মধ্যপ্রাচ্যের রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের রক্ষায় সরকারের অগ্রণী ভূমিকা

আপডেট : ০২ মার্চ ২০২৬, ০৯:০০ পিএম

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে যখনই উত্তেজনার মেঘ জমে, তখন কেবল ভূরাজনীতির মানচিত্রই বদলে যায় না-কেঁপে ওঠে হাজার মাইল দূরের ঘরও। ক্ষেপণাস্ত্রের গর্জন, সামরিক সতর্কতা, নিষেধাজ্ঞা আর কূটনৈতিক বাকযুদ্ধের প্রতিটি সংবাদ ঢেউ তোলে প্রবাসী আবাসে, বিমানবন্দরের অপেক্ষাকক্ষে, আর বাংলাদেশের প্রত্যন্ত গ্রামের উঠোনে বসে থাকা পরিবারগুলোর হৃদয়ে। ইতিহাস বলছে, এই অঞ্চলের সংঘাত কখনও সীমান্তের ভেতরে আবদ্ধ থাকে না; তা ছড়িয়ে পড়ে জ্বালানি বাজারে, বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহে, এমনকি মানুষের মানসিক নিরাপত্তাবোধেও।

সাম্প্রতিক ইরান সংকট তাই কেবল আন্তর্জাতিক রাজনীতির আরেকটি অধ্যায় নয়-এটি আমাদের জাতীয় বাস্তবতার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পৃক্ত একটি ঘটনা।

বিদেশের মাটিতে জীবন-জীবিকা গড়ে তোলা প্রতিটি বাংলাদেশি নাগরিক এক একটি পরিবারের স্বপ্নের প্রতিনিধিত্ব করেন। কেউ শিক্ষার্থী, কেউ ব্যবসায়ী, কেউ প্রযুক্তি বা কারিগরি পেশায় যুক্ত। তাদের কাছে সংঘাতের প্রতিটি খবর মানে কর্মস্থলের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন, ব্যাংকিং লেনদেনের অনিশ্চয়তা, আকাশপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা এবং পরিবারে পাঠানো অর্থের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হওয়ার ভয়। ফলে ইরান সংকট প্রবাসীদের কাছে কেবল দূরবর্তী কূটনৈতিক উত্তেজনা নয়; এটি প্রতিদিনের জীবনের বাস্তব উদ্বেগ।

এই প্রেক্ষাপটে সরকারের তৎপরতা তাৎপর্যপূর্ণ। সংকটময় সময়ে কূটনৈতিক মিশনের সক্রিয় ভূমিকা, নিয়মিত নিরাপত্তা নির্দেশনা, জরুরি যোগাযোগব্যবস্থা এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে বিশেষ সমন্বয়-এসব উদ্যোগ প্রবাসীদের কাছে একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়: রাষ্ট্র তাদের পাশে আছে। সংকটকালে তথ্যের স্বচ্ছতা সবচেয়ে বড় আশ্বাস। গুজব ও বিভ্রান্তি যখন আতঙ্ক বাড়ায়, তখন দূতাবাসের যাচাইকৃত বার্তা ও নির্ভরযোগ্য নির্দেশনা প্রবাসীদের মানসিক স্থিতি ধরে রাখতে সহায়ক হয়।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল দর্শন-সবার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা এবং সংঘাত প্রশমনের পক্ষে অবস্থান নেওয়া-এখানেও গুরুত্বপূর্ণ। ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক রক্ষা করা যেমন জরুরি, তেমনি নিজের নাগরিকদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়াও সমান প্রয়োজন। আঞ্চলিক শক্তির দ্বন্দ্বে জড়িয়ে না পড়ে শান্তি ও সংলাপের পক্ষে অবস্থান নেওয়াই একটি পরিপক্ব কূটনীতির পরিচয়।

মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে দ্রুত প্রভাব ফেলে। জ্বালানির দাম, নৌপথের নিরাপত্তা, আকাশপথের সীমাবদ্ধতা-সবকিছুই আন্তঃসংযুক্ত। বাংলাদেশের অর্থনীতি যেহেতু প্রবাসী আয়ের ওপর উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভরশীল, তাই প্রবাসীদের সুরক্ষা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। একটি সংঘাত যদি দীর্ঘায়িত হয়, তবে কর্মসংস্থান, আয় এবং বিনিয়োগ প্রবাহ-সবই চাপে পড়তে পারে। সুতরাং প্রবাসী সুরক্ষা কেবল মানবিক বিবেচনা নয় বরং এটি অর্থনৈতিক কৌশলের অংশ।

সরকারি প্রস্তুতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সম্ভাব্য জরুরি প্রত্যাবাসন পরিকল্পনা। অতীতে বিভিন্ন দেশে সংকটের সময় বিশেষ ফ্লাইট, অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র এবং কনস্যুলার সহায়তার অভিজ্ঞতা রয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতের যেকোনো পরিস্থিতিতে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানোর সক্ষমতা বাড়িয়ে তোলে। একই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে বসবাসরত নাগরিকদের তালিকা হালনাগাদ রাখা, অনলাইন নিবন্ধন ব্যবস্থা জোরদার করা এবং প্রয়োজন হলে বিকল্প নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতিও জরুরি।

দূতাবাসের সক্ষমতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। পর্যাপ্ত জনবল, ২৪ ঘণ্টার জরুরি হটলাইন, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে তাৎক্ষণিক আপডেট এবং প্রবাসীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ-এসব ব্যবস্থা সংকট ব্যবস্থাপনাকে কার্যকর করে তোলে। প্রবাসীদেরও সচেতন ভূমিকা রাখতে হবে-নিবন্ধন সম্পন্ন করা, স্থানীয় আইন মেনে চলা এবং সরকারি নির্দেশনা অনুসরণ করা তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহায়ক।

ইরান সংকট আমাদের একটি বড় শিক্ষা দেয় যে, প্রবাসী সুরক্ষা কোনো তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া নয়, এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অংশ হওয়া উচিত। প্রবাসীদের জন্য বিমা, আইনি সহায়তা তহবিল, সংকটকালীন সহায়তা প্যাকেজ এবং দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন পরিকল্পনা-এসব উদ্যোগ রাষ্ট্রের দায়িত্ববোধকে সুসংহত করে। কারণ সংকট হঠাৎ আসে, কিন্তু প্রস্তুতি তৈরি হয় দীর্ঘ পরিকল্পনায়।

এই সংকট আমাদের জাতীয় আত্মপরিচয়কেও নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। বিদেশে অবস্থানরত প্রতিটি বাংলাদেশি নাগরিক কেবল অর্থনীতির অংশ নন; তারা বাংলাদেশের ভাবমূর্তির ধারক। তাদের আচরণ, সাফল্য এবং সংগ্রাম দেশের পরিচয় বহন করে। তাই তাদের নিরাপত্তা রক্ষা মানে কেবল নাগরিক সুরক্ষা নয়-জাতীয় মর্যাদা রক্ষা।

ইরান সংকট দ্রুত প্রশমিত হোক-এটাই প্রত্যাশা। কিন্তু বিশ্বরাজনীতির অনিশ্চয়তার এই সময়ে একটি নীতি অটুট থাকা চাই: বিদেশের মাটিতে থাকা প্রতিটি বাংলাদেশি রাষ্ট্রের সুরক্ষা-ছায়ার অন্তর্ভুক্ত। তাদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও অধিকার রক্ষায় সক্রিয়, দ্রুত ও মানবিক পদক্ষেপই আস্থার ভিত্তি গড়ে তোলে। প্রবাসীরা কেবল বৈদেশিক মুদ্রা প্রেরক নন; তারা বাংলাদেশের বৈশ্বিক উপস্থিতির জীবন্ত প্রতীক।

সংকটের অন্ধকার যত গভীরই হোক, একজন বাংলাদেশি যেন নিশ্চিন্তে বলতে পারেন-‘আমার দেশ আমার পাশে আছে।’ এই নিশ্চয়তাই একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ শক্তি।

লেখক: সাংবাদিক,কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত