কিশোরগঞ্জ জেলা শহরের জন্য নরসুন্দা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নদী। কিশোরগঞ্জ শহরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত এককালের স্রোতঃস্বিনী নরসুন্দা এখন দখল-দূষণে ও ভরাটের মহোৎসবে বিপন্ন। একশ্রেণির অপরিণামদর্শী মানুষের আগ্রাসনে নদীটি যেন আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হতে যাচ্ছে। অন্যদিকে একে একে দখল করে বহুতলা স্থাপনা তৈরি করছে প্রভাবশালীরা। দ্রুত খননের পাশাপাশি দখলমুক্ত করে নদীটিকে বাঁচিয়ে ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষার আকুতি পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর।
জানা যায়, আশির দশক পর্যন্ত কিশোরগঞ্জবাসীর জীবনে অসামান্য অবদান রেখে আসছিল এই নরসুন্দা নদী। কিন্তু নব্বই দশকের শুরু থেকে অপরিণামদর্শী লোকজনের লোলুপ দৃষ্টির শিকার হয়ে দখল-দূষণ-ভরাটে বিপন্ন হতে থাকে নদীটি। পরিবেশবাদী লোকজনের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকার ২০১২ সালে ১০৬ কোটি টাকায় নরসুন্দা নদী খনন ও সৌন্দর্য বর্ধন প্রকল্প হাতে নেয়। অনেক বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে লুটপাটের মধ্যদিয়ে ২০১৬ সালে এ প্রকল্পের কাজ শেষ হয়। নাম দেওয়া হয় ‘নরসুন্দা লেকসিটি’। নদী দখলবাজদের চিহ্নিত করে অভিযানও শুরু হয়। তবে সেই উদ্যোগও বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। কিছুদিনের মধ্যেই থমকে দাঁড়ায়। সেই প্রকল্পের মাধ্যমেও নরসুন্দাকে হত্যা করা হয়েছে লেকসিটি নামে। নদীটি বর্তমানে মৃতপ্রায়। আবর্জনা, অবৈধ দখলে-দূষণে নদীটি আজ বিপন্ন প্রায়। নদীর বিভিন্ন স্থান পরিণত হয়েছে ময়লার ভাগাড়ে। নদীরক্ষায় তেমন কোনো উদ্যোগ বা পদক্ষেপও নেই। দখল-দূষণে বিপন্ন হয়ে পড়েছে কিশোরগঞ্জের নরসুন্ধা নদীটি।
ভূমিখেকো চক্রের অবৈধ দখল ও স্থাপনা নির্মাণ এবং ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়ের আস্তানা হয়ে গেছে এখন নরসুন্দা নদী। শহরের পৌর এলাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় নদীর বিষাক্ত দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে জনজীবন।
নদীর পাড় ঘুরে দেখা যায়, নদীর দু’পাশ দখল হতে হতে এখন নালা হয়ে গেছে। কোথাও পুরো নদী দখল করে স্থাপনা তৈরি হচ্ছে। শহরের পুরানথানা এলাকার এমপি গলির নদীর পাড় সম্প্রতি নদীর ভেতরে প্রায় ১০ শতাংশ দখল করে ছয়তলা ভবন তৈরির প্রস্তুতি চলছে। এদিকে রথখলার আঠারবাড়ি কাচারি মোড় থেকে ব্রিজ পর্যন্ত এলাকায় নদীটি দখল করে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান করা হয়েছে। একরামপুর হয়ে শোলাকিয়া ও বয়লা এলাকার দুপাশ দখল করে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা গড়ে তুলেছেন বসতবাড়ি ও একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। শোলাকিয়া ঈদগাহ রোডের নদীর পাড়ের বেশিরভাগ বসতবাড়ি গড়ে তুলেছেন নরসুন্ধার ওপর।
এলাকাবাসী জানান, বিগত পতিত সরকারের প্রভাব কাটিয়ে পুরানথানা এলাকা এমপি গলির নদীর পাড় সম্প্রতি নদীর ভেতরে প্রায় ১০ শতাংশ দখল করে ছয়তলা ভবন তৈরি করছে। এদিকে শোলাকিয়া এলাকার নরসুন্দা পাড়ের বসতিরা নদীটিকে দখলে নিয়ে গড়ে তুলেছেন বসতবাড়ি। বর্তমান সরকারের কাছে স্থানীয়দের দাবি, এখনই দখলকারীদের উচ্ছেদ করে নদীটি দখলমুক্ত করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হোক।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) কিশোরগঞ্জ জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম জুয়েল জানান, শহরের ব্যস্ততম জায়গা গৌরাঙ্গ বাজার ব্রিজ বা বড় বাজার ব্রিজ থেকে নদীটি দেখে যে কারও মন খারাপ হতে পারে। চারদিকে ময়লার স্তূপ আর আবর্জনা ছাড়া কিছুই চোখে পড়ে না। ব্রিজসহ দখল হয়ে গেছে সবকিছু। এই নদী থেকে অবৈধ স্থাপনা দ্রুত অপসারণপূর্বক দখলদারদের মালিকানা বাতিল করা জরুরি প্রয়োজন। দ্রুতই নরসুন্দা নদীকে মুক্ত করতে হবে। পরিবেশ-প্রতিবেশ-অর্থনীতি-কৃষি-জীববৈচিত্র্য সুরক্ষার স্বার্থেই এ কাজ জরুরি।
কিশোরগঞ্জ পানি উন্নয়ন বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ‘নরসুন্দা নদীর দুপাশে এখন দখলের মহোৎসব চলছে। অবৈধ স্থাপনা ও দখল করা জয়গা উদ্ধারের জন্য আমাদের পরিকল্পনায় আছে।’
কিশোরগঞ্জ-১ (কিশোরগঞ্জ সদর-হোসেনপুর) আসনের নবনির্বাচিত সাংসদ মাজহারুল ইসলাম বলেন, ‘নরসুন্দা নদী খননের বিষয়টি নিয়ে বিশেষ চিন্তা রয়েছে। পরিবেশ সুন্দর করতে নদীর দুপাশের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে নদীর নাব্য ফিরে আনা হবে।’ কিশোরগঞ্জ জেলা প্রশাসক আসলাম মোল্লা বলেন, অবৈধ স্থাপনা ও দখলদারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি নদী দখল করে যে স্থাপনা তৈরি হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।