আসুন কিডনির যত্ন নিই

আপডেট : ০৮ মার্চ ২০২৬, ০১:২৩ এএম

সহকারী অধ্যাপক ডা. সরাবন তহুরা

কিডনি বিশেষজ্ঞ, নেফ্রোলজি বিভাগ ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা

মানুষের শরীরের অতি প্রয়োজনীয় অঙ্গ কিডনি। হার্ট, ফুসফুস ও মস্তিষ্কের পরই এর স্থান। রক্তে জমে যাওয়া আবর্জনাকে পরিষ্কার করাই কিডনির প্রধান কাজ। সাধারণভাবে কিডনির কাজকে চার ভাগে ভাগ করা যায়।

এক. রক্তের ভেতর জমা আবর্জনা পরিশোধিত করা এবং তা প্রস্রাবের মাধ্যমে শরীর থেকে বের করা। দুই রক্তের পি এইচ (ঢ়ঐ), এসিডিটি, লবণ, ক্ষার ও পটাশিয়ামের মাঝে সমন্বয় করা। তিন রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করা। চার হরমোন তৈরিতে সাহায্য করা। কিডনি বিকল হওয়ার জন্য আমাদের কিছু অনিয়ম দায়ী। যেসব অনিয়মের কারণে কিডনি বিকল হতে পারে জেনে নিন।

প্রস্রাব আটকে রাখা : প্রসব আটকে রাখা ইউরিন ইনফেকশনের প্রধান কারণ। বারবার ও দীর্ঘসময় ইউরিন ইনফেকশনে কিডনি বিকল হতে পারে। যারা প্রসাব আটকে রাখেন তারা এটা করবেন না।

শপিং মল, রেস্টুরেন্ট কিংবা মসজিদে ব্যবহৃত টয়লেট আপনি ব্যবহার করতে পারেন। নিকটস্থ ক্লিনিক হাসপাতাল ও পারলারে যেতে পারেন। বাসা থেকে বের হওয়ার আগেই, টয়লেটের কাজ সেরে নেওয়া। অফিস বা কারও বাসায় থাকলে বের হওয়ার আগে টয়লেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে ইতস্তত করা উচিত নয়। আপনি যদি রাস্তায় দুই থেকে তিন ঘণ্টাও থাকেন ইউরিনের অত চাপ তৈরি হবে না। সুস্থ মানুষের ৪ ঘণ্টা পর পর ইউরিন হওয়া স্বাভাবিক।

পর্যাপ্ত পানি পান না করা : সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের দৈনিক দুই থেকে তিন লিটার পানি পান করা প্রয়োজন। গরমে এবং অধিক পরিশ্রমে ঘাম বেরিয়ে গেলে পিপাসা বাড়বে। পানি পানের পরিমাণ খুব বেশি বা কম দুটোই ক্ষতিকর।

তাই সব সময় নিজের কাছে এক বোতল পানি রাখুন এবং পান করুন। যখন গরুর মাংস খাবেন তখন দেখবেন পানির পিপাসা বেশি লাগছে। তখন একটু বেশিই পানি পান করুন। লবণ যদি বেশি খেয়ে থাকেন, পানি কিছুটা বেশি খান। পানি পানের  নিয়ম হলো সকালে ঘুম থেকে উঠেই ২ গ্লাস পানি খালি পেটে পান করা। তার আধা ঘণ্টা পর সকালের খাবার খেয়ে নেওয়া। দুপুরের খাবারের আধা ঘণ্টা আগে ২ গ্লাস পানি পান এবং রাতের খাবারের দুই ঘণ্টা আগে ২ গ্লাস পানি পান করা। এভাবে পানি পান করলে প্রতিদিনকার শরীরের যে পানির চাহিদা হয় তার অর্ধেক পানি পান করা হয়ে যায়। এ ছাড়াও হজমের জন্য  যেমন দরকারি তেমনি রক্ত পরিষ্কার করতেও সহায়তা করে।

অতিরিক্ত লবণ খাওয়া : অতিরিক্ত লবণ খাওয়ার অভ্যাস  কিডনির ক্ষতির পাশাপাশি উচ্চ রক্তচাপ এর জন্য দায়ী। রান্নায় লবণের পরিমাণ কমিয়ে আনা। সুস্থ মানুষের ৩-৪ গ্রামের বেশি লবণ প্রয়োজন নেই। প্রতিটি খাবারের উপাদানে কিছু না কিছু লবণ থাকে। খাবারের সঙ্গে আলগা লবণ বাদ দিতে হবে।  তরকারিতে আস্তে আস্তে লবণের পরিমাণ কমিয়ে আনা। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা। শরীরে সোডিয়ামের ভারসাম্য হারালে হৃদরোগসহ নানা জটিলতা তৈরি হয়। উচ্চ রক্তচাপ থেকে কিডনি নষ্ট হয়। ডায়রিয়া হলে শরীর থেকে পানিসহ খনিজ উপাদান লবণ বেরিয়ে যায়। সে সময় স্যালাইন খেয়ে লবণ ও পানির ঘাটতি পূরণ করা। ডায়রিয়ার কারণে কিডনিরও ক্ষতি হয়।

সংক্রমণের দ্রুত চিকিৎসা না করা : সংক্রামিত রোগ অবহেলা না করা। বিশেষ করে মূত্রনালি ও মূত্রথলির নানা সংক্রমণ রোগ আছে। সবসময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা। ঘরবাড়ি টয়লেট পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্ত রাখা। পাবলিক টয়লেট ব্যবহারে সতর্ক থাকা। খাবারের আগে সাবান বা হ্যান্ডওয়াশ দিয়ে হাত পরিষ্কার করা।

বেশি প্রোটিন খাওয়া : বয়স অনুযায়ী শরীরে জন্য যতটুকু প্রোটিন দরকার ততটুকুই গ্রহণ করা। মাত্রার অধিক প্রোটিন গ্রহণে শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম বিঘœ ঘটে। কিডনিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

প্রয়োজনের তুলনায় কম খাওয়া : কোনোভাবেই তিন বেলার খাবার বাদ দেওয়া যাবে না। খাবারের তালিকায় সুষম এবং পরিমিত খাবার থাকতে হবে। সকালের খাবার ৯টার মধ্যে খেয়ে নিতে পারলে ভালো। সকালের নাশতায় প্রোটিন গ্রহণ করতে হবে।

দুপুরের খাবার ২টার মধ্যে শেষ করা। খাবারে পরিমিত মাছ-মাংস ও সবজি রাখা। রাতের খাবার রাত ৯টার আগে শেষ করা। রাতের খাবার ঘুমাতে যাওয়ার অন্তত দুই ঘণ্টা ব্যবধান রাখা। নিয়ম হচ্ছে সকাল এবং দুপুরে একটু বেশি। রাতে একটু কম খাওয়া।

ব্যথার ওষুধ সেবন : ব্যথার ওষুধের ৮০ ভাগই কিডনির জন্য ক্ষতিকর। তাই যখন তখন ব্যথার ওষুধ খাওয়া যাবে না। ব্যথার ওষুধ অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ ছাড়া খাওয়া যাবে না।

ওষুধ সেবনে অনিয়ম : কোনোভাবেই কোনো একবেলা ওষুধ বাদ দেওয়া যাবে না। অনেক ওষুধের ডোজের সময়সীমা থাকে। সে সব ওষুধ অবশ্যই ডোজ সম্পূর্ণ করতে হবে। খাবার আগের ওষুধ খাবার আগে, খাবার পরের ওষুধ খাবার পরে গ্রহণ করতে হবে। সকালের ওষুধ দুপুরে বা দুপুরের ওষুধ রাতে গ্রহণ করা যাবে না। কিছু ওষুধ আছে যেগুলো ঘণ্টা ধরে খেতে হয়, সেটাও মানতে হবে। ডাক্তারের পরামর্শ অনুসারে সেটা অনুসরণ করতে হবে। ওষুধ গ্রহণ ওভার-ডোজ হয়ে গেলে কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

অতিরিক্ত মদ্যপান : মাত্রাতিরিক্ত অ্যালকোহল গ্রহণ ক্ষতিকর। শুধু কিডনি না লিভারের ক্ষতিও করে।

বিশ্রাম না নেওয়া : টানা পরিশ্রম করা যাবে না। বিরতি নিয়ে বিশ্রাম নিতে হবে। দৈনিক ৭-৮ ঘণ্টা ঘুম সুস্থ মানুষের জন্য স্বাভাবিক। এ ছাড়া প্রোডাক্টিভ কাজের জন্য প্রতি ২ ঘণ্টা পর ২০ মিনিট বিশ্রাম নিতে হবে। হাঁটার ক্ষেত্রেও  একটানা না হেঁটে বিশ্রাম নিয়ে নিয়ে হাঁটতে হবে। রাত ১১টার আগে ঘুমানো সব থেকে ভালো। কোনো কারণে রাত জাগতে হলে ওই দিনের ঘুম অবশ্যই দিনের বেলা ঘুমিয়ে পুষিয়ে দিতে হবে। অনেকে রাতের বেলা কাজ করতে অভ্যস্ত হয়ে যান, তারা মেডিকেল চেকআপের মধ্যে থাকবেন। কারণ আপনি স্বাভাবিক সুস্থ শরীর বৃত্তীয় কাজের ব্যাঘাত ঘটিয়ে নতুন সাইকেল তৈরি করেছেন। সেটি শরীরের সঙ্গে এডজাস্ট নাও হতে পারে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত