শরীয়তপুর জেলার ১৫টি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে দায়িত্ব পালন করছেন নারী কর্মকর্তারা। জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারসহ প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ে নারী কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালনে সমাজে নারী নেতৃত্ব ও অংশগ্রহণ বাড়ছে। তাদের নেতৃত্বে জেলার সরকারি সেবা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ওই কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শরীয়তপুরের তিনটি আসনে শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। তাদের ব্যক্তিগত বিভিন্ন উদ্যোগ শরীয়তপুরের মানুষের মধ্যে ইতিবাচক ধারনা তৈরি হচ্ছে।
জেলা প্রশাসন সূত্র জানায় শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসক তাহসিনা বেগম, পুলিশ সুপার রওনক জাহান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসটি) সাদিয়া জেরিন, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিষ্টেট মৌসুমি মান্নান, গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী শারমিন আক্তার, জেলা রেজিস্টার হেলেনা পারভিন, জেলা কারাগারের জেলার আসমা আক্তার, বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ডের উপপরিচালক সুপ্রিয়া বর, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক জান্নাতুল ফেরদৌস, জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা নাজনীন শামীমা, আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের সহকারী পরিচালক উম্মে কুলসুম, সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা ইলোরা ইয়াসমিন, গোসাইরহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নুশরাত আরা খানম, নড়িয়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) লাকী দাস, জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিষ্টেট মেহের আফরোজ সুবর্না ও নুসরাত জাহান আরবী দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।
শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসক তাহসিনা বেগম গত বছর জুলাই মাসে শরীয়তপুরে যোগদান করেছেন। ২৫ তম বিসিএসের এ কর্মকর্তা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করার পর ২০০৬ সালে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন। জেলা প্রশাসক হিসেবে যোগদানের পরই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের নেতৃত্ব দেন তিনি। জেলা প্রশাসনের বিভিন্ন কাজের ফাকে তিনি সম্প্রতি শরীয়তপুর জেলা শহরের নাগরিকদের নিরপদে বসবাস ও চলাচলের জন্য নজরদারি নিরাপত্তা কার্যক্রম করার জন্য শহরের ১৪ কিলোমিটার এলাকা জুরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি সংযুক্ত সিসি ক্যামেরা স্থাপন করেছেন। তার ওই উদ্যোগটি নাগরিকদের মধ্যে ইতিবাচক ধারনা তৈরি করেছে।
তাহসিনা বেগম বলেন, জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে কাজ করার সুযোগ আমার কর্মজীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অভিজ্ঞতা। জেলা প্রশাসনের প্রধান হিসেবে রাষ্ট্রের সকল উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন ও সমন্বয় করা একদিকে যেমন বিশাল দায়িত্বের ও চ্যালেঞ্জের, তেমনি অত্যন্ত গর্বের। সরকারী নীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে নারীর প্রতি বৈষম্য নিরোধ, বাল্যবিবাহ ও নারী নির্যাতন প্রতিরোধে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা তদারকি, নারী শিক্ষার বিস্তার, নারীদের স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি, বিভিন্ন প্রশিক্ষণ প্রদান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করণের মাধ্যমে নারীকে স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলার মাধ্যমে সমাজে নারীর মর্যাদা বৃদ্ধিতে জেলা প্রশাসক হিসেবে অবদান রাখতে পারা আমার বর্তমান কর্মজীবনের অন্যতম সার্থকতা বলে মনে করছি। জেলার জনসাধারণের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়নে কাজ করে যাওয়া জেলা প্রশাসক হিসেবে আমার প্রধান লক্ষ্য।
গত বছর ২৯ নভেম্বর পুলিশ সুপার হিসেবে শরীয়তপুরে যোগদান করেন রওনক জাহান। ২৭ তম বিসিএসের ওই কর্মকর্তা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও অস্ট্রেলিয়ার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করেছেন। তিনি শরীয়তপুরের প্রথম নারী পুলিশ সুপার। এর আগে যশোরের পুলিশ সুপার ও ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ডিসি (ক্রাইম) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
গত তিন মাসে আলোচিত জাজিরার বিলাশপুরে ককটেল তৈরির কারখানার সন্ধান, বিভিন্ন স্থান হতে অস্ত্র-ককটেল উদ্ধার ও পেট্রল দিয়ে পুরিয়ে ব্যবসায়ী খোকন দাস হত্যা মামলার সব আসামি গ্রেপ্তার করা হয়েছে পুলিশ সুপার রওনক জাহানের নেতৃত্বে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও পুলিশ বাহিনীকে সঠিক নেতৃত্ব দিয়েছেন। যার কারনে নির্বাচনকালীন সময়ে বড় কোন সহিংসতার ঘটনা শরীয়তপুরে ঘটেনি।
রওনক জাহান বলেন, অনেক চ্যালেঞ্জিং পেশা। তারপরও দায়িত্ব পালনে সফল হওয়ার চেষ্টা করি। অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও মানুষকে নিরাপত্তা দিয়ে যাচ্ছি। বিশেষ করে নারীদের আইনি সুরক্ষার কথা বেশি মাথায় রাখি।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সাদিয়া জেরিন ২০২৩ সালের নভেম্বরে শরীয়তপুরে যোগদান করেন। ৩৩ তম বিসিএসের ওই কর্মকর্তা বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। জেলা প্রশাসনের বিভিন্ন বিভাগের দায়িত্ব সফলতার সঙ্গে পালন করেছেন। ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
সাদিয়া জেরিন বলেন, একজন গণকর্মচারী হিসেবে আমার কাছে আত্মতুষ্টির সবচেয়ে বড় জায়গা সেবা গ্রহীতার সন্তুষ্টি। কাজের মাধ্যমে প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষের সন্তুষ্টি দেখার সৌভাগ্য হয়েছে যা আমাকে সবসময় অনুপ্রাণিত করে। সর্বোচ্চ আন্তরিকতা ও পেশাদারিত্ব নিয়ে সামনের দিনগুলোতেও দায়িত্ব পালনের প্রত্যাশা রাখি।
৩৪ তম বিসিএসের কর্মকর্তা মৌসুমি মান্নান শরীয়তপুরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিষ্টেট। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা শেষ করে ২০১৬ সালে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন। গত ডিসেম্বরে তিনি শরীয়তপুরে যোগদান করেন। এরপরই জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পালন করেন।
শরীয়তপুর সদর উপজেলা নিবার্হী কর্মকর্তা ইলোরা ইয়াসমিন ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে যোগদান করেন। ৩৫ তম বিসিএসের ওই কর্মকর্তা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় হতে পড়ালেখা শেষ করে ২০১৭ সালে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন।
ইলোরা ইয়াসমিন বলেন, প্রতিটি নারীরই অর্থনৈতিক মুক্তি থাকা প্রয়োজন । যার জন্য আত্মনির্ভরশীল হওয়ার বিকল্প নেই। কর্মক্ষেত্রে যোগ্যতা নারীর আত্মসম্মান বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। একজন নারীর কাছে কর্মজীবন ও পারিবারিক জীবন দুটিই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
২০২৪ সালের অক্টোবরে জেলা কারাগারের জেলার হিসেবে শরীয়তপুরে যোগদান করেন আসমা আক্তার। ময়মনসিংহ আনন্দমোহন কলেজ হতে পড়ালেখা শেষ করে ২০০৯ সালে কারা অধিদপ্তরে যোগদান করেন। বিভিন্ন কারাগারে সহকারী জেলার ও জেলার পদে দায়িত্ব পালন করেছেন।
নুশরাত আরা খানম গত বছর ৯ ডিসেম্বর গোসাইরহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করেন। ৩৫ তম বিসিএসের ওই কর্মকর্তা ইডেন মহিলা কলেজ হতে পড়ালেখা শেষ করে ২০১৭ সালে কর্মজীবনে আসেন।
জেলা রেজিস্টার হিসেবে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে শরীয়তপুরে আসেন হেলেনা পারভিন। রাজশাহী বিশ্ব বিদ্যালয় হতে পড়ালেখা করে ওই কর্মকর্তা ২০০৪ সালে আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে সাবরেজিষ্টার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন।
বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ডের শরীয়তপুর কার্যালয়ের উপপরিচালক সুপ্রিয়া বর জেলায় দায়িত্ব পালন করছেন ২০২৪ সালের ২৪ জুলাই হতে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে স্নাতকোত্তর পাস করে ২০০৭ সালে কর্মজীবনে আসেন।
নড়িয়া উপজেলা সহকমিশনার (ভূমি) লাকী দাস গত বছর ফেব্রুয়ারিতে নড়িয়ায় যোগদান করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে পড়ালেখা শেষ করে ৩৮ তম বিসিএসের মাধ্যমে ২০২০ সালে কর্মজীবনে আসেন। জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যজিষ্টেট হিসেবে ৪৪ তম বিসিএসের মেহের আফরোজ ও নুসরাত জাহান গত ১০ ফেব্রুয়ারি শরীয়তপুরে যোগদান করেছেন।
আঞ্চলিক পাসপোর্ট কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক উম্মে কুলসুম গত বছর ফেব্রুয়ারিতে শরীয়তপুরে যোগদান করেন। ময়মনসিংহ আনন্দ মোহন কলেজ হতে শিক্ষা জীবন শেষ করে ২০২০ সালে কর্মজীবন শুরু করেন।
জেলা ত্রান ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা হিসেবে নাজনীন শামীমা গত বছর এপ্রিলে শরীয়তপুরে আসেন। একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হতে পড়ালেখা শেষ করে ২০০২ সালে কর্মজীবন শুরু করেন। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক জান্নাতুল ফেরদৌস ২০২৪ সালের ডিসেম্বর হতে শরীয়তপুরে দায়িত্ব পালন করছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে স্নাতকোত্তর শেষ করে ৩৩ তম বিসিএসের মাধ্যমে ২০২৫ সালে কর্মজীবন শুরু করেন।
জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, একজন নারী হিসেবে মাঠেঘাটে দায়িত্ব পালন করতে অনেক চ্যালেঞ্জের মধ্যে পরতে হচ্ছে। চ্যালেঞ্জ নিয়েই সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। আমার জীবনে সবচেয়ে বড় উপলব্ধি হচ্ছে প্রতিটি নারীকে পড়ালেখা করে স্বাবলম্ভি হতে হবে। যেকোন সময় যেকোন পরিস্থিতিতে নারীদের জীবনে অনিশ্চয়তা আসতে পারে। তখন স্বাবলম্ভি নারীকে কোন বাঁধা আটকে রাখতে পারেনা।
স্মৃতিসৌধে নতুন চিফ হুইপ ও হুইপদের শ্রদ্ধা
জামিন পেলেন সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হক
মৃত্যুর খবরে বিরক্ত হায়দার হোসেন