ডা. জুয়েল রায়
মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল
প্রতিদিনের ব্যস্ত জীবনে আমরা অনেক কিছুই গুরুত্ব দিয়ে করি, কিন্তু সবচেয়ে সহজ অথচ গুরুত্বপূর্ণ হলো হাত ধোয়া। অথচ এই বিষয়টি অবহেলিত থেকে যায়। ৫ মে বিশ্ব হাত ধোয়া দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সুস্থ থাকার প্রথম ধাপই হলো পরিষ্কার হাত। এটি শুধু ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার বিষয় নয়, বরং জনস্বাস্থ্য রক্ষার এক শক্তিশালী উপায়। এ বছর ‘জীবন বাঁচান : আপনার হাত পরিষ্কার করুন’ প্রচারাভিযানের লক্ষ্য হলো স্বাস্থ্যসেবায় হাত ধোয়ার গুরুত্ব সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা বজায় রাখা এবং বিশ^জুড়ে হাত ধোয়ার অভ্যাসের উন্নতির সমর্থনে ‘মানুষকে একত্রিত করা’।
কেন হাত ধোয়া জরুরি
আমাদের হাতই হলো জীবাণুর প্রধান বাহক। আমরা প্রতিনিয়ত দরজার হাতল, মোবাইল ফোন, টাকা-পয়সা, খাবারসহ নানা জিনিস স্পর্শ করি, যেগুলোর মাধ্যমে অদৃশ্য জীবাণু হাতে লেগে যায়। এই হাত দিয়েই যখন আমরা মুখ, চোখ বা খাবার স্পর্শ করি, তখন জীবাণু সহজেই শরীরে প্রবেশ করে। তাই নিয়মিত হাত ধোয়া আমাদের শরীরকে বিভিন্ন সংক্রমণ থেকে সুরক্ষিত রাখে।
হাত ধোয়ার উপকারিতা
হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তুললে অনেক ধরনের রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। যেমন ডায়রিয়া, সর্দি-কাশি, ফ্লু, এমনকি অনেক ভাইরাসজনিত সংক্রমণও কমে যায়। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে অত্যন্ত কার্যকর, কারণ তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তুলনামূলক কম। পরিষ্কার হাত শুধু রোগ কমায় না, এটি সামাজিক সচেতনতারও পরিচয় দেয়। একজন সচেতন ব্যক্তি নিজে সুস্থ থাকেন এবং অন্যদেরও নিরাপদ রাখেন। হাসপাতাল, স্কুল কিংবা অফিস সব জায়গাতেই হাত ধোয়ার অভ্যাস সংক্রমণ কমাতে বড় ভূমিকা রাখে।
কী ক্ষতি
হাত না ধোয়ার ফলে শরীরে নানা ধরনের ক্ষতিকর জীবাণু প্রবেশ করে, যা বিভিন্ন রোগের কারণ হতে পারে। ডায়রিয়া ও খাদ্যজনিত রোগ এর মধ্যে সবচেয়ে সাধারণ। এ ছাড়া চোখে হাত দিলে চোখের সংক্রমণ, নাকে-মুখে হাত দিলে শ্বাসতন্ত্রের রোগও হতে পারে। বিশেষ করে রান্নার আগে বা খাবার গ্রহণের সময় হাত পরিষ্কার না থাকলে খাদ্যে জীবাণু ছড়িয়ে পড়ে, যা পুরো পরিবারের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বেশি।
সচেতনতার বিকল্প নেই
হাত ধোয়া একটি ছোট অভ্যাস হলেও এর প্রভাব অনেক বড়। আমাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার প্রথম এবং সবচেয়ে সহজ ধাপ। পরিবার, স্কুল ও সমাজে এই অভ্যাস গড়ে তুলতে পারলে আমরা অনেক রোগ থেকে মুক্ত থাকতে পারি। বিশ্ব হাত ধোয়া দিবস শুধু একটি দিন নয়, এটি আমাদের প্রতিদিনের জীবনে একটি সচেতনতার বার্তা ‘পরিষ্কার হাত, সুস্থ জীবন।’ অতএব, আজ থেকেই নিজে সচেতন হই, অন্যকেও সচেতন করি। কারণ সুস্থতার চাবিকাঠি আমাদের নিজের হাতেই।
সঠিকভাবে ধোয়া
শুধু পানিতে হাত ভেজালেই যথেষ্ট নয়, সঠিক নিয়মে হাত ধোয়া জরুরি। প্রথমে পরিষ্কার পানিতে হাত ভিজিয়ে নিতে হবে। এরপর সাবান নিয়ে দুই হাত ভালোভাবে ঘষতে হবে। হাতের তালু, আঙুলের ফাঁক, নখের নিচে এবং হাতের পেছনের অংশ অন্তত ২০ সেকেন্ড ধরে পরিষ্কার করা। তারপর পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে ফেলতে হবে এবং পরিষ্কার কাপড় বা টিস্যু দিয়ে মুছে নিতে হবে। বিশেষভাবে খেয়াল রাখতে হবে, খাবার আগে ও পরে, টয়লেট ব্যবহারের পর, বাইরে থেকে এসে, কিংবা অসুস্থ ব্যক্তির সেবা করার পর অবশ্যই হাত ধুতে হবে।