ধেয়ে আসছে দুর্বিপাক

আপডেট : ০৫ মার্চ ২০২৬, ১২:৪৩ এএম

মধ্যপ্রাচ্যে আমাদের শ্রমিকরা অর্থনীতির প্রাণ। এ অঞ্চলে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যে যুদ্ধের পূর্বাভাস ঘনীভূত হচ্ছে, তা শুধু আন্তর্জাতিক রাজনীতির দূরবর্তী ঘটনা নয়, এটি আমাদের প্রবাসী ভাইবোন, জাতীয় অর্থনীতি এবং অভ্যন্তরীণ সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য গভীর অস্তিত্বের সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ইতিমধ্যে দুই দেশে প্রবাসী বাংলাদেশিরা প্রাণ হারিয়েছেন, আহত হয়েছেন কয়েকজন, ফ্লাইট বাতিল হচ্ছে। যারা দেশ ছাড়তে চলেছেন, তারা বিমানবন্দরে আটকা পড়ছেন। আর যারা এখনো সেখানে কর্মরত, তাদের জীবন প্রতি মুহূর্তে রয়েছে ঝুঁকির মুখে। যদি এ যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে কেবল প্রাণহানি নয়, আরও হাজারো মানুষ আহত হবেন, বাস্তুচ্যুত হবেন অনেকে এবং প্রবাসীর পরিবারগুলো চরম অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে জ্বালানির দাম ইতিমধ্যে ঊর্ধ্বমুখী, যা আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করবে। একই সঙ্গে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যাবে, মধ্যপ্রাচ্য-নির্ভর রপ্তানি শিল্পগুলো বন্ধ হয়ে যেতে পারে। অর্থাৎ অর্থনীতি, মানবিক নিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতা এই তিন ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ একযোগে বিপদের সম্মুখীন হতে পারে। কয়েক বছর আগে আমরা ইউক্রেন যুদ্ধের ধাক্কা সামলে নিয়েছি। সেই অভিজ্ঞতা স্পষ্ট করে বলে দিচ্ছে, প্রস্তুতি ছাড়া এই ধাক্কা আরও ভয়াবহ ও দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে। এবার আমরা সম্ভবত আরও তীব্র ধাক্কার মুখোমুখি হবো। সময় এখন শুধু পর্যবেক্ষণের নয়; সংকট মোকাবিলায় পরিকল্পিত, তাৎক্ষণিক ও বহুমুখী পদক্ষেপ নেওয়া জাতীয় দায়িত্ব।

বিশে^র অন্য দেশগুলো বারবার প্রমাণ করেছে যে, সংকটের সময় কৌশলগত প্রস্তুতি ও বিকল্প ব্যবস্থা না থাকলে, ক্ষতির পরিমাণ বহুগুণ বেড়ে যায়। ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্যেও অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ও কৃষি খাতকে শক্তিশালী রাখার মাধ্যমে যুদ্ধের ধাক্কা সামলানো গেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতার রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ঝুঁকি মোকাবিলায়, শুধু তেলের ওপর নির্ভর না করে পর্যটন, বিনিয়োগ, আর্থিক সেবা ও প্রযুক্তি খাতে বৈচিত্র্য এনে স্থিতিশীলতা ধরে রেখেছে। জাপান দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর,  পুরোপুরি ধ্বংসস্তূপ থেকে বিদেশি প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ গ্রহণ, অভ্যন্তরীণ উৎপাদন পুনর্গঠন এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরির মাধ্যমে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। ভারত ১৯৭১-৭৩ সালে মধ্যপ্রাচ্য তেল সংকটের সময়,  অভ্যন্তরীণ উৎপাদন, কৃষি ও শিল্প খাতকে প্রাধান্য দিয়ে এবং প্রবাসী রেমিট্যান্সকে সুপরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশও যদি প্রবাসী নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বিকল্প চ্যানেল তৈরি করে, তাহলে আসন্ন সংকট আমাদের জন্য ধ্বংসের নয়, বরং নতুন সুযোগের দুয়ার খুলে দিতে পারে। এ কারণে প্রথমত, প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। দূতাবাস ও কনসুলেটগুলোকে পর্যাপ্ত সম্পদ, জনবল ও যুদ্ধকালীন প্রশিক্ষণ দিয়ে দ্রুত সেবা নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক সহায়তায় প্রবাসীদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনার জরুরি। জীবনের পাশাপাশি তাদের মানসিক স্বাস্থ্য ও আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা দরকার। দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক প্রস্তুতি অপরিহার্য। রেমিট্যান্স কমলে সংরক্ষিত তহবিল ও জরুরি মজুদ ব্যবহার করতে হবে। জ্বালানি, খাদ্য ও ওষুধ আমদানি বাড়াতে হবে এবং মধ্যপ্রাচ্য-নির্ভরতা কমিয়ে নতুন সরকারকে ইউরোপ, আফ্রিকা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নতুন বাজার খুঁজতে হবে। শিল্প-রপ্তানি খাতে বিকল্প ব্যবস্থা না নিলে অর্থনীতি ভেঙে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। তৃতীয়ত, কূটনৈতিক উদ্যোগ শক্তিশালী করতে হবে। আন্তর্জাতিক যুদ্ধবিরোধী প্রচেষ্টায় সক্রিয় অংশগ্রহণ, শান্তি প্রচার, সমঝোতা আলোচনা এবং জাতিসংঘসহ সংস্থাগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার মাধ্যমে প্রবাসী ও অর্থনীতির ক্ষতি সীমিত করা সম্ভব। দ্বিপক্ষীয় কূটনীতি ও যুদ্ধবিরোধী আলোচনা এখানে গুরুত্বপূর্ণ। চতুর্থত, সংকটকালীন নীতি ও প্রস্তুতি জরুরি। জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে যুদ্ধকালীন পরিকল্পনা থাকতে হবে। প্রবাসী পরিবারসহ সাধারণ মানুষ যেন তথ্য, সহায়তা ও জরুরি সেবায় সহজে পৌঁছাতে পারে, সে ব্যবস্থা করতে হবে।

মিডিয়া, সোশ্যাল মিডিয়া ও স্থানীয় প্রশাসনকে সমন্বিত তথ্য প্রচারের দায়িত্ব নিতে হবে। পঞ্চমত, অভ্যন্তরীণ শ্রমবাজার ও বিনিয়োগ প্রস্তুত রাখতে হবে। রেমিট্যান্স কমলে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ও বিনিয়োগ দ্রুত সচল করে ক্ষতি কমাতে হবে। শিক্ষিত-দক্ষ জনশক্তিকে স্থানীয় কর্মসংস্থানে উপযোগী করার বাস্তব পরিকল্পনা এখনই গ্রহণ করা দরকার। ষষ্ঠত, রেমিট্যান্সের বিকল্প চ্যানেল তৈরি অত্যাবশ্যক। মধ্যপ্রাচ্য-নির্ভরতা কমিয়ে, ফ্রিল্যান্সিং ও অনলাইন আর্নিং সম্প্রসারণে জোর দিতে হবে। সহজ ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা সক্রিয় রাখা এবং প্রবাসীদের উন্নয়ন প্রকল্প, স্টার্টআপ, কৃষি ও নবায়নযোগ্য শক্তিতে বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া জরুরি। সপ্তমত, বৈচিত্র্যময় কর্মসংস্থান ও নতুন বাজারে দৃষ্টি দিতে হবে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, আফ্রিকা ও প্রশান্ত অঞ্চলে প্রবাসী কর্মসংস্থান বাড়াতে সরকারি-বেসরকারি ট্রেনিং প্রোগ্রাম চালু করা যেতে পারে। ডিজিটাল পণ্য ও সেবা রপ্তানি (অনলাইন কোর্স, সফটওয়্যার, ডিজিটাল আর্ট) বৈদেশিক আয়ের নতুন স্থিতিশীল উৎস হতে পারে।  অষ্টমত, পর্যটন খাত শক্তিশালী করে বৈদেশিক মুদ্রা বাড়াতে হবে। বিদেশি পর্যটকদের ব্যয় রিজার্ভে সরাসরি যোগ হয়। নবমত, বৈদেশিক সরাসরি বিনিয়োগ আকর্ষণ অপরিহার্য। সহজ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, কর সুবিধা, স্থিতিশীল নীতি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে হবে। অবকাঠামো, শিল্প, আইটি ও সেবা খাতে এফডিআই বাড়াতে হবে। নিয়মিত যোগাযোগ ও সমর্থন দিয়ে ঝুঁকি কমিয়ে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব গড়তে হবে। কারণ এফডিআই অর্থ, প্রযুক্তি, দক্ষতা ও কর্মসংস্থান নিয়ে আসবে। দশমত, শিক্ষা খাতকে বৈদেশিক মুদ্রার শক্তিশালী উৎসে পরিণত করতে হবে। অনলাইন কোর্স, ভার্চুয়াল ওয়ার্কশপ, সার্টিফিকেশন ও ই-লার্নিং প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক বৈদেশিক আয় আসতে পারে। সরকারকে খাত প্রমোট, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী আকর্ষণ, গুণগতমান নিশ্চিতকরণ ও আধুনিক প্রযুক্তি উন্নয়নে কাজ করতে হবে। এতে অর্থনীতি ও শিক্ষা-আইটি খাতের সক্ষমতা বাড়বে। এই সংকটকালীন সরকার, বিরোধী দল, সিভিল সমাজ ও ব্যবসায়ী মহলকে একযোগে কাজ করতে হবে। দ্রুত নীতি প্রণয়ন, প্রবাসী নিরাপত্তা, নতুন মুদ্রা চ্যানেল ও উৎপাদন-সেবা খাত শক্তিশালীকরণই একমাত্র পথ। সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক পদক্ষেপ নিলে, বাংলাদেশ শুধু সংকট মোকাবিলা করবে না বরং আরও স্থিতিশীল, স্বনির্ভর ও সমৃদ্ধ জাতি হিসেবে ঘুরে দাঁড়াবে।

লেখক : গবেষক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা

[email protected]

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত