অল্পের জন্য রক্ষা পায় ‘জয়যাত্রা’

আপডেট : ০৩ মার্চ ২০২৬, ০৮:১৩ এএম

মৃত্যু হাতের মুঠোয় নিয়ে জাহাজে অবস্থান করছেন ৩১ বাংলাদেশি নাবিক। গত শনিবার মধ্যরাতে যখন ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবেল আলি সমুদ্রবন্দরে আঘাত হানে, তখন তার মাত্র ২০০ মিটার দূরেই ছিল বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) এমভি বাংলার জয়যাত্রা জাহাজটি।

এর আগে ২০২২ সালের ২ মার্চ রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে ইউক্রেনের বন্দরে নোঙর করা বাংলার সৌরভ জাহাজটি রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ধ্বংস হয়েছিল এবং একজন নাবিক মারা গিয়েছিলেন। রাশিয়া-ইউক্রেনের ঘটনার পর এবার ইরান-ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের ফাঁদে পড়েছে বিএসসির জাহাজ এমভি বাংলার জয়যাত্রা। ৩৮ হাজার ৮০০ টন স্টিল নিয়ে জাহাজটি গত ২৭ ফেব্রুয়ারি কাতারের মেসাইয়িদ বন্দর থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবেল আলি বন্দরে পৌঁছায়। পৌঁছানোর পরপরই ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে ইরান আক্রমণ করে। এর পাল্টা আক্রমণ হিসেবে ইরান জেবেল আলি বন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে।

ক্ষেপণাস্ত্রটি কোথায় পড়েছে এবং বাংলাদেশি জাহাজটি কাছাকাছি ছিল কি না জানতে কথা হয় জাহাজটির ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ শফিকের সঙ্গে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের জাহাজটি ১ নম্বর টার্মিনালের ১০ নম্বর জেটিতে রয়েছে এবং ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রটি পড়েছে ৯ নম্বর জেটিতে। আমাদের মাথার ওপর দিয়ে গিয়ে জাহাজ থেকে মাত্র ২০০ মিটার দূরে পড়েছে।’

ক্ষেপণাস্ত্রটি কি কোনো জাহাজ বা তেল ট্যাংকারের ওপর পড়েছে? এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘না, ক্ষেপণাস্ত্রটি যেখানে পড়েছে তার থেকে ১০ মিটার পেছনে রয়েছে পাঁচটি অয়েল ট্যাংকার। প্রতিটিতে প্রায় ৫০০ থেকে ১০০০ টন তেল রয়েছে এবং এর ২০০ মিটার সামনে ছিল আমাদের জাহাজ। ক্ষেপণাস্ত্রটি উভয়ের কোনো স্থানে না পড়ে তেল পরিবহনের হুক পয়েন্টে (এই পয়েন্ট থেকে ইউএস নেভাল জাহাজগুলো তেল নিয়ে থাকে) পড়েছে এবং স্থাপনাটি ধ্বংস করে দেয়। এর ফলে এই পয়েন্ট থেকে আর ইউএস জাহাজগুলো জ্বালানি তেল সংগ্রহ করতে পারবে না।’

জাহাজে থাকা ৩১ নাবিক নিরাপদে রয়েছেন কি না এমন প্রশ্নের জবাবে ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ শফিক বলেন, ‘মাথার ওপর দিয়ে ক্ষেপণাস্ত্র গিয়ে আবুধাবিতে পড়ছে এবং পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে পড়ছে। আশপাশে কোনো মানুষ নেই এবং বন্দরের কোনো স্টাফও নেই। ঝুঁকি থাকলেও আমাদের জাহাজের মধ্যেই থাকতে হবে।’ সরকারের পক্ষ থেকে কোনো যোগাযোগ করা হচ্ছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাদের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক স্যার প্রতিমুহূর্তে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর একজন প্রতিনিধি যোগাযোগ করেছেন এবং আবুধাবিতে যেকোনো সহায়তার কথা বলেছেন। মন্ত্রীসহ আমাদের মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জুম মিটিংয়ের মাধ্যমে জাহাজের নাবিকদের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং আমাদের আশ্বস্ত করেছেন।’

আশ্বস্ত হওয়ার কথা স্বীকার করেছেন এ জাহাজের বুসন পদে চাকরি করা নাবিক তৌহিদুর রহমানের স্ত্রী আকলিমা খাতুন। তিনি বলেন, ‘বিএসসির এমডি স্যার আমার সঙ্গে দুই দফায় কথা বলেছেন। জাহাজের নাবিকরা নিরাপদে রয়েছেন এবং সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের সাপোর্ট দেওয়া হচ্ছে।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক বলেন, ‘জাহাজটি এখন ওই পয়েন্ট থেকে অন্য কোথাও নেওয়ার সুযোগ নেই। কাতার থেকে স্টিল নিয়ে আসা জাহাজটি এই বন্দরে পণ্যগুলো আনলোড করে কুয়েত যাওয়ার শিডিউল রয়েছে। তারপরও সমুদ্রপথের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে আমরা পরবর্তী গন্তব্য নির্ধারণ করব।’

জাহাজে থাকা ৩১ নাবিকের নিরাপত্তার বিষয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘যেকোনো পরিস্থিতিতে যাতে নাবিকরা সর্বোচ্চ সার্ভিস পায়, সেই ব্যবস্থা করা হয়েছে। একই সঙ্গে নাবিকরা যাতে মানসিকভাবে ভেঙে না পড়ে, সেজন্য তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ, তাদের ভালো খাবারের ব্যবস্থা এবং প্রতিদিন ৫ মার্কিন ডলার করে বেতন বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।’

‘নাবিকদের জীবন এমনই’ মন্তব্য করে বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট ক্যাপ্টেন আনাম বলেন, ‘জাহাজ পরিত্যক্ত না হওয়া পর্যন্ত নাবিকদের জাহাজেই অবস্থান করতে হয়। তাই যতই ঝুঁকি থাকুক জাহাজ ছেড়ে অন্যত্র নিরাপদে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তাই পণ্য আনলোড করার পর জলপথের নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে হয়তো জাহাজটি বন্দর ছেড়ে যাবে।’

বিএসসির আওতাধীন সাতটি জাহাজের মধ্যে একটি জাহাজ শুধু আবুধাবিতে অবস্থান করছে। বাকিগুলোর মধ্যে এমভি নবযাত্রা আমেরিকায়, এমটি অগ্রদূত কানাডায়, এমভি প্রগতি লাইবেরিয়ার সিয়েরা লিওনে, এমটি অগ্রযাত্রা পাকিস্তানে, এমভি অর্জন রাশিয়ায় এবং এমটি অগ্রগতি সেনেগালে অবস্থান করছে। সব জাহাজই ভাড়ায় পরিচালিত হচ্ছে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত