ইয়েমেনের রাজধানী সানায় অবস্থিত সানার মহান মসজিদ। এটি বিশ্বের প্রাচীনতম মসজিদগুলির মধ্যে একটি। মসজিদটি প্রাথমিক ইসলামী যুগে প্রতিষ্ঠিত বলে জানা যায়।
ইতিহাস
প্রাথমিক ইসলামী সূত্র অনুসারে, প্রায় ৬৩০ খ্রিস্টাব্দে (৬ হিজরী ) ইসলামের নবী মুহাম্মদ (সা.) সানার মহান মসজিদ নির্মাণের নির্দেশ দিয়েছিলেন বলে জানা গেছে। মসজিদটি ইসলামের পবিত্র শহর মক্কা ও মদিনার বাইরে নির্মিত প্রথম মসজিদ হিসেবে পরিচিত। হিজরত-পরবর্তী এই সময়ে (৬২২-৬৩২ খ্রিস্টাব্দ) সানা ইসলাম ধর্মের প্রচারের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। মহান মসজিদে আবিষ্কৃত অনেক প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন মুহাম্মদের জীবিত থাকাকালীন সময়ে এর নির্মাণের পক্ষে যুক্তিকে প্রমান পাওয়া যায়। যার মধ্যে রয়েছে আক্সুমাইট ক্যাথেড্রাল এবং সাবাইয়ান ঘুমদান প্রাসাদের বেশ কয়েকটি স্পোলিয়া।
সপ্তম শতাব্দীতে, প্রাক-ইসলামিক সানার ধ্বংসাবশেষ মূলত ধ্বংস হয়ে যায় যখন এটি হিজরতের শুরুর বছরগুলোতে ইসলামী বিশ্বাসের প্রসারের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। মহান মসজিদের অভ্যন্তরে প্রাপ্ত প্রাক-ইসলামিক ভবনের স্থাপত্য ধ্বংসাবশেষ থেকে এর প্রমাণ পাওয়া যায়।
৭০৫ থেকে ৭১৫ (৮৬-৯৬ হিজরি) পর্যন্ত, উমাইয়া খলিফা প্রথম আল-ওয়ালিদ মসজিদটি সম্প্রসারণ করেন। মসজিদের আঙিনায় পাওয়া একটি শিলালিপি ৭৫৩ খ্রিস্টাব্দের, আব্বাসীয় আমলের। ৮৭৬/৭ খ্রিস্টাব্দে, দুবার বন্যার ফলে মসজিদটির যথেষ্ট ক্ষতি হয়েছিল, যার পরে এটি সংস্কার করা হয়েছিল।
নবম শতাব্দীর গোড়ার দিকে, পূর্ব দিকে একটি মিনার নির্মিত হয়েছিল। ৯১১ খ্রিস্টাব্দে, কারমাতিরা শহর আক্রমণ করে মসজিদটির ক্ষতি করে।
দ্বাদশ শতাব্দীতে, ১১৩০ খ্রিস্টাব্দে, ইসমাইলি রানী আরওয়া আল-সুলায়হি মসজিদের বেশিরভাগ অংশ পুনরুদ্ধার করেন। তিনি মসজিদের পূর্ব, পশ্চিম ও উত্তর অংশের ভাস্কর্যযুক্ত ছাদের নকশা করেন। এই সংস্কারের অংশ হিসেবে মসজিদের পশ্চিম মিনারটি নির্মিত হয়েছিল।
ষোড়শ শতাব্দীর গোড়ার দিকে, মসজিদটি একটি গম্বুজবিশিষ্ট বর্গাকার কাঠামো এবং এর উঠোনের পাকাকরণের মাধ্যমে সংস্কার করা হয়েছিল।
স্থাপত্য
মসজিদটি ধাপযুক্ত পাথরের স্টাইলে নির্মিত, যা প্রাচীন আবিসিনিয়ান অ্যাক্সিমাইট পাথরের কাজের সঙ্গে যুক্ত। লাকুনারির কাঠ দিয়ে তৈরি কাঠের সিলিংগুলি খোদাই ও রঙ করা।
কেন্দ্রীয় উঠোনটির পরিমাপ ৮০ বাই ৬০ মিটার (২৬০ ফুট × ২০০ ফুট), উত্তর-দক্ষিণ দিকে সাজানো নামাজের হলগুলি। পূর্ব-পশ্চিম দিকে সারিবদ্ধ তিনটি আইলসহ হলগুলি অন্যান্য অঞ্চল থেকে আনা প্রাক-ইসলামিক সময়ের উপকরণ দিয়ে তৈরি। উঠোনের ভেতরে ১৬ শতকের একটি গম্বুজযুক্ত কাঠামো রয়েছে। এটি একটি অটোমান ভবন যা মক্কার কা'বার মতো। এই কাঠামোটি প্রথমে মসজিদের কোষাগার হিসেবে কাজ করেছিল এবং পরে ওয়াকফের জন্য একটি সংরক্ষণের স্থান হিসেবে কাজ করে। এর মসজিদের একটি বিশাল গ্রন্থাগার ও অন্যান্য প্রাচীন পাণ্ডুলিপি রয়েছে। মসজিদ পরিদর্শনের সময় নিজেদের পবিত্র করতে ইচ্ছুকদের জন্য অযু পুল রয়েছে।
সংরক্ষণ
১৯৮৬ সালে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের তালিকায় অনুযায়ী, এই মহান মসজিদটি ৩৪৫ নম্বর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত , যার মধ্যে রয়েছে ১০৩টি মসজিদ, ১৪টি হাম্মাম এবং সানার ৬ হাজারেরও বেশি ঘর, যা একাদশ শতাব্দীর আগে নির্মিত হয়েছিল। ব্যতিক্রমী ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক মূল্যের এই মসজিদটির সংরক্ষণে ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ ইনস্টিটিউট অফ ট্রেনিং অ্যান্ড রিসার্চ-এশিয়া অ্যান্ড প্যাসিফিক (সাংহাই) সহায়তা করেছে।
২০০৩ সালে শুরু হওয়া মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ পর্যায়ক্রমে চলছে, যেমন বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা সংস্কার। প্লাস্টারিং পুনঃনির্মাণ করা হয়েছে, যার মধ্যে কুদ্দাদ নামে পরিচিত পুরাতন ঐতিহ্যবাহী প্লাস্টার পুনরুদ্ধার করা হয়েছে।পেভিং উন্নত করা হয়েছে এবং মিনারগুলিও। অজু করার জায়গাগুলিতে উন্নতি করণের পাশাপাশি আধুনিক টয়লেট নির্মাণ করা হয়। এমনকি মসজিদের ঐতিহাসিক ও স্থাপত্য বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে মেলে না এমন পুরানো ভবন অপসারণ করা হয়।
