মৃত স্বজনদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনার শ্রেষ্ঠ সময়

আপডেট : ০৯ মার্চ ২০২৬, ০৭:৫৫ এএম

জীবনের পথচলা যত দীর্ঘই হোক, শেষ ঠিকানা কবর। পৃথিবীতে মানুষের যত সম্পর্ক, যত অর্জনই থাকুক না কেন, মৃত্যুর পর সেসব কিছুই সঙ্গে যাবে না, আমল ও মানুষের দোয়া ছাড়া। মৃত্যুর পর মানুষের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয় আল্লাহর ক্ষমা ও রহমত। রমজান মাস সেই ক্ষমা ও রহমত লাভের সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ সময়। এই মাসে মহান আল্লাহ বান্দাদের জন্য রহমত ও মাগফিরাতের দরজা উন্মুক্ত করেন। জীবিত মানুষের জন্য যেমন এটি গুনাহ মাফের সুবর্ণ সুযোগ, তেমনি মৃত আত্মীয়স্বজনের জন্যও দোয়া ও সওয়াব পৌঁছে দেওয়ার মূল্যবান সময়। কারণ দোয়া ও নেক কাজের সওয়াব তাদের কবরে প্রশান্তি বয়ে আনবে।

হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুল (সা.) বলেছেন, মানুষ যখন মারা যায়, তখন তিনটি আমল ছাড়া তার সব আমল বন্ধ হয়ে যায়। তা হলোÑ সদকায়ে জারিয়া, এমন জ্ঞান যা দ্বারা মানুষ উপকৃত হয় এবং এমন সুসন্তান যে তার জন্য দোয়া করে। (মিশকাত ২০৩)

রমজানের দ্বিতীয় দশ দিন মাগফিরাতময়। মাগফিরাতের এই দশ দিনে আল্লাহতায়ালা অগণিত বান্দাকে ক্ষমা করেন। রমজানের মাগফিরাতের এই সময়ে নিজেদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনার পাশাপাশি মৃত আত্মীয়স্বজনদের জন্যও ক্ষমা প্রার্থনা করা উচিত। রমজান মাসে প্রতিদিন ইফতারের সময় ও রাতে আল্লাহতায়ালা বান্দাদের ক্ষমা করেন এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি দান করেন। তাই বরকতময় এই সময়ে মৃত আত্মীয়স্বজনদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা

করলে তাদের জন্য তা উপকার বয়ে আনবে। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুল (সা.) বলেছেন, প্রতিটি ইফতারের সময় এবং প্রতি রাতে লোকদের জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেওয়া হয়। (সুনানে ইবনে মাজাহ ১৬৪৩)

অনেকের মা-বাবা জীবিত নেই। তারা কবরে কী অবস্থায় আছে সেটাও কারও জানা নেই। তাই সন্তানের কর্তব্য হলো, মা-বাবার জন্য শান্তির দোয়া করা। যে শান্তির দোয়া করতে মহান আল্লাহ আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন। তা হলো, ‘রাব্বির হামহুমা কামা রব্বায়ানি সগিরা।’ অর্থাৎ হে আমার প্রতিপালক, তাদের উভয়ের প্রতি দয়া করুন, যেভাবে তারা আমাকে শৈশবকালে লালন-পালন করেছেন। (সুরা বনি ইসরাইল ২৪)

মহান আল্লাহ আমাদের মা-বাবা এবং নিজেদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করার দোয়াও শিখিয়ে দিয়েছেন। তাই এই ক্ষমার মাসে বেশি বেশি করে সেই দোয়া পাঠ করা চাই। এই বিষয়ে আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে বলেন, ‘রব্বানাগ ফিরলি ওয়ালি ওয়ালিদাইয়া ওয়ালিল মুমিনিনা এওমা একুমুল হিসাব।’ অর্থাৎ হে আমাদের প্রতিপালক! কেয়ামত দিবসে আমাকে, আমার মা-বাবা ও সব মুমিনকে ক্ষমা করুন। (সুরা ইবরাহিম ৪১)

কবর জিয়ারত করা পুণ্যের কাজ। এতে নিজেদের মৃত্যুর কথা স্মরণ হয় এবং মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া দরুদ পাঠ করে সওয়াব পৌঁছানো যায়। আর রমজান মাসে মৃত নিকটাত্মীয়দের কবর জিয়ারত করে তাদের জন্য সওয়াব পৌঁছানো আরও অধিক পুণ্যের কাজ।

কবর জিয়ারতের দোয়া সম্পর্কে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুল (সা.) কবর জিয়ারতে গিয়ে এভাবে দোয়া করতেন, ‘আসসালামু আলাইকুম ইয়া আহলাল কুবুর, এগফিরুল্লাহু লানা ওয়া লাকুম, আনতুম সালাফুনা ওয়া নাহনু বিল আসারি।’ অর্থাৎ হে কবরস্থানের বাসিন্দারা, আপনাদের প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক। আমাদের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সবার প্রতি আল্লাহ রহম করুন। আমরাও আপনাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করব। (সহিহ মুসলিম ৯৭৪)

কবর জিয়ারতের নিয়ম হলো, কবরস্থানে যাওয়ার পর সর্বপ্রথম জিয়ারতের দোয়া পড়া। এরপর মৃতের জন্য সওয়াব পৌঁছানোর নিয়তে দরুদ শরিফ, সুরা ফাতিহা, সুরা ইখলাস, আয়াতুল কুরসি প্রভৃতি সুরা ও দোয়া পড়ে সওয়াব পৌঁছানো।

কবর সামনে রেখে দুই হাত তুলে দোয়া করা উচিত নয়। কবরকে পেছনে রেখে কিংবা কবরের দিকে পিঠ দিয়ে কিবলামুখী হয়ে দোয়া করা উচিত। আবার কেউ চাইলে হাত না তুলে মনে মনেও দোয়া করতে পারবে। (বেনায়াহ ৩/২৬২, হিন্দিয়া ৫/৩৫০)

মৃতদের সওয়াব পৌঁছানোর জন্য দান সদকা করলে তাদের কবরে কাক্সিক্ষত সওয়াব পৌঁছে। আর রমজান মাসে মৃত নিকটাত্মীয়দের সওয়াব পৌঁছানোর জন্য দান সদকা করলে তারা আরও অধিক বেশি সওয়াবপ্রাপ্ত হবে। কেননা রমজানে প্রতিটি নেক কাজের বিনিময়ে সত্তর গুণ বেশি সওয়াব দেওয়া হয়।

হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, এক ব্যক্তি রাসুল (সা.)-কে জিজ্ঞেস করলেন, আমার পিতা ইন্তেকাল করেছেন এবং ধন-সম্পদ রেখে গেছেন। কিন্তু অসিয়ত করে যাননি। আমি যদি তার পক্ষ থেকে দান সদকা করি, তবে কি তার গুনাহের কাফফারা হবে? রাসুল (সা.) বললেন, হ্যাঁ। (সহিহ মুসলিম ১৬৩০)

কবর খুব কঠিন জায়গা। কবরে মানুষের কর্মের যথাযথ প্রতিফল দেওয়া হয়। আর পার্থিব জীবনে মানুষের কর্মে ত্রুটিবিচ্যুতি থাকা স্বাভাবিক। কবরে সেসব ত্রুটিবিচ্যুতির হিসাব দেওয়া খুবই দুরূহ। তাই মানুষ সেখানে প্রচণ্ড সহায়হীন অবস্থায় নিপতিত হয়। এ রকম পরিস্থিতিতে মৃতদের জন্য মাগফিরাত কামনা এবং কল্যাণমূলক কাজ করে সওয়াব পৌঁছানো ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না। তাই মৃতদের শান্তি ও মাগফিরাতের জন্য দোয়া ও কল্যাণমূলক কাজ করা নিকটাত্মীয়দের ধর্মীয় দায়িত্ব ও কর্তব্য।

লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশ মুসলিম কাউন্সিল

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত