ইরানে হামলার পেছনে সৌদি আরবও

আপডেট : ০৩ মার্চ ২০২৬, ০৭:৩০ এএম

ইরানে হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বারবার তদবির করেছে ইসরায়েল। একপর্যায়ে ইসরায়েলের এ চেষ্টায় সৌদি আরবও যুক্ত হয়। দ্য ওয়াশিংটন পোস্টকে উদ্ধৃত করে লন্ডনভিত্তিক দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্টের এক প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়।

এতে বলা হয়, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানের বিরুদ্ধে হামলায় যোগ দেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে আহ্বান জানিয়ে দীর্ঘস্থায়ী প্রচারণা চালিয়ে গেছেন। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, একপর্যায়ে এতে যোগ দেন সৌদি যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমান (এমবিএস)। তিনিও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে একাধিক ফোনালাপে হামলার পক্ষে যুক্তি দেন। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় এমবিএস হিসেবে পরিচিত সৌদি যুবরাজ বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র এখনই হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত না নিলে ইরান শক্তিশালী হবে।

গত শনিবার সকালে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের একের পর এক হামলায় তেহরানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিজ কার্যালয়ে নিহত হন।

এরপর থেকেই ইসরায়েল, সৌদি আরব, বাহরাইন, কাতার ও কুয়েতে ইরান প্রতিশোধমূলক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা অব্যাহত রেখেছে, যা মধ্যপ্রাচ্যকে ইসলামী প্রজাতন্ত্রটির বিরুদ্ধে একত্রিত করেছে।

সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) মধ্যে আগে বিরোধ ছিল। কিন্তু দেশ দুটির নেতারা গত শনিবার তাদের নিজ নিজ দেশে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হওয়ার পর ফোনে কথা বলেছেন। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান বলেছেন, তার দেশ প্রতিবেশীদের জন্য ‘সব ক্ষমতা নিয়োজিত করতে’ প্রস্তুত রয়েছে।

ইরান প্রতিশোধ হিসেবে উপসাগরীয় দেশগুলোয় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিতে হামলার কথা বললেও ইউএইতে আবাসিক ভবন, দুবাইয়ে পাঁচ তারকা হোটেল, কুয়েতে একটি বিমানবন্দর ও বাহরাইনে একটি বহুতল টাওয়ার ব্লকে হামলা হয়েছে।

পারস্য উপসাগর তীরের দেশগুলোর মধ্যে শুধু বাহরাইন ও ইউএইর ইসরায়েলের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। অন্য অনেক উপসাগরীয় রাষ্ট্র ইসরায়েলের পক্ষে যাবে না। তবে তারা বিশ্বাস করে যে, ইরান একটি অস্থিতিশীল শক্তি এবং এ অঞ্চলের জন্য বিপদ।

সৌদি কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে বলেছিলেন যে, ইরানের ওপর হামলার জন্য সৌদি আকাশসীমা ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না। তা সত্ত্বেও ট্রাম্পকে বলা হয় যে, সৌদি তেল অবকাঠামোর বিরুদ্ধে ইরানের প্রতিশোধমূলক হামলা এড়ানোর জন্য নেওয়া ব্যবস্থার মধ্যে যুবরাজের আকাক্সক্ষার প্রতিফলন রয়েছে।

আমিরাতের রাজনৈতিক ভাষ্যকার আবদুল খালেক আবদুল্লাহ দ্য টেলিগ্রাফকে বলেছেন, উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) সদস্য দেশগুলোর মধ্যে কিছু মতপার্থক্য থাকলেও এসব দেশের জন্য ইরান একটি হুমকি। তিনি বলেন, যখন পরিস্থিতি কঠিন হয়ে পড়ে, তখন তারা (জিসিসি সদস্য) একত্রিত হয়।

সৌদি ভূরাজনৈতিক গবেষক সালমান আল-আনসারি একমত, রাজনৈতিক পার্থক্য সত্ত্বেও সৌদি আরব তার উপসাগরীয় মিত্রদের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ ছিল। তিনি দ্য টেলিগ্রাফকে বলেন, ‘সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় উত্তেজনার মধ্যেও নিরাপত্তার বিষয়ে রিয়াদের ভাবনা উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আমাদের নীতিগত প্রতিশ্রুতি ও দ্বিপক্ষীয় মতবিরোধের মধ্যে পার্থক্য করতে হবে। আঞ্চলিক নিরাপত্তার প্রতি সৌদি দৃষ্টিভঙ্গি লেনদেনমূলক নয়, বরং বাস্তবভিত্তিক।’

সালমান আনসারি বলেন, জিসিসির প্রধান স্তম্ভ হিসেবে সৌদি আরব ইরানের লক্ষ্যবস্তুতে থাকা প্রতিটি রাষ্ট্রের নেতাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রাখছে। তাদের নিরাপত্তাকে পূর্ণ রাজনৈতিক ও কৌশলগত গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

সৌদি কূটনৈতিক বিশ্লেষক আজিজ আলগাশিয়াপন বলেন, ইরানের হামলা অন্তত সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সৌদি আরবের মধ্যকার ‘উত্তেজনা প্রশমিত করার’ সুযোগ তৈরি করবে, যা বিরোধকে সহযোগিতা এবং সংহতিতে রূপান্তরিত করবে।

ইসরায়েল ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব সিকিউরিটি স্টাডিজের সিনিয়র ফেলো ড. ইসরায়েল গুজানস্কি বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলো ট্রাম্পকে ইরানে হামলা করা থেকে বিরত রাখতে একসঙ্গে কাজ করেছে। তাদের সবাইকে আক্রমণ করে ইরান শুধু উপসাগরের দেশগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করেছে তা নয়; বরং এ হামলা তাদের যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আরও সহযোগিতা করার দিকে ঠেলে দিতে পারে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত