন বন্ধু পরিবারের সবাইকে নিয়ে দুটি খেলাই দেখব। এর জন্য আগেভাগেই আমরা নিজ নিজ প্রতিষ্ঠান থেকে ছুটি নিয়ে রেখেছি। আমাদের মতো আরও অনেকেই মাঠে থাকবে। আমাদের একটাই চাওয়া মেয়েরা যাতে ভয়ডরহীন ফুটবল খেলে। গত কয়েক বছর ধরেই তাদের কথা শুনে আসছি যে তারা ভালো ফুটবল খেলছে। এখন তাদের সামনে থেকে দেখার সুযোগ। আমরা জানি চীন অনেক শক্তিশালী। তবে গ্যালারিতে আমরা দলকে বুঝতে দেব না যে চীন আমাদের চেয়ে এগিয়ে। আমাদের সমর্থন থাকবে সব সময়। কেবল একটাই প্রত্যাশা তাদের খেলা দেখে যাতে মন ভরে।’

২০২৪ সালে বাংলাদেশ পুরুষ ফুটবল মেলবোর্নে এসেছিল এশিয়ান কাপের বাছাই খেলতে। সেই ম্যাচ দেখতে আরেক প্রবাসী রুবেল সিডনি থেকে উড়ে গিয়েছিলেন মেলবোর্নে। তবে অস্ট্রেলিয়ার কাছে ৭-০ গোলে হারের হতাশা নিয়ে ফিরেছিলেন। আগামীকাল তিনিও থাকবেন কমব্যাংক স্টেডিয়ামে। তবে এবার আর হতাশ হতে চান না, ‘এটা বলছি না চীনকে বাংলাদেশ হারিয়ে দেবে। তবে খুব করে চাচ্ছি যাতে মাঠ থেকে হতাশা নিয়ে ফিরতে না হয়। চীনের বিপক্ষে একটা লড়াকু বাংলাদেশ দেখতে চাই। ছেলেদের দল যেভাবে অসহায় আত্মসমর্পণ করেছিল অস্ট্রেলিয়ার কাছে, চরম নেতিবাচক ফুটবল খেলেছিল। এভাবে যদি মেয়েরা খেলে, তাহলে আরেকটা কষ্ট সঙ্গী হবে।’

এশিয়ান কাপ অভিষেকের দুদিন আগে এভাবে দলের দেখা পাওয়াটা আমার জন্য ছিল অপ্রত্যাশিত। সিডনির প্রবাসী বাঙালিরা এ রকমই একটা অপ্রত্যাশিত ম্যাচের প্রত্যাশা নিয়ে মাঠে আসবেন কাল। জয়-পরাজয় নয়, ঋতুদের কাছে এই প্রবাসীদের চাওয়া একটাই ভালো ফুটবল। প্যারামাটা পার্কের সবুজে মিশে গিয়ে প্রত্যাশা পূরণের মনোবলটাই যেন কুড়িয়ে নিতে চেয়েছেন বাংলাদেশের মেয়েরা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত