গবেষণার প্রকল্পে কেনাকাটা ও নির্মাণে বেশি মনোযোগ

আপডেট : ০৬ মার্চ ২০২৬, ০১:০৭ এএম

গবেষণার মাধ্যমে পোলট্রি খাতের উন্নয়নে প্রযুক্তি, জাত উন্নয়ন, সাশ্রয়ী মূল্যের পোলট্রির মাংস ও ডিমের প্রক্রিয়াজাতকরণ ও ভ্যালু অ্যাডিশনের উদ্দেশ্যে হাতে নেওয়া হয় ‘পোলট্রি গবেষণা ও উন্নয়ন জোরদারকরণ’ প্রকল্প। ১৩৫ কোটি ৭৫ লাখ টাকা ব্যয়ের এ প্রকল্প এখন শেষ হওয়ার পথে। অধিকাংশ টাকাও খরচ হয়েছে। তবে কেনাকাটা, ভৌত অবকাঠামোসহ নানান কাজ শেষ হলেও গবেষণার দৃশ্যমান কোনো ফলাফল নেই।

জানা গেছে, ২০১৯ সালের জুনে শুরু হয় এ প্রকল্প। দুই দফা মেয়াদ বাড়ানোর পর এখন একেবারেই শেষ প্রান্তে। বরাদ্দকৃত টাকার মধ্যে ১২২ কোটি টাকার বেশি খরচ হয়েছে। তবে প্রকল্প শেষ হওয়ার আগেই এ প্রকল্পের ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।

অভিযোগ উঠেছে, সুদূর আফ্রিকা থেকে গবেষণার জন্য দুই দফায় আনা হয়েছিল ২২টি উটপাখি। কথা ছিল গবেষণার মাধ্যমে দেশীয় আবহাওয়া সঙ্গে মানিয়ে জাত উন্নয়ন করার। কিন্তু গবেষণার শেডে এখন মাত্র চারটি উটপাখি রয়েছে। বাকিগুলো প্রকল্প পরিচালকসহ অন্যান্য কর্মকর্তা রান্না করে খেয়ে ফেলেছেন। বিষয়টি নিয়ে হইচই হলেও প্রকল্পের কিছু যায় আসে না। এখান থেকে গবেষণার মাধ্যমে দেশীয় আবহাওয়ায় পালন উপযোগী করে কোনো জাতের উন্নয়ন বা উদ্ভাবন হয়নি এ প্রকল্প থেকে।

পোলট্রি গবেষণা ও উন্নয়ন জোরদারকরণ শিরোনামের শুরুতেই পোলট্রি গবেষণার কথা বলা হয়। পরিকল্পনা ছিল, প্রকল্পটির আওতায় দেশীয় পোলট্রি প্রজাতির সংরক্ষণ ও উন্নয়ন, উন্নত প্রযুক্তি উদ্ভাবন, পোলট্রি খাদ্যের পুষ্টিমান নির্ধারণ, নিরাপদ মাংস ও ডিম উৎপাদন বৃদ্ধি এবং খামারিদের জন্য আধুনিক প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করা। একই সঙ্গে গবেষণা অবকাঠামো উন্নয়ন, আধুনিক গবেষণাগার সরঞ্জাম ক্রয়, পোলট্রি শেড নির্মাণ ও মেরামত এবং অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণসহ বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়নের মাধ্যমে পোলট্রি শিল্পের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল।

তথ্য অনুযায়ী, গত সাত বছরে সরাসরি গবেষণা কার্যক্রমের জন্য বরাদ্দ ছিল প্রায় ৬ কোটি ৩০ লাখ টাকা। এ ছাড়া গবেষণার সহায়ক উপকরণ যেমন রাসায়নিক দ্রব্য, গ্লাসওয়ার, বিভিন্ন ধরনের স্পেয়ার পার্টস, পোলট্রি ফিড, ভ্যাকসিন ও ওষুধ বাবদ বরাদ্দ ছিল আনুমানিক ১৫ কোটি টাকা। একই সঙ্গে ল্যাবরেটরির যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য সরঞ্জাম ক্রয়ের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রায় ২৫ কোটি টাকা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা জানান, ‘পোলট্রি গবেষণা ও উন্নয়ন জোরদারকরণ’ প্রকল্পের আওতায় পরিচালিত গবেষণা কার্যক্রমের প্রধান গবেষকরা প্রকল্পের গবেষণার জন্য নির্ধারিত মোট বরাদ্দের ২৫ শতাংশ অর্থও বাস্তবে হাতে পাননি। এত বিপুল অর্থ বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও প্রকল্পের মূল লক্ষ্য অনুযায়ী দৃশ্যমান গবেষণা ফলাফল বা প্রযুক্তি উদ্ভাবনের অগ্রগতি না থাকায় প্রকল্পটির কার্যকারিতা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন উঠেছে।

লক্ষ্যের গবেষণার মাধ্যমে প্রযুক্তি ও জাত উদ্ভাবনের যে পর্ব রয়েছে, সেগুলোতে শুরু থেকেই মনোযোগ ছিল না প্রকল্প বাস্তবায়ন সংশ্লিষ্টদের। তবে অবকাঠামো উন্নয়ন, গবেষণার সরঞ্জাম কেনা, পোলট্রি শেড নির্মাণসহ অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণে বাড়তি মনোযোগ ছিল প্রকল্প পরিচালকের। কেনাকাটা ও নির্মাণের কাজগুলো ধারাবাহিকভাবেই সম্পন্ন করেছেন, কোনো কোনোটা শেষও হয়েছে।

যেমন প্রকল্পের আওতায় সৈয়দপুর আঞ্চলিক কেন্দ্রের অবকাঠামো উন্নয়ন ও যন্ত্রপাতি কেনার কাজ সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু প্রকল্পের ঘোষিত লক্ষ্য অনুযায়ী পোলট্রি গবেষণা, প্রযুক্তি উদ্ভাবন কিংবা খামারিদের জন্য কার্যকর প্রযুক্তি হস্তান্তরের উল্লেখযোগ্য কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি এখনো পাওয়া যায়নি।

বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য থেকে জানা গেছে, ২০২১ সালের পর পোলট্রি খাতের জন্য নতুন কোনো প্রযুক্তি তালিকাভুক্ত হয়নি। অর্থাৎ, এ প্রকল্প থেকে কোনো প্রযুক্তি উদ্ভাবনের বাস্তব তথ্য নেই। প্রকৃত গবেষণার জন্য বিজ্ঞানীদের একটি নির্দিষ্ট বরাদ্দ নির্ধারণ করা ছিল। কিন্তু প্রকল্প পরিচালক গবেষণার জন্য বিজ্ঞানীদের এসব বরাদ্দ প্রদান করেনি। এ নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে ক্ষোভও রয়েছে। অভিযোগ আছে, খামারিদের জন্য এ প্রকল্প থেকে ফলপ্রসূ কোনো প্রযুক্তি বা জাতের উদ্ভাবন হয়নি, যা ব্যবহার করে খামারিরা তাদের ব্যয় কমিয়ে উৎপাদন বাড়াতে পারে। অপ্রচলিত ও বিদ্যমান পোলট্রি খাদ্যের উপাদানগুলোর পুষ্টিমান নিরূপণ এবং গবেষণার মাধ্যমে সাশ্রয়ী মূল্যে পোলট্রির মাংস ও ডিমের প্রক্রিয়াজাতকরণ করে ভ্যালু অ্যাডিশনের কথা ছিল। কিন্তু দেশের বেসরকারি খাতের পোলট্রি পণ্যের প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে যেসব পণ্য বাজারজাত করছে, এর বাইরে কোনো প্রযুক্তি বা প্রক্রিয়াজাতকরণ পণ্য বাজারে আসেনি এ প্রকল্পটি থেকে। একই সঙ্গে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, রোগ দমন নিয়েও ব্যাপক কাজের পরিকল্পনার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে তার ধারেকাছেও যায়নি প্রকল্পটি।

প্রকল্পের একটি বড় উদ্দেশ্য ছিল জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যাযে বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে গবেষণা ও উন্নয়নের প্রয়োজনে সহযোগিতা বাড়ানো। যাতে করে বিজ্ঞানী, গবেষক ও রিসার্চ ফেলোদের গবেষণার সক্ষমতা বাড়ানো। কিন্তু দেখা গেছে উল্টো চিত্র। প্রকল্প পরিচালক সাজেদুল করিম সরকারের স্ত্রী ড. ফারহানা শারমিনকে প্রকল্পের শুরু থেকেই পোস্ট ডক্টরেট ফেলো রিসার্স হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল লক্ষাধিক টাকার বেশি বেতনে। একাধিকবার তাকে রিসার্স ফেলে হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল এ প্রকল্পে। অথচ অনেক যোগ্য কর্মকর্তাকে ফেলো হিসেবে আবেদনের সুযোগই দেওয়া হয়নি।

প্রকল্পে পোস্ট ডক্টরাল ফেলোশিপের জন্য প্রায় ৬৫ লাখ টাকা বরাদ্দ থাকলেও সেই অর্থের একটি বড় অংশ স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে প্রকল্প পরিচালকের স্ত্রী ফারহানা শারমিনকে প্রদান করা হয়েছে বলে জানা গেছে। স্বজনপ্রীতির বিষয়ে অবশ্য মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগও করেছিলেন একাধিক কর্মকর্তা। কিন্তু এসব বিষয়ে তদন্তে শেষ পর্যন্ত এ পরিচালককেই বাঁচিয়ে দেওয়া হয়েছে।

এদিকে প্রকল্পের আওতায় বিপুল অর্থ ব্যয়ে বিভিন্ন অত্যাধুনিক ল্যাবরেটরি যন্ত্রপাতি কেনা হলেও সেগুলোর বেশিরভাগই এখনো পুরোপুরি চালু করা হয়নি। কিছু কিছু যন্ত্র ল্যাবে পড়ে পড়ে নষ্ট হওয়ার পথে বলেও জানা গেছে। বিজ্ঞানীদের মতে, পরিকল্পনা ও প্রযুক্তিগত প্রস্তুতির ঘাটতির কারণে এসব যন্ত্রপাতির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়নি।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক মো. সাজেদুল করিম সরকার দেশ রূপান্তরকে জানান, প্রকল্পের বিষয়ে জানতে হলে বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএলআরআই) মহাপরিচালকের মাধ্যমে আসতে হবে। তবেই তিনি কথা বলবেন বলে জানান।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত