ঈদের আগেই ঈদ আনন্দ

আপডেট : ১১ মার্চ ২০২৬, ০৭:২৫ এএম

নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের ২০ দিন পর অতিদরিদ্র নারীদের হাতে ফ্যামিলি কার্ড তুলে দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, ‘কোনো পরিস্থিতিতেই জনগণকে দেওয়া শ্রতিশ্রুতি থেকে সরকার সরে আসবে না। ইরান যুদ্ধের জেরে অঙ্গীকার বাস্তবায়নে কোনো ক্ষেত্রে শুধু কিছুটা সময়ের প্রয়োজন হতে পারে। এজন্য সবাইকে ধৈর্য ধরতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আগামী মাস থেকে কৃষকদের মধ্যে কৃষক কার্ড বিতরণ শুরু হবে।’ গতকাল মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর বনানীতে কড়াইল বস্তিসংলগ্ন টিঅ্যান্ডটি মাঠে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির উদ্বোধন করে তিনি এ কথা জানান।

সকাল ১০টা ৩০ মিনিটে মহাখালী টিঅ্যান্ডটি মাঠে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আসেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এরপর মঞ্চে না উঠে তিনি সরাসরি প্যান্ডেলের পূর্বদিকে দর্শনার্থীদের দিকে যান। সেখানে তাদের সঙ্গে কুশলবিনিময় করেন। এ সময় এক নারী প্রধানমন্ত্রীকে বলেন, তিনি কার্ড পাননি। মোবাইলে মেসেজ আসেনি। তখন প্রধানমন্ত্রী তাকে বলেন, ধৈর্য ধারণ করুন। পর্যায়ক্রমে সবাই পাবেন। পরে তিনি নির্ধারিত মঞ্চে যান। এরপর ধর্মগ্রন্থ থেকে পাঠের মাধ্যমে শুরু হয় আনুষ্ঠানিকতা। রাজধানী ঢাকার কড়াইল, সাততলা বস্তি ও ভাষানটেক বস্তি এলাকার ১৫ হাজার নারী ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ল্যাপটপে একটি উদ্বোধনী বোতাম চেপে ৩৭ হাজার ৫৬৭ জনের কাছে ফ্যামিলি কার্ডের টাকা পৌঁছে দেন। সঙ্গে সঙ্গে ফ্যামিলি কার্ডধারী সবার অ্যাকাউন্টে আড়াই হাজার টাকা করে পৌঁছে যায়।

এদিকে মোবাইল ফোনে অর্থ জমা হওয়ার সরকারি বার্তা পৌঁছানোর পর অনুষ্ঠানস্থলে এক আনন্দঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। আসন্ন ঈদের আগে সরাসরি রাষ্ট্রীয় এই আর্থিক সহায়তা পেয়ে অনেক অসহায় মানুষের চোখে পানি চলে আসে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আসা সাধারণ মানুষ এই সহায়তার টাকা নিয়ে তাদের ব্যক্তিগত পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। কেউ এই অর্থ দিয়ে জরুরি ওষুধের ব্যয় মেটানোর স্বপ্ন দেখছেন, আবার কেউ সামান্য কিছু সঞ্চয় করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।

কার্ড পাওয়ার পর অনুভূতি প্রকাশ করতে ডাকা হয় রিনা বেগমকে। এ সময় তিনি বলেন, ‘তার তিন ছেলে-মেয়ে। বড় মেয়ে নবম শ্রেণিতে পড়ে । মেজো ছেলে ষষ্ঠ শ্রেণিতে এবং ছোট মেয়ে পড়ে পঞ্চম শ্রেণিতে। প্রধানমন্ত্রীর প্রতি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে রিনা বেগম বলেন, ‘আমরা জীবনে কল্পনা করিনি এই কার্ডটি পাব, কার্ডটি আমার কাছে স্বপ্নের মতো, কার্ডটি পেয়ে আমি অনেক খুশি। আমার অনেক উপকার হবে। এই টাকায় আমি ছেলেমেয়েদের খাতা-কলম, পরিবারের বাজার যেমন চাল, ডাল ও তরকারি কিনতে পারব।’

অনুভূতি প্রকাশে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বেগম রাশিদা ডাক্তার বলেন, ‘আমি ভাষানটেক বস্তি থেকে এসেছি। ভাষানটেক বস্তিবাসীকে কার্ড দেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী আপনাকে ধন্যবাদ। আপনি বাটনে চাপ দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমার অ্যাকাউন্টে টাকা চলে এসেছে। টাকা পেয়েছি। এতে আমার খুব উপকার হবে। স্বামীর একার আয়ে আমরা চলতে পারি না। এই টাকা দিয়ে আমি কিছুটা হলেও প্রতি মাসে স্বামীর পাশে দাঁড়াতে পারব। প্রধানমন্ত্রী আল্লাহ আপনাকে সুস্থতা দান করুন। আপনার মঙ্গল কামনা করি, আপনার পরিবারের মঙ্গল কামনা করি।’

কার্ড বিতরণ শেষে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের ওপর জোর দিয়ে বলেন, ‘দেশের অর্ধেক জনসংখ্যা নারী। তাদের পেছনে ফেলে বা অর্থনৈতিকভাবে ক্ষমতায়ন না করে দেশকে কোনোভাবেই সামনে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়।’

সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সরকারের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘খালেদা জিয়া যখন দেশ পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন, তখন তিনি স্কুল থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত নারীদের শিক্ষা বিনামূল্যে করার ব্যবস্থা করেছিলেন। সেই শিক্ষিত নারী সমাজকে আজ আমরা অর্থনৈতিকভাবে ক্ষমতায়ন করতে চাই। তাদের সচ্ছল করে তুলতে সরকার ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি চালু করেছে।’

তারেক রহমান বলেন, ‘নির্বাচনের মাধ্যমে বর্তমানে একটি জবাবদিহিমূলক ও জনপ্রতিনিধিমূলক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সরকার গঠনের এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ফ্যামিলি কার্ডের কাজ শুরু হয়েছে।’

কৃষকদের দেওয়া প্রতিশ্রুতির কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘গত সপ্তাহে আমরা সরকারের পক্ষ থেকে কৃষকদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফ করে দিয়েছি। একইভাবে আগামী মাসের ভেতরে আমরা কৃষক ভাইদের কাছেও কৃষক কার্ড তুলে দেব।’

ফ্যামিলি কার্ড চালুকে ‘ঐতিহাসিক ও আবেগঘন’ উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ‘বহু বছর ধরে আমরা বসে বসে এই পরিকল্পনা করেছি। আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের রহমতে আজ সেই দিনটি উপস্থিত, যেদিন আমরা এই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছি। এজন্যই আজকের দিনটি আমার জন্য আবেগঘন।’

মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতাসহ সমসাময়িক বৈশ্বিক পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দেশের মানুষের প্রত্যাশা বর্তমান সরকারের কাছে অনেক, সেটি আমরা বুঝতে পারি। আমরা যে প্রতিশ্রুতিগুলো দিয়েছিলাম, তা থেকে বিন্দুমাত্র অবস্থান পরিবর্তন করব না। তবে বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে ক্ষেত্রবিশেষে কিছু প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে হয়তো সময় বেশি লাগতে পারে। তাই সবাইকে ধৈর্যের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলার অনুরোধ করছি।’

অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী ডা. জোবাইদা রহমান, সমাজকল্যাণমন্ত্রী ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মির্জা আব্বাস, সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীনসহ মন্ত্রিপরিষদের সদস্য ও রাজনৈতিক নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

এ ছাড়া অনুষ্ঠানে বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের মধ্যে বাংলাদেশে নিযুক্ত স্পেনের রাষ্ট্রদূত গ্যাব্রিয়েল সিস্টিয়াগা ওচোয়া দে চিনচেত্র, যুক্তরাষ্ট্রের ডেপুটি রাষ্ট্রদূত মেগান বোল্ডিন, পাকিস্তানের হাইকমিশনার ইমরান হায়দার, মালদ্বীপের হাইকমিশনার শিউনিন রশিদ, ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় কুমার ভার্মা, অস্ট্রেলিয়ার হাইকমিশনের ফার্স্ট সেক্রেটারি সৈয়দ হায়দার, চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন, সিঙ্গাপুরের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার মিচেল লি, আলজেরিয়ার রাষ্ট্রদূত আব্দেলওয়াহাব সাইদানি এবং ইউএন উইমেনের কান্ট্রি রি-প্রেজেনটেটিভ গীতাঞ্জলি সিং উপস্থিত ছিলেন।

কর্মসূচি শেষে দুপুর ১২টার পর প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করেন। পাইলট প্রকল্পের অংশ হিসেবে সারা দেশের ১৪টি স্থানে একযোগে এই কার্ড বিতরণ শুরু হয়। ঠাকুরগাঁওয়ে এই কর্মসূচির উদ্বোধন করেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী ও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এ ছাড়া রাজধানী ঢাকার মিরপুরে, রাজবাড়ীর পাংশায়, চট্টগ্রামের পতেঙ্গা, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুরে, বান্দরবানের লামায়, খুলনার খালিশপুরে, ভোলার চরফ্যাশন, সুনামগঞ্জের দিরাই, কিশোরগঞ্জের ভৈরব, বগুড়ার বগুড়া সদর, নাটোরের লালপুরে ও দিনাজপুরের নবাবগঞ্জে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ করা হয়।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত