খামেনির মৃত্যুই কি শেষ?

আপডেট : ০২ মার্চ ২০২৬, ০৮:৩১ এএম

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলা ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে নিয়ে এসেছে। গত শনিবার সকালে তেহরানসহ বিভিন্ন স্থানে আকাশপথে এ হামলা শুরু হয়। দেশটিতে শাসক বদলানোর জন্য আগাম ঘোষণা দিয়ে চালানো এ হামলায় সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হন। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম তাসনিম ও ফার্স নিউজ এ মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে। এদিকে গতকাল রবিবার তেহরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যৌথ ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহত হয়েছেন ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদ। খামেনি হত্যার প্রতিশোধ নিতে পাল্টা হামলা চালাচ্ছে ইরান। ফলে পরিস্থিতি এই মুহূর্তে শান্ত হয়ে যাবে, তা বলা যাচ্ছে না। বরং পুরো মধ্যপ্রাচ্যই সংঘাতপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

মধ্যপ্রাচ্যে ইসলামি শাসনতন্ত্রের অধীনে ১৯৭৯ সাল থেকে পরিচালিত শিয়াপ্রধান ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলায় খামেনির মৃত্যুর ঘটনার নানামুখী তাৎপর্য রয়েছে। ৪৭ বছরের এ শাসনামলে ইরান কখনোই এমন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েনি। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, ইরানের ইসলামি শাসনব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে।

শুধু খামেনি নন, হামলায় প্রতিরক্ষামন্ত্রী আজিজ নাসিরজাদেহ, বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর কমান্ডার মোহাম্মদ পাকপুর, সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান জেনারেল আবদুর রহিম মুসাভিসহ অন্তত ৪০ জন শীর্ষ কর্মকর্তা নিহত হওয়ার খবর এসেছে বিভিন্ন গণমাধ্যমে; যদিও ইরান এখনো তা আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি।

ইরানও অবশ্য ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যে বাহরাইন, কাতার, কুয়েত, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ (ইউএই) বিভিন্ন স্থানে মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়।

খামেনির মৃত্যুর বদলা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ইরান। দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি হত্যার প্রতিশোধ নেওয়া ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ‘বৈধ অধিকার ও দায়িত্ব’; সব শক্তি প্রয়োগ করে এর প্রতিশোধ নেওয়া হবে। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) বলেছে, ইরানিদের প্রতিশোধের হাত থেকে তারা রেহাই পাবে না। ইতিমধ্যে পাল্টা হামলা হিসেবে ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের ২৭টি ঘাঁটিতে হামলা করেছে ইরান।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়, ইরানের হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিগুলোয় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। গতকাল ইসরায়েলের বেইত শেমেশ এলাকায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় আটজন নিহত হয়। অন্যদিকে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরুর পর এই প্রথম মার্কিন বাহিনীর পক্ষ থেকে প্রাণহানির খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, শনিবার থেকে শুরু হওয়া এই অভিযানে এ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের তিনজন সেনা নিহত হয়েছে।

ওই তিন সেনা ‘কিলড ইন অ্যাকশন’ (কেআইএ) বা সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে দায়িত্ব পালনকালে প্রাণ হারিয়েছে। এ ছাড়া এই অভিযানে আরও পাঁচ মার্কিন সেনাসদস্য ‘গুরুতর আহত’ হয়েছে। সামরিক নিয়ম অনুযায়ী, নিহতদের পরিবারকে জানানোর ২৪ ঘণ্টা পার না হওয়া পর্যন্ত তাদের নাম ও পরিচয় প্রকাশ করা হবে না বলে জানায় সেন্টকম।

এ যুদ্ধ শুরুর আগেই খামেনি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তিনি গুপ্তহত্যার শিকার হলে দেশ পরিচালনার ভার নেবেন খামেনির বিশ্বস্ত কৌশলবিদ হিসেবে পরিচিতি ইরানের শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা আলি লারিজানি। গতকাল এ কর্মকর্তা জানান, সংকটকালে শাসনভার পরিচালনার জন্য তিন সদস্যের একটি সাময়িক পরিষদ গঠন করেছে ইরান। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইরানকে ধ্বংসের চেষ্টার অভিযোগ আনেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, কোনো ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী’ এ পরিস্থিতির সুযোগ নিতে চাইলে তাদের কঠোর জবাব দেওয়া হবে।

খামেনির শাহাদাতবরণে দেশ জুড়ে ৪০ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছে দেশটির সরকার। একই সঙ্গে তার স্মরণে সাত দিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। আলি খামেনি নিহত হওয়ার ঘটনায় প্রতিবেশী দেশ ইরাক তিন দিনের জাতীয় শোক ঘোষণা করেছে।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতার মৃত্যুর প্রতিক্রিয়ায় ইরানের বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি) এক বিবৃতিতে বলেছে, সবচেয়ে নিষ্ঠুর সন্ত্রাসী ও মানবতার হত্যাকারীদের হাতে খামেনির শাহাদাতবরণের ঘটনা এটাই প্রমাণ করে, এ মহান নেতার বৈধতা এবং তার আন্তরিক সেবাগুলো স্বীকৃত। শত্রুরা ইরানিদের প্রতিশোধের হাত থেকে তারা রেহাই পাবে না। দেশীয় ও বিদেশি ষড়যন্ত্র মোকাবিলায় আইআরজিসি অটল থাকবে বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের বরাতে জানা গেছে, খামেনি হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধের অঙ্গীকার করার কয়েক ঘণ্টা পর পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে আইআরজিসি ষষ্ঠ দফায় হামলা চালিয়েছে। সংস্থাটি জানায়, ইসরায়েল ও ওই অঞ্চলে অবস্থিত ওয়াশিংটনের সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে ‘ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন’ হামলা চালিয়েছে তারা। তাদের দাবিমতে, যুক্তরাষ্ট্রের ২৭টি ঘাঁটির পাশাপাশি ইসরায়েলের তেল নভ বিমানঘাঁটি, তেল আবিবে অবস্থিত ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর কমান্ড সদর দপ্তর হাকিরিয়া ও একই শহরের একটি বিশাল প্রতিরক্ষা শিল্প কমপ্লেক্সে হামলা চালানো হয়েছে। আইআরজিসি আরও বলেছে, ইরানি বাহিনী একের পর এক ‘শক্তিশালী চপেটাঘাতের’ মাধ্যমে প্রতিশোধের ভিন্নধর্মী ও কঠোর পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করবে। ইরানের হামলার পর সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে ও কাতারের রাহধানী দোহার ওপর একাধিক বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, তেহরানের শত্রুর পাশে থাকলে পরিণতি ভোগ করতে হবে প্রতিবেশী দুই দেশে হামলা চালিয়ে ইরান এ বার্তাই দিতে চাইছে।

ইরানের হামলায় আমিরাতে ৩ জন নিহত, ৫৮ জন আহত; কুয়েতে ১ জন নিহত ৩২ জন আহত হয়েছে। ইসরায়েলের বেইত শেমেশ এলাকায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৮ জনে দাঁড়িয়েছে। এ ঘটনায় ২৭ জন আহত হয়েছে, তাদের মধ্যে দুজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানানো হয়েছে। এ হামলার কথা স্বীকার করেছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। ইসরায়েলের মাজেন ডেভিড আডোম অ্যাম্বুলেন্স পরিষেবার তথ্য অনুযায়ী, গতকাল জেরুজালেমের ৩০ কিলোমিটার পশ্চিমে ইসরায়েলের বেইত শেমেশ এলাকায় ইরান ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। ইরানের বিপ্লবী রক্ষী বাহিনী আইআরজিসি জানিয়েছে, অপারেশন ট্রু প্রমিজের পঞ্চম ধাপে দুবাইয়ের জেবেল আলিতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌযানগুলোর জন্য গোলাবারুদ বহন করা একটি জাহাজে তাদের চারটি ড্রোন আঘাত হানার পর বিস্ফোরণ ও ক্ষয়ক্ষতির ঘটনায় ওই জাহাজটি পুরোপুরি অকার্যকর হয়ে পড়েছে। কুয়েতের আবদুল্লাহ মোবারক এলাকায় নৌঘাঁটিতে ৪টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ১২টি ড্রোন আঘাত হেনেছে, সেখানকার সব স্থাপনা ধ্বংস হয়ে গেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিপুলসংখ্যক সেনা হতাহত হয়েছে। এ ছাড়া ভারত মহাসাগরে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের নৌযানের জন্য জ্বালানি নিয়ে যাওয়া একটি এমএসটি-শ্রেণির যুদ্ধ সহায়ক জাহাজেও ইরানের একটি ‘কাদের ৩৮০’ ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে।

নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে : পেজেশকিয়ান

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যার ঘটনাকে একটি ‘মহা অপরাধ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। গতকাল এক বিবৃতিতে তিনি এ হত্যাকাণ্ডের কঠোর জবাব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। পেজেশকিয়ান বলেন, এ মহা অপরাধ কখনোই জবাবহীন থাকবে না এবং এটি ইসলামি বিশ্ব ও শিয়া মাজহাবের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় তৈরি করবে। এই উচ্চপদস্থ নেতার পবিত্র রক্ত একটি গর্জনকারী ঝরনার মতো প্রবাহিত হবে এবং যুক্তরাষ্ট্র-জায়নবাদী নিপীড়ন ও অপরাধ নির্মূল করবে। ইরানি প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, ‘এবারও আমরা আমাদের সবশক্তি ও দৃঢ়তা দিয়ে এবং ইসলামি উম্মাহ ও বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষের সমর্থনে এ মহা অপরাধের হোতা ও নির্দেশদাতাদের অনুতপ্ত করতে বাধ্য করব।’

ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যে বিভিন্ন স্থানে এর আগে বিভিন্ন সময় ইসরায়েল ও মার্কিনিদের হামলায় নিহত হন ইরাকের সাবেক প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন, লিবিয়ার প্রেসিডেন্ট মুয়াম্মার গাদ্দাফি, ইরানি জেনারেল কাসেম সোলেইমানি, লেবাননের ইরানপন্থি হিজবুল্লাহর প্রধান হাসান নাসরাল্লাহ ও ফিলিস্তিনি গোষ্ঠী হামাসের রাজনৈতিক প্রধান ইসমাইল হানিয়াহ।

ওমানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের দেশটির পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র-সামর্থ্য সীমিত করার আলোচনা চলার মাঝপথে তড়িঘড়ি করে এবার তেহরানে হামলা করে খামেনির মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়।

ইরানে শাসক বদলানোর হামলায় খামেনির মৃত্যুর পর নেপথ্যে দেশটিকে আবার আলোচনার ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে ইরানিরা এবার সহসা আলোচনায় ফিরবে কি না, তা এখনই বলা কঠিন।

ট্রাম্পের সতর্কবার্তা

যুক্তরাষ্ট্রের স্থাপনা বা ইসরায়েলে প্রতিশোধমূলক হামলা হলে ইরানের বিরুদ্ধে নজিরবিহীন শক্তি প্রয়োগ করা সতর্কবার্তা দিয়েছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘ইরান মাত্রই বলেছে যে তারা আজ অত্যন্ত কঠোরভাবে আক্রমণ চালাবে, তারা এত জোরালো হামলা চালাবে, যা আগে কখনো দেখা যায়নি। তবে তাদের এমনটা না করাই ভালো। কারণ, যদি তারা এটা করে, তাহলে আমরা এমন শক্তি ব্যবহার করে তাদের আঘাত করব, যা তারাও আগে কখনো দেখেনি!’

এর আগে ট্রাম্প তার ট্রুথ সোশ্যালে খামেনির মৃত্যুর খবরটি প্রথম প্রকাশ করেন। ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের অত্যন্ত উন্নত ট্র্যাকিং সিস্টেম এবং ইসরায়েলি গোয়েন্দা তথ্যের সমন্বিত অভিযানে খামেনিকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়। ট্রাম্প তার বার্তায় বলেন, এটি ইরানের জনগণের জন্য দেশ পুনর্গঠনের এক সুবর্ণ সুযোগ।

ইরানের নতুন নেতৃত্বের সঙ্গে কথা বলতে রাজি

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানের নতুন নেতৃত্ব মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলতে চায়। তিনিও এতে রাজি হয়েছেন। আলজাজিরার প্রতিবেদনে দ্য আটলান্টিক ম্যাগাজিনে ট্রাম্পের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, তারা (ইরানের নতুন নেতৃত্ব) কথা বলতে চায় এবং ট্রাম্পও কথা বলতে রাজি হয়েছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেছেন, ‘আমি তাদের সঙ্গে কথা বলব। যে বিষয়গুলো খুবই বাস্তবসম্মত এবং করা সহজ ছিল, তা তাদের আরও আগেই করা উচিত ছিল। তারা অনেক বেশি দেরি করে ফেলেছে।’ তবে কখন কথা হবে, সে বিষয়ে ট্রাম্প কোনো মন্তব্য করেননি।

তেহরানে ফের হামলা

গতকালও ইরানে হামলা অব্যাহত রেখেছে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। রাজধানী তেহরানে ইরানের সরকারসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী হামলার ঘোষণা দেয়। আইডিএফ জানিয়েছে, তারা ইরানের শাসকগোষ্ঠী সংশ্লিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হামলা শুরু করেছে। তেহরানের রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির ভবনকেও লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে ইসরায়েল। পাশাপাশি কয়েকটি হাসপাতালেও হামলা হয়েছে বলে জানিয়েছে বিবিসি। ইরানি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির বরাতে বিবিসি বলছে, তেহরানে ‘রেড ক্রিসেন্ট শান্তি ভবনের আশপাশের এলাকাকে লক্ষ্যবস্তু করে’ হামলা চালানো হয়েছে। রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির টেলিগ্রাম চ্যানেলে বলা হয়েছে, ‘তেহরানের খাতাম আল আনবিয়া, মোতাহারি এবং বেহজিস্তা হাসপাতালের’ কাছেও হামলা চালানো হয়েছে। ইরনার প্রতিবেদনে বলা হয়, তেহরানের বিভিন্ন এলাকা, বিশেষ করে সাইয়্যেদ খানদান, কাসর চত্বর, ভানাক স্কয়ার এবং মোতাহারি স্ট্রিট এলাকার আশপাশে ভয়াবহ বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া গেছে। তেহরানে অন্তত ৬০টি হামলায় ৫৭ জন নিহতের খবর পাওয়া গেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় গত শনিবার ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় মিনাব শহরের একটি প্রাথমিক বালিকা বিদ্যালয়ে চালানো হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ১৪৮-এ দাঁড়িয়েছে। এদিকে গতকাল এক হামলায় ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদও নিহত হন।

রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার নিন্দা, পাকিস্তানের সমবেদনা

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির হত্যাকাণ্ডকে নিন্দনীয় উল্লেখ করে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন বলেছেন, এ হত্যাকাণ্ড মানবিক নৈতিকতা এবং আন্তর্জাতিক আইনের সব মানদণ্ড লঙ্ঘন করেছে।

ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরায়েলি হামলাকে অবৈধ আগ্রাসন এবং জাতীয় সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন বলে মনে করে উত্তর কোরিয়া। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের এ আগ্রাসনমূলক যুদ্ধ কোনো অবস্থাতেই গ্রহণযোগ্য নয়।

এ ছাড়া আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যার ঘটনাকে ‘আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন’ বলেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি লিখেছেন, ‘খামেনির শাহাদাতে শোক ও দুঃখের এ মুহূর্তে পাকিস্তানের জনগণ ইরানের জনগণের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করছে এবং গভীর সমবেদনা জানাচ্ছে। আন্তর্জাতিক আইনের নীতি লঙ্ঘনের ঘটনায় পাকিস্তান উদ্বেগ প্রকাশ করছে।’

যুক্তরাষ্ট্রের কনস্যুলেটে হামলা

আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে হত্যার প্রতিবাদে পাকিস্তানের করাচিতে মার্কিন কনস্যুলেটের সামনে বিক্ষোভ ও ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। রবিবার মাই কোলাচি রোডে অবস্থিত কনস্যুলেট এলাকায় বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংঘর্ষে অন্তত ৯ জন নিহত হয়েছেন। পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম ডন এ খবর জানিয়েছে। উদ্ধারকারী সংস্থা এডি-এর এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী টিয়ার গ্যাস এবং লাঠিচার্জ করে। করাচির পর লাহোরেও মার্কিন কনস্যুলেটের সামনে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশের পাশাপাশি রেঞ্জার্স (আধাসামরিক) মোতায়েন করা হয়েছে।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নিহতের ঘটনায় প্রতিবেশী দেশ ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রে দূতাবাস ভবনে হামলা চালিয়েছে বিক্ষুব্ধ জনতা। এএফপি জানিয়েছে, যুদ্ধের কারণে সম্প্রতি ইরাকের মার্কিন দূতাবাস ভবনে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছিল। গতকাল সকালে দূতাবাস ভবনের সামনে জড়ো হয় শত শত মানুষ। তাদের বেশিরভাগের পরনে ছিল কালো রঙের পোশাক এবং হাতে ছিল লাঠি-পাথর। দূতাবাসের সামনে নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষ হয় বিক্ষোভকারীদের। পরে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দিতে সক্ষম হয় নিরাপত্তাকর্মীরা।

হামলার জবাব দেওয়ার ঘোষণা লেবাননের হিজবুল্লাহর

ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার জবাব দেওয়ার কথা জানিয়েছে ইরান সমর্থিত লেবাননের হিজবুল্লাহ। এক বিবৃতিতে লেবানন হিজবুল্লাহর মহাসচিব নাইম কাসেম বলেছেন, এই গোষ্ঠী ‘সম্মান ও প্রতিরোধের ক্ষেত্র ত্যাগ করবে না’।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলাকে ‘অপরাধের সর্বোচ্চ’ হিসেবে অভিহিত করে নাইম কাসেম বলেন, ‘বিধাতার নির্দেশনা ও সমর্থনের ওপর আস্থা রেখে আমরা এ আগ্রাসন মোকাবিলায় আমাদের কর্তব্য পালন করব।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত