নিসর্গ, নির্জনতা ও আধ্যাত্মিকতার কবি

আপডেট : ০৫ মার্চ ২০২৬, ০১:০৫ এএম

মেরি অলিভার (১৯৩৫-২০১৯) আমেরিকার কবিতার এক উজ্জ্বল নাম। তার কবিতা সরল ভাষায় লেখা, কিন্তু তাতে প্রকৃতির বিস্ময়, মরমিবাদ এবং জীবনের দার্শনিক গভীরতা প্রতিফলিত হয়। তার কবিতা প্রথম পাঠে সহজ মনে হয়, কিন্তু একটু থামলেই বোঝা যায়, এখানে প্রকৃতি শুধু দৃশ্য নয়, এখানে প্রকৃতি হচ্ছে আধ্যাত্মিক অনুশীলনের উপাদান। তার কবিতায় ঈশ্বরের নাম খুব কমই আসে, কিন্তু ঈশ্বরীয় উপস্থিতি প্রায় সর্বত্র। তিনি আধুনিক আমেরিকার কবিতায় এক বিরল কণ্ঠ যিনি একাধারে প্রকৃতিবাদী, মিস্টিক, একান্ত ব্যক্তিগত আবার সর্বজনীন। তিনি ১৯৮৪ সালে পুলিৎজার পুরস্কার ও ১৯৯২ সালে ন্যাশনাল বুক অ্যাওয়ার্ড জিতেছেন। ২০০৭ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে বেশি বিক্রীত কবি হিসেবে পরিচিতি হয়েছেন।

মেরি অলিভারের জন্ম ১৯৩৬ সালের ১০ সেপ্টেম্বরে, ওহাইওর ম্যাপল হাইটসে। শৈশবে তিনি ক্লিভল্যান্ডের এক অর্ধ-গ্রামীণ এলাকায় বড় হয়েছেন। তার শৈশব সুখের ছিল না। পারিবারিক অশান্তি, একাকিত্ব, মানসিক আঘাত, যৌন নির্যাতন এবং দুঃস্বপ্নের মতো অভিজ্ঞতা ছিল। এসব তাকে মানুষের সমাজ থেকে সরিয়ে প্রকৃতির দিকে ঠেলে দেয়। খুব অল্প বয়সেই তিনি আশ্রয় নেন বন, মাঠ, নদী ও পাখির কাছে। এই প্রকৃতিই হয়ে ওঠে তার প্রাথমিক শ্রোতা ও রক্ষাকর্তা। এই একাকিত্বই পরে হয়ে ওঠে তার কবিতার মূল শক্তি।

১৪ বছর বয়সে তিনি কবিতা লেখা শুরু করেন। স্থানীয় হাইস্কুল থেকে স্নাতকের পর, ১৯৫১ সালে ১৫ বছর বয়সে মিশিগানের ন্যাশনাল মিউজিক ক্যাম্পে যান, যেখানে তিনি পারকাশন বাদ্যযন্ত্র বাজান। ১৭ বছর বয়সে তিনি কবি এডনা সেন্ট ভিনসেন্ট মিলের বাড়িতে যান এবং মিলের বোন নর্মার সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তোলেন। সেখানে তিনি ছয়-সাত বছর মিলের ডায়েরি, চিঠি, অসমাপ্ত লেখা এসব সাজানো-গোছানোর কাজ করেন। এই ঘনিষ্ঠ সংসর্গ অলিভারের কাব্যবোধকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।

তিনি পড়াশোনা করেন ওহাইও স্টেট ইউনিভার্সিটি ও ভাসার কলেজে, কিন্তু ডিগ্রি শেষ করেননি। এর বদলে তিনি নিজেকে শিক্ষিত করেছেন প্রকৃতির সান্নিধ্যে হাঁটতে হাঁটতে, বসে থাকতে থাকতে, তাকিয়ে থাকতে থাকতে।

পেশাগত জীবনে তিনি কেস ওয়েস্টার্ন রিজার্ভ ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষকতা করেন, বাকনেল ইউনিভার্সিটিতে পোয়েট ইন রেসিডেন্স (১৯৮৬) সুইট ব্রায়ার কলেজে মার্গারেট ব্যানিস্টার রাইটার ইন রেসিডেন্স (১৯৯১) এবং বেনিংটন কলেজে ক্যাথারিন ওসগুড ফস্টার চেয়ার ধারণ করেন।

১৯৫০-এর দশকের শেষে তিনি ফটোগ্রাফার মলি ম্যালোন কুকের সঙ্গে দেখা করেন। তিনি তার জীবনসঙ্গী হয়ে ওঠেন ৪০ বছরেরও বেশি সময়ের জন্য। কুক তার সাহিত্যিক এজেন্টও ছিলেন। ১৯৬০-এর দশকে তারা ম্যাসাচুসেটসের প্রভিন্সটাউনে বাড়ি তৈরি করেন। সেখানে প্রকৃতির সৌন্দর্য তার কবিতাকে প্রভাবিত করে। ২০০৫ সালে কুকের মৃত্যুর পরও তিনি সেখানে থাকেন। তিনি গোপনীয়তা পছন্দ করতেন ও সাক্ষাৎকার কম দিতেন। ২০১২ সালে ফুসফুসের ক্যানসার ধরা পড়ে, কিন্তু চিকিৎসায় সুস্থ হয়েছিলেন। অবশেষে ২০১৯ সালের ১৭ জানুয়ারি ফ্লোরিডার হোব সাউন্ডে লিম্ফোমায় মারা যান ৮৩ বছর বয়সে।

মেরি অলিভারের দর্শন ও মরমিবাদের কেন্দ্রে রয়েছে প্রকৃতির মাধ্যমে আধ্যাত্মিক জাগরণের একটি সরল কিন্তু গভীর সাধনা। এটি নিউ ইংল্যান্ডের অতীন্দ্রিয়বাদের সমকালীন রূপ। তার দর্শন প্রকৃতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। এটা তার কবিতায় একটি নতুন রোমান্টিসিজমের রূপ নেয়। তিনি ওয়াল্ট হুইটম্যান, হেনরি ডেভিড থরো, রুমি, হাফিজ, রাল্ফ ওয়াল্ডো এমারসন, পার্সি বিশে শেলি ও জন কিটসের প্রভাবে অনুপ্রাণিত। তার দর্শনের কেন্দ্র রয়েছে প্রকৃতির বিস্ময় এবং মানুষের সঙ্গে তার অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক। তিনি প্রকৃতিকে সীমাবদ্ধতাহীনভাবে দেখতেন, যেখানে নিজেকে এবং প্রকৃতিকে এক করে ফেলতেন।

তার মিস্টিসিজম সুফি পথের সঙ্গে যুক্ত, যা আত্ম-উপলব্ধির দিকে নিয়ে যায়। তার কবিতায় আধ্যাত্মিকতা ও আত্ম-উপলব্ধি প্রতিফলিত হয়, যেখানে প্রকৃতি আত্মার সঙ্গে যোগাযোগের একটি মাধ্যম হয়ে ওঠে।

অলিভার গির্জার চার দেয়ালের চেয়ে বনের নিস্তব্ধতাকে বেশি পবিত্র মনে করতেন। তিনি ঝিঁঝি পোকা, রাজহাঁস বা সাধারণ ঘাসের মধ্য দিয়ে মহাজাগতিক সত্য খুঁজে পেতেন। তার মতে, জীবনকে সার্থক করতে হলে আমাদের চারপাশের সাধারণ জিনিসের প্রতি বিস্ময় জাগিয়ে রাখতে হবে।

তিনি তার কবিতায় বারবার অতীত বা ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তা ছেড়ে বর্তমানের ক্ষুদ্রতম মুহূর্তকে উপভোগ করার তাগিদ দিয়েছেন। এই দিক থেকে তাকে জেন কবিতা, সুফি ফকিরি, এমনকি উপনিষদের নৈঃশব্দ্য দর্শনের সঙ্গে তুলনা করা যায়, যদিও তিনি নিজে কখনো এসব দাবি করেননি।

তার দর্শনের চাবিশব্দ হলো ‘মনোযোগ’। তার মতে, মনোযোগ দেওয়াই হলো জীবনযাপনের প্রাথমিক নির্দেশনা এবং মানুষের ‘অন্তহীন ও যথার্থ কাজ’। এই মনোযোগ শুধু দেখাই নয়, অবাক বিস্ময়ে দেখার নাম। তিনি বলেন, ‘মনোযোগের মাধ্যমেই আত্মার অস্তিত্ব তৈরি হয়।’ তার মতে, পৃথিবীকে গভীর মনোযোগ দিয়ে দেখা মানেই আধ্যাত্মিক অনুশীলন। তিনি কোনো সংগঠিত ধর্মের প্রচারক নন। চার্চ, মতবাদ, ধর্মতত্ত্ব এসব তার কবিতায় প্রায় অনুপস্থিত। কিন্তু তার কাজ গভীরভাবে ধর্মীয় এক অর্থে। এখানে ধর্ম মানে বিস্ময়, কৃতজ্ঞতা, উপস্থিত থাকা।

অলিভারের মরমিবাদ কোনো বিমূর্ত দর্শন নয়। এটি হলো প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় বিশ্বের সঙ্গে একাত্মতা। এটি একটি ‘প্রচণ্ড ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা’, যেখানে ঈশ্বর ও মৃত্যু পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। মানুষের কাজ কী? এই প্রশ্নটি তার কবিতায় বারবার ফিরে আসে। তিনি মনে করেন, জীবনের উদ্দেশ্য ক্ষমতা নয়, সাফল্য নয়, এমনকি সুখও নয়, বরং উদ্দেশ্য হলো এই পৃথিবীতে থাকা, এই জীবনের বিস্ময়কে লক্ষ করা এবং এর প্রতি বিশ্বস্ত থাকা।

তিনি তার কবিতায় যে ‘আমি’ ব্যবহার করতেন, তা ব্যক্তিগত অহং নয়, বরং তা সম্ভাব্য যেকোনো পাঠকের অভিজ্ঞতার প্রতিনিধি। তার উদ্দেশ্য ছিল পাঠককে কবিতার অভিজ্ঞতায় জড়িয়ে নেওয়া। কবি নিজেকে কেন্দ্র করে কথা বলেন না। অনেক সময় ‘আমি’ গলে যায় দৃশ্যের ভেতর।

অলিভারের লেখার রীতি ছিল অত্যন্ত নিয়মানুবর্তিতাভিত্তিক। তিনি ভোর সকালেই লেখার জন্য সময় রাখতেন। তার মতে, সৃজনশীল সত্তা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে এবং নিয়মিত অভ্যাসের মাধ্যমেই তাকে বিশ্বাস অর্জন করতে হয়।

অলিভার ছিলেন এক অসম্ভব ফলপ্রসূ লেখিকা। তিনি প্রায় প্রতিবছর বা দুবছর অন্তর একটি নতুন বই প্রকাশ করতেন। তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে No Voyage and Other Poems (1963), American Primitive (1983)—Pulitzer Prize, Dream Work (1986), House of Light (1990), West Wind (1997), Why I Wake Early (2004), A Thousand Mornings (2012), Devotions (2017) নির্বাচিত কবিতা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত