দেশি বীজ সংরক্ষণ করে জাত টিকিয়ে রাখতে খুলনায় অনুষ্ঠিত হয়েছে ব্যতিক্রমধর্মী ‘গ্রামীণ বীজমেলা’। বটিয়াঘাটা উপজেলা মিলনায়তনে গত বৃহস্পতিবার বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা লোকজ ও মৈত্রী কৃষক ফেডারেশন যৌথভাবে এই মেলার আয়োজন করে। মেলায় ১৭টি গ্রামের অর্ধশতাধিক নারী কৃষক তাদের সংগৃহীত বীজ প্রদর্শন, বিনিময় ও বিক্রি করেন। সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত এই মেলা চলে। দিনব্যাপী কৃষিজীবীরাও স্বতঃস্ফূর্তভাবে মেলায় অংশ নেন। কৃষক ও উৎসাহী অনেকের অংশগ্রহণে দিনভর মেলা প্রাঙ্গণ ছিল উৎসবমুখর। সরেজমিন দেখা যায়, মেলায় কেউ এনেছিলেন মরিচশাইল, রানীস্যালুট, হিজলি ধানের বীজ। কেউ এনেছিলেন দিঘা, মোরগশাইল, কালামানিক ধানের বীজ। বিলুপ্ত প্রায় এসব দেশি ধানের বীজ তো ছিলই; আবার কারোর কাছে ছিল আলু, পটল, ধনে, সরিষা বীজ, তিল ও তিসিসহ ডাল ও মৌরির দানা। আর ছিল আলু, আদা, হরীতকী, লালশাক, পালংশাক, টমেটো, কালোজিরার বীজও।
মেলায় আসা কৃষক রামপ্রসাদ রায়, পলাশ মন্ডল ও শেফালি মন্ডল জানান, আধুনিক উচ্চফলনশীল জাতের ভিড়ে দেশীয় আদি জাতগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। এই মেলার মাধ্যমে কৃষকরা একে অপরের সঙ্গে বীজ বিনিময় করার সুযোগ পেয়েছেন। আগামী মৌসুমে চাষাবাদে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আর এই বীজ সংগ্রহের সাফল্য এ অঞ্চলের নারী কৃষকদেরই। তারা দীর্ঘদিন ধরে নিষ্ঠার সঙ্গে দেশী বীজ সংরকক্ষণ করে জাত টিকিয়ে রাখছেন। প্রদর্শিত বীজের সংখ্যা, বীজের বৈচিত্র্যময়তা, বীজের মান ও বীজ উপস্থাপন কৌশলের ওপর ভিত্তি করে মেলায় অংশগ্রহণকারী নারী কৃষকদের পুরস্কৃত করা হয়েছে। একটি নির্বাচনী প্যানেলের মাধ্যমে অংশগ্রহণকারী নারী কৃষকদের মধ্য থেকে এই পুরস্কার দেওয়া হয়। সুকদাড়া গ্রামের করুণা ম-লকে প্রথম, বিধবা নারী নমিতা সরকারকে দ্বিতীয় ও হালিয়া শিউলী মন্ডলকে তৃতীয় পুরস্কার প্রদান করা হয়।
লোকজ; এর নির্বাহী পরিচালক দেবপ্রসাদ সরকার জানান, প্রতি বছরের মতো এ বছরও মেলায় নারী কৃষকদের অভাবনীয় সাড়া পাওয়া গেছে। এই উদ্যোগ কৃষকদের বীজ সংরক্ষণের আগ্রহকে আরও বাড়িয়ে দেবে। তা দেশের কৃষি অর্থনীতিকে টেকসই করতে সহায়ক হবে।
মেলায় অংশ নিয়ে বটিয়াঘাটা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খন্দকার কামরুজ্জামান বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে দেশীয় জাতের বীজগুলোই আমাদের সবচেয়ে বড় রক্ষাকবচ। প্রান্তিক নারী
কৃষকরা যেভাবে বংশপরম্পরায় এই বীজগুলো টিকিয়ে রেখেছেন, তা সত্যিই প্রশংসনীয়।
লোকজ-এর প্রকল্প সমন্বয়কারী পলাশ দাশ জানান, ২০১৩ সালের দিকে স্থানীয় কৃষক, বিশেষত নারী কৃষকদের মধ্যে দেশীয় বীজ সংরক্ষণ, বিনিময় ও প্রদর্শনের ঐতিহ্য হিসেবে গ্রামীণ বীজমেলা শুরু হয়। পরবর্তী সময় স্থানীয় উন্নয়ন সংস্থা লোকজ ও মৈত্রী কৃষক ফেডারেশনের সহযোগিতায় এটি আনুষ্ঠানিক ও বৃহৎ আকার পায়। এই বছর ১৩তম মেলা উদযাপন করা হলো। তিনি আরও বলেন, বটিয়াঘাটার নারী কৃষকরা দীর্ঘদিন ধরে দেশীয় বীজ সংরক্ষণ ও বিনিময় কার্যক্রম চালিয়ে আসছেন। সেই উদ্যোগ থেকেই নিয়মিত গ্রামীণ বীজমেলার সূচনা।
স্থানীয় ব্যবসায়ী দীপক সাহা জানান, ২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৫ সালেও এখানে গ্রামীণ বীজমেলা অনুষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে ৫০-৪০০ জাতের ফলদ, বনজ ও সবজির বীজ প্রদর্শিত হয়েছে। শুধু বটিয়াঘাটা কেন্দ্রীয় মেলাটির প্রভাব পড়েছে পার্শ্ববর্তী দাকোপ উপজেলাসহ আশপাশের বিভিন্ন স্থানে। বটিয়াঘাটা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবু বক্কর সিদ্দিকী বলেন, বীজ একটি জাতির প্রাণ। কৃষকরা যদি বীজের জন্য অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তবে খাদ্যনিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে। এই মেলা আমাদের স্বাবলম্বী হওয়ার পথ দেখাচ্ছে।