আল্লাহর সান্নিধ্যের তীব্র আকাঙ্ক্ষা

আপডেট : ১১ মার্চ ২০২৬, ০৮:৩৪ এএম

রমজান ধীরে ধীরে শেষ প্রান্তের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। রহমত ও মাগফিরাতের পর এখন শুরু হয়েছে নাজাতের পর্ব। এই সময়টি মুমিনের জন্য বিশেষ গুরুত্ব ও তাৎপর্যে ভরপুর। কারণ, রমজানের শেষ ১০ দিনে রয়েছে এমন এক মহিমান্বিত রাত, যার মর্যাদা হাজার মাসের চেয়েও অধিক। তাই এ সময়ে ইবাদত, তওবা ও আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের আকাক্সক্ষা আরও তীব্র হয়ে ওঠে। রমজানের শেষ ১০ দিনকে ঘিরে ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ একটি আমল হলো ইতিকাফ। পৃথিবীর নানা ব্যস্ততা, দুশ্চিন্তা ও পার্থিব টানাপড়েন থেকে নিজেকে সরিয়ে রেখে মানুষ যখন মসজিদে অবস্থান নেয়, তখন তার মন আল্লাহর স্মরণে নিবিষ্ট হওয়ার সুযোগ পায়। এই ইবাদতের মধ্য দিয়ে বান্দা যেন নিজেকে নতুন করে গড়ে তোলার এক অনন্য সুযোগ লাভ করে। ইতিকাফের মূল উদ্দেশ্য কেবল মসজিদে অবস্থান করা নয়, বরং অন্তরকে আল্লাহমুখী করা। বিশেষ করে, লাইলাতুল কদরের সন্ধানে ইবাদতে মগ্ন থাকা এর অন্যতম লক্ষ্য। কারণ এই মহিমান্বিত রাতেই নেমে আসে অগণিত রহমত ও বরকত। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, রাসুল (সা.) রমজানের শেষ ১০ দিনে ইতিকাফ করতেন এবং বলতেন তোমরা রমজানের শেষ ১০ দিনে লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান করো। (সহিহ বুখারি ২০২০)

লাইলাতুল কদরে ইবাদত-বন্দেগির মর্যাদা এক হাজার মাসের রাত্রিগুলোতে ইবাদত-বন্দেগির চেয়েও বেশি। এটা মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর উম্মত হিসেবে আমাদের ওপর বিশেষ এক অনুগ্রহ। কেননা এক হাজার মাসে ৮৩ বছর ৪ মাস হয়। আল্লাহতায়ালা এর মাধ্যমে আমাদের সংক্ষিপ্ত আয়ুষ্কালে অধিক সওয়াব ও কল্যাণ অর্জনের সুযোগ দান করেছেন।

সুরা কদর ও বাকারায় বর্ণিত আয়াত এবং হাদিস দ্বারা প্রমাণিত হয় লাইলাতুল কদর রমজান মাসে। কিন্তু এর সঠিক তারিখ সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট কোনো বক্তব্য পাওয়া যায় না। ইসলামি স্কলাররা বিভিন্ন হাদিস পর্যালোচনা করে বলেন, লাইলাতুল কদর রমজান মাসের শেষ দশ দিনের মধ্যে আসে। কিন্তু এরও কোনো তারিখ নির্দিষ্ট নেই। বরং যে কোনো রাতে হতে পারে। আবার প্রত্যেক রমজানে তা পরিবর্তিতও হতে পারে। সহিহ হাদিসের ভাষ্যমতে শেষ ১০ দিনের বেজোড় রাতগুলোতে লাইলাতুল কদর হওয়ার সম্ভাবনা অধিক। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুল (সা.) বলেছেন, রমজান মাসের শেষ ১০ দিনে লাইলাতুল কদর অন্বেষণ করো। (সহিহ বুখারি ২০২১)

অন্য বর্ণনায় এসেছে, রাসুল (সা.) বলেছেন, তোমরা রমজানের শেষ ১০ দিনের বেজোড় রাতগুলোতে লাইলাতুল কদর তালাশ করো। (সহিহ মুসলিম ১১৬৯)

হাদিসের এসব বর্ণনা দ্বারা বুঝা যায়, রমজানের শেষ ১০ দিনের বেজোড় রাতগুলোতে লাইলাতুল কদর হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। তাই রমজান শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত এই সম্ভাবনা থেকেই যায়। ফলে অবহেলা না করে রমজানের বেজোড় রাতগুলোতে কদরের রাতের আশায় ইবাদত-বন্দেগিতে মশগুল থাকা দরকার। কেননা এই রাতের ইবাদত বন্দেগিতে রয়েছে বিশেষ ফজিলত। আল্লাহতায়ালা এই রাতে বান্দাদের ব্যাপকহারে ক্ষমা করেন এবং অসংখ্য কল্যাণ দান করেন।

হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি ইমান ও সওয়াবের আশায় লাইলাতুল কদরের রাতে নামাজ আদায় করতে দাঁড়াবে, তার পূর্ববর্তী সব গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে। (সহিহ মুসলিম ৭৬০)

অন্য হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুল (সা.) বলেছেন, এতে (রমজানে) এমন এক রাত রয়েছে, যা হাজার মাস থেকেও উত্তম। যে ব্যক্তি এ রাতের কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হবে, সে যাবতীয় কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হবে। (মুসনাদে আহমাদ ২২৩০)

কদরের রাত এই কারণেও গুরুত্বপূর্ণ যে, এই রাতে মানুষের পুরো বছরের ভাগ্য নির্ধারণ করা হয়। মানুষের পরবর্তী এক বছরের ভাগ্য, অর্থাৎ তার সামনে যা যা আসবে বা তার জীবনে যা কিছু ঘটবে, সেসব নির্ধারণ করা হয়। তার বেঁচে থাকা কিংবা মৃত্যু, তার ভালো-মন্দ, তার রুটি-রুজি ইত্যাদি বিষয় নির্ধারণ করা হয় এই রাতে। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে বলেন, ‘(কদরের) এই রাতে প্রত্যেক হেকমতপূর্ণ বিষয়ের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।’ (সুরা দোখান ৪)

হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, তুমি কোনো মানুষকে বাজারে হাঁটাচলা করতে দেখবে, অথচ তার নাম মৃতদের তালিকায়। তারপর তিনি এ আয়াত তেলাওয়াত করে বলেন, প্রতিবছরই এ বিষয়গুলো নির্ধারিত হয়ে যায়। (মুসতাদরাকে হাকিম ২/৪৪৮)

আমাদের থেকে লাইলাতুল কদরের সুনির্দিষ্ট তারিখ গোপন রাখা হয়েছে। তবে হাদিসে কিছু নিদর্শন বলে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বিরাট হেকমত ও রহস্য। এর দ্বারা মহান আল্লাহর উদ্দেশ্য হলো, এই মহামূল্যবান রাতের অনুসন্ধানে বান্দারা সাধনা করুক। এক রাতের জন্য একাধিক রাত জাগ্রত থাকুক। তাই আমাদের জন্য করণীয় হলো, রমজানের শেষ দশদিন মহান আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন থাকা। বিশেষ করে বেজোড় রাতগুলোতে। তবেই আমরা মহিমান্বিত সেই রাতে ইবাদতের সুযোগ লাভ করতে পারব।

লেখক : শিক্ষক ও ইসলামবিষয়ক গবেষক

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত