অক্তাবিও পাস (১৯১৪-১৯৯৮) মেহিকোর কবি ও কূটনীতিক। লাতিন আমেরিকা তথা সারা পৃথিবীর অন্যতম মহত্তম কবি তিনি। তার কবিতায় রয়েছে বিশ্বঐতিহ্যের বহুতল উপাদান। তিনি তার কবিতায় সমন্বিত করেছেন মেহিকান ঐতিহ্যের সঙ্গে উপমহাদেশীয় সংস্কৃতি, শিল্পদর্শন এবং আন্তর্জাতিক আভাঁ-গার্দ। ১৯৩১ সালে ১৭ বছর বয়সে একদল তরুণ কবির সঙ্গে তিনি একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন এবং ওই পত্রিকায় তাদের কবিতা প্রকাশিত হতে থাকে । এর দুবছর পর তার প্রথম কবিতার বই ঝধাধমব গড়ড়হ প্রকাশিত হয়। ১৯৩৭ সালে তিনি ফ্যাসিবাদবিরোধী লেখকগোষ্ঠীর দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক কংগ্রেসে যোগ দেন, যা স্পেনে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেই সম্মেলনে তিনি বেশ কিছু বিখ্যাত কবির দেখা পেয়েছিলেন। স্পেনের কবি মাকাদো, আলবার্তি এবং অলতোলাগিরে ছাড়াও লাতিন আমেরিকা থেকে নেরুদা, হাইড্রোবো এবং ভায়েহো এসেছিলেন। এ ছাড়াও সেই সম্মেলনে অডেন, স্পেন্ডার এবং ত্রিস্তান জারাও উপস্থিত ছিলেন। সে সময় তিনি স্পেনে কয়েক মাস কাটিয়েছিলেন প্রজাতন্ত্রের পক্ষে কাজ করে। ১৯৩৮ সালে স্পেন থেকে ফিরে তিনি শ্রমিকদের পত্রিকা ঊও চড়ঢ়ঁষধৎ-এ রাজনৈতিক কলাম লিখতে শুরু করেন। একই সঙ্গে তিনি স্প্যানিশ কবিতার একটি সংকলন সম্পাদনা এবং ঞধষষবৎ নামে একটি কবিতা পত্রিকাও প্রকাশ করেন। এই পত্রিকা ছিল মেহিকোর নতুন কবিদের অন্যতম মুখপত্র। তার ব্যাপক রাজনৈতিক কর্মকা-ের সমাপ্তি ঘটে যখন ১৯৩৯ সালের ২৩ আগস্ট স্টালিন ও হিটলারের মধ্যে একটি চুক্তি সম্পাদিত হয়। চুক্তির মূল বিষয় ছিল জার্মানি ও সোভিয়েত ইউনিয়ন কেউ কাউকে আক্রমণ করবে না। এই চুক্তি Molotov Ribbentrop Pact নামে ইতিহাসে পরিচিত। এই চুক্তির কিছু সিক্রেট প্রটোকল ছিল। চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে জার্মানি ১৯৩৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর পোলান্ড আক্রমণ করলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয় এবং সেই চুক্তি বাতিল হয়ে যায়। এ সময় রাজনীতি থেকে সরে এসে পাস ব্যাপকভাবেই ঝুঁকে পড়েন কবিতার দিকে। ১৯৪১ সালে যৌথভাবে সম্পাদনা করেন স্প্যানিশ ভাষায় লিখিত কবিদের একটি উল্লেখযোগ্য সংকলন Laurel. যুদ্ধ যখন ভয়ানক পরিস্থিতিতে মোড় নিল, শরণার্থীদের ভিড়ে মেহিকো সিটি কসমোপলিটন সিটিতে রূপান্তরিত হলো। নির্বাসিত কবি ভিক্টর সার্জ এবং বেঞ্জামিন পিরেত-এর সঙ্গে বন্ধুত্বের ফলে ফরাসি কবিতায় ডুবে থাকলেন পাস। ১৯৪৩ সালে আন্তর্জাতিক মানের সাহিত্য সমালোচনামূলক পত্রিকা ঞযব চৎড়ফরমধষ ঝড়হ প্রকাশে তার প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ছিল। এ সময় কবি খুবই বাজে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছিলেন। তার এসব কাজের মধ্যে অন্যতম ছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংকে পুরনো নোটগুলো পুড়িয়ে ফেলার আগে সেগুলো গুনে দেখা। ১৯৪৪ সালে গুগেনহাইম ফেলোশিপ নিয়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে যান এবং নিউ ইয়র্ক ও সানফ্রান্সিস্কোতে বসবাস শুরু করেন। এবার তিনি উত্তর আমেরিকার কবিতার সঙ্গে পরিচিত হন এবং এ সময়ে মেহিকো এবং এর নানাবিধ অনুন্নয়ন নিয়ে গবেষণা করেন। পরবর্তী সময় তার এই কাজ The Labyrinth of Solitude গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত হয়। এটিই তার প্রথম গদ্যগ্রন্থ, যা প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৫০ সালে। ১৯৪৫ সালে তিনি প্যারিসে যান এবং সেখানে তিনি আঁদ্রে ব্রেতোঁর সঙ্গে নানাবিধ পরাবাস্তব কর্মকা- প্রদর্শনী এবং প্রকাশনায় অংশগ্রহণ করেন। পরের বছর তিনি মেহিকোর ফরেন সার্ভিসে যোগ দেন এবং পরবর্তী ২২ বছর তাকে প্যারিস, নিউ ইয়র্ক, সানফ্রান্সিস্কো, জেনেভা এবং দিল্লিতে কাটাতে হয়েছিল। ১৯৪৯ সালে Freedom on Parole, ১৯৫১ সালে তার অন্যতম উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ স্প্যানিশ গদ্য কবিতার সংকলন Eagle Or Sun এবং ১৯৫৭ সালে কাব্যতত্ত্ব নিয়ে রচিত গ্রন্থ The Bow and the Lyre প্রকাশিত হয়। ১৯৫৭ সালে পত্রিকার সম্পাদক এবং সমালোচকদের সুবিধার্থে Earlier পোয়েট্রির সার্থক পরিসমাপ্তি এবং Later পোয়েট্রির সময় শুরু হয় তার বিখ্যাত কবিতা Sunstone প্রকাশের মধ্য দিয়ে। একজন কবি শুধু Sunstone-এর মতো একটি কবিতা লিখেই বেঁচে থাকতে পারেন। এই দীর্ঘ কবিতায় দেখা যায় জীবন ও জগতের শুদ্ধ অ্যানাটমি উত্তীর্ণ শিল্পচেতনার দূরগামী আলোক-বিচ্ছুরণ। কয়েক বছরের মধ্যে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের কবিরা পাসের কবিতা নিজ নিজ ভাষায় অনুবাদ করেন এবং পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ট কবি হিসেবে বিশ্বকবিতার আসনে তার স্থান পাকাপোক্ত হয়ে যায়। এ সময়ে তিনিও প্রচুর অনুবাদ করেছেন। ডব্লিউ সি উইলিয়ামস, এপোলিন্যার, পেসোয়া এবং বেশকিছু সুইডিশ কবিসহ ফরাসি, ইংরেজি, চাইনিজ এবং জাপানি ভাষার অনেক কবির কবিতা অনুবাদ করেন।
১৯৬২ সালে তিনি ইন্ডিয়ায় মেহিকোর রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ পান। ভারতে আসার পর তিনি ইন্ডিয়ান আর্ট এবং দর্শন নিয়ে গভীর অধ্যয়ন শুরু করেন। এই দশকে তার আটটি কাব্যগ্রন্থ এবং শিল্প-সাহিত্য-দর্শন-রাজনীতি নিয়ে লেখা ছয়টি প্রবন্ধগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। সে সময়ে তিনি সমসাময়িক মেহিকোর কাব্য সংকলন Poetry in Motion-এর কো-এডিটর হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৬ সালে অলিম্পিক গেমসের অব্যবহিত পরে মেহিকান সরকার ধর্মঘটী ছাত্রদের ওপর নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালালে প্রতিবাদে তিনি রাষ্ট্রদূতের পদ থেকে ইস্তফা দেন। পরবর্তী কয়েক বছর তিনি ক্যামব্রিজ, হার্ভার্ড এবং টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। ১৯৭১ সালে তিনি মেহিকোতে ফিরে আসেন এবং মাসিক সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক পত্রিকা Plural এবং পরে বিখ্যাত মাসিক Return প্রকাশ করেন। এই পত্রিকাটি লাতিন আমেরিকার উঁচুমানের বুদ্ধিবৃত্তিক পত্রিকা হিসেবে অল্প দিনেই ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে।
সত্তরের দশকে দুটো ম্যাগাজিন ছাড়াও তার দুটি কাব্যগ্রন্থ এবং সাতটি প্রবন্ধগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। তিনি সারা জীবনই বলতে গেলে ভিজুয়্যাল আর্টসের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ১৯৭০ সালে পাশ্চাত্যে তিনি তান্ত্রিক আর্টের প্রথম প্রদর্শনী করেছিলেন এবং রুফিনো তামাইও, রবার্ট মাদারওয়েল, পিয়েরে অ্যালোচিনোস্কি, আজা ইয়ংকার্স, ব্রায়ান নিসেন, রবার্ট রোসেনবার্গ এবং বিখ্যাত ফটোগ্রাফার ম্যানুয়েল আলভারেজ ব্রাভোসহ অনেক শিল্পীর নানা প্রদর্শনী ও প্রকল্পে তিনি সহযোগিতা দিয়েছিলেন সে সময়। আশির দশকে পাস ছিলেন সবচেয়ে ব্যস্ততম মানুষ। তখনো তিনি Vuelta পত্রিকা সম্পাদনা ছাড়েননি এবং তাকে নিয়মিতভাবে দেখা গেছে টেলিভিশনে। ১৯৮৭ সালে তার ১১ বছরের কবিতা সংকলন অ ঞৎবব ডরঃযরহ প্রকাশিত হয়। পাস কবিতা সম্পর্কে বলেন Poetry sings of what is happening, it’s function is to give form to everyday life and make it visible.
ঐতিহ্যবাহী সংগীত ও কবিতার প্রতি তার বিশেষ দুর্বলতা ছিল। তিনি মনে করতেন, আগামী দিনের কবিতা মানুষের আত্মা আবিষ্কারে ব্রতী হবে। তার কাব্যগ্রন্থ East Slope, Toward the Beginning, Blanco এবং To Poems -এর প্রায় সব কবিতা-ই ইন্ডিয়া, শ্রীলঙ্কা এবং আফগানিস্তানে রচিত। ১৯৬২ থেকে ৬৮ পর্যন্ত ইন্ডিয়াতে থাকাকালীন তিনি ইন্ডিয়ান আর্ট, দর্শন ও ইতিহাস-ঐতিহ্য নিয়ে গভীর অধ্যয়ন করেন এবং ভারতের বিভিন্ন স্থান ঘুরে ঘুরে দেখেন। ‘গ্লিম্পসেস অব ইন্ডিয়া’ গ্রন্থে সেসব ঘনিষ্ঠতার পরিচয় পাওয়া যায়। পিপল, নিম, অশ্বত্থ ইত্যাদি হিন্দুদের পবিত্র বৃক্ষ। এসব বৃক্ষের কথা তার কবিতায় পাওয়া যায়। বিখ্যাত কবি ও সংগীতজ্ঞ আমির খসরুকে নিয়েও তিনি কবিতা লিখেছেন (The Tomb of Amir Khasru)। চতুর্দশ শতকের বিখ্যাত সুফী সাধক নিজামুদ্দিনের নাম পাওয়া যায় তাঁর কবিতায়। হুমায়ুনের সমাধি, বৃন্দাবন, লোদী গার্ডেন, জলের চাবি ইত্যাদি কবিতায় তার ভারত প্রীতির পরিচয় মেলে। কৃষ্ণ, কালী, মীনাক্ষী ইত্যাদি দেব-দেবীর নাম যেমন এসেছে তার কবিতায়, তেমনি এসেছে ঐতিহাসিক চরিত্র ও নদীর নাম (টিপু সুলতান, বাবর, গঙ্গা, যমুনা, মহীশূর, উদয়পুর)। হিমাচল প্রদেশ নামেও তার একটি কবিতা আছে। দীর্ঘ সময় ভারতে অবস্থানের কারণে তিনি ভারতের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য অনুধাবনের অবাধ সুযোগ পেয়েছিলেন, যা তার সৃজনসত্তায় একটি স্থায়ী দাগ ফেলেছিল। তিনি মিস্টিসিজম এবং বুদ্ধিজম দ্বারা এমনভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন যে তার নানা কবিতায় সেসব বিষয়ের সংগুপ্ত সৌন্দর্য খুব সহজেই লক্ষ করা যায়।
১৯৯০ সালে কবিতার জন্য নোবেল পুরস্কার পান। আজীবন স্প্যানিশ ভাষায় কাব্যচর্চা করেছেন। তার লেখা ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন স্যামুয়েল বেকেট, চার্লস টমলিনসন, এলিজাবেথ বিশপের মতো বিশিষ্ট লেখকরা। এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন পাস। তার সাহিত্যে মেহিকোর সমাজ ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রতিফলন ঘটেছে সুচারুভাবে। তিনি তার অনেক কবিতায় মানব অস্তিত্ব ও দর্শনের মিশ্রণ ঘটিয়েছেন অপরিসীম শিল্প দক্ষতায়।
