হরমুজ ঘিরে উত্তেজনা

আপডেট : ১২ মার্চ ২০২৬, ০৭:৪৮ এএম

যুদ্ধরত যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল ও ইরানের মধ্যে বিশ্ব তেল পরিবহনে গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। ইরান সেখানে বিস্ফোরক মাইন পেতে রাখছে এবং একের পর এক জাহাজে আঘাত হানছে এমন ঘটনা ঘটতে থাকায় এ উত্তেজনা দেখা দেয়।

মাইন স্থাপন করলে ইরানকে সামরিকভাবে নজিরবিহীন পরিণাম ভোগ করতে হবে বলে হুমকি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে গত মঙ্গলবার দেওয়া পোস্টে তিনি এ হুমকি দেন।

ট্রাম্প বলেন, তিনি এখন পর্যন্ত এমন কোনো খবর পাননি যে ইরান সত্যিই হরমুজ প্রণালিতে মাইন বসিয়েছে। তবে তিনি মনে করেন, তেহরান যদি সত্যিই সেখানে ভাসমান বিস্ফোরক মাইন বসিয়ে থাকে, তাহলে সেগুলো ‘অবিলম্বে’ সরিয়ে ফেলতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের দাবি হরমুজ প্রণালিতে মাইন বসানোর কাজে ব্যবহৃত ১৬টি ইরানি নৌযান ধ্বংস করেছে তারা।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) জানিয়েছে, কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে গতকাল বুধবার পৃথক তিনটি জাহাজে প্রজেক্টাইল আঘাত হেনেছে। ওমানের প্রায় ১১ নটিক্যাল মাইল উত্তরে থাইল্যান্ডের পতাকাবাহী ‘ময়ুরি নারি’ নামের একটি বাল্ক ক্যারিয়ার হামলার শিকার ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। থাইল্যান্ডের ‘প্রেশাস শিপিং’-এর মালিকানাধীন জাহাজটি ভারতের গুজরাট অভিমুখে যাত্রা করেছিল। হামলায় জাহাজটিতে আগুন ধরে গেলে ২০ নাবিককে সরিয়ে নেওয়া হয়। তবে প্রয়োজনীয় কিছু কর্মী এখনো জাহাজটিতে অবস্থান করছেন।

এর আগে সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাস আল খাইমাহ থেকে ২৫ নটিক্যাল মাইল উত্তর-পশ্চিমে জাপানের পতাকাবাহী কনটেইনার জাহাজ ‘ওয়ান মেজেস্টি’ অজ্ঞাত বস্তুর আঘাতে সামান্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জাহাজের কর্মীরা নিরাপদ আছেন এবং জাহাজটি নিরাপদ নোঙরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

দুবাইয়ের প্রায় ৫০ মাইল উত্তর-পশ্চিমে তৃতীয় একটি বাল্ক ক্যারিয়ারও হামলার শিকার হয়েছে। ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাবিষয়ক সংস্থা ভ্যানগার্ড জানায়, মার্শাল আইল্যান্ডসের পতাকাবাহী ‘স্টার গুইনেথ’ নামের ওই জাহাজটির কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ইউকেএমটিও জানায়, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলা শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত আরব সাগর, হরমুজ প্রণালি ও ওমান উপসাগরে জাহাজ চলাচল-সংক্রান্ত ১৭টি ঘটনার তথ্য রেকর্ড করা হয়েছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুুদ্ধ গতকাল বুধবার ১২তম দিনে গড়িয়েছে; ছড়িয়েছে ১১টি দেশে।

আর্থিক প্রতিষ্ঠানে হামলার হুমকি ইরানের : মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে হামলার নতুন লক্ষ্যবস্তু করার হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। গতকাল ইরানের যৌথ সামরিক কমান্ড খাতাম আল-আম্বিয়ার মুখপাত্র ইব্রাহিম জোলফাকারির বরাতে বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ তথ্য জানিয়েছে। তেহরানে ইরানের অন্যতম বড় রাষ্ট্রায়ত্ত ‘ব্যাংক সেপাহ’র একটি প্রশাসনিক ভবনে গত মঙ্গলবার রাতে বিমান হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। হামলায় ব্যাংকের কয়েকজন কর্মী নিহত হন। ব্যাংক সেপাহর সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে ইরানের সামরিক বাহিনীর সম্পর্ক রয়েছে।

জোলফাকারি বলেন, ‘ব্যর্থ অভিযানের পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বাহিনী আমাদের ব্যাংকে হামলা চালিয়েছে। এই অবৈধ ও নজিরবিহীন হামলার মাধ্যমে শত্রুপক্ষ আমাদের বাধ্য করছে এ অঞ্চলে তাদের সংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক কেন্দ্র ও ব্যাংকগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করতে।’

নিরাপত্তার স্বার্থে সেসব ব্যাংক ভবন থেকে অন্তত এক হাজার মিটার দূরে থাকতে সাধারণ মানুষকে সতর্ক করেছেন জোলফাকারি।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, নতুন এই হুমকির ফলে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই শহর সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়েছে। দুবাইয়ে বহু আন্তর্জাতিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আঞ্চলিক কার্যালয় রয়েছে। এ ছাড়া সৌদি আরব ও বাহরাইনও সম্ভাব্য ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বলে জানায় রয়টার্স।

ইরানের মধ্যাঞ্চলীয় শহর ইসফাহানে বিমান হামলায় রুশ কনস্যুলেট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে মস্কো। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানে প্রায় ২০ হাজার বেসামরিক ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি। ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলোর মধ্যে হাসপাতাল, স্কুল এবং মানবিক সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনার বিভিন্ন কেন্দ্রও রয়েছে। রেড ক্রিসেন্ট জানিয়েছে, হামলায় ৭৭টি চিকিৎসাকেন্দ্র এবং ৬৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ইরানে গত মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের তীব্র হামলার জবাবে পাল্টা হামলা অব্যাহত রেখেছে তেহরানও। কুয়েত ও বাহরাইনে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিতে গতকাল হামলা চালিয়েছে তেহরান। ইসরায়েলের হাইফা, তেল আবিব ও জেরুজালেমে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা হয়েছে।

ইসরায়েলে সর্বশেষ দফার হামলায় হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র ছাড়াও তিন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্রসহ ছুড়েছে ইরান। সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটি লক্ষ্য করে ছোড়া ছয়টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করার কথা বলেছে রিয়াদ। দুবাই বিমানবন্দরে ইরানের ড্রোন হামলায় বাংলাদেশিসহ চারজন আহত হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ১৫০ সেনা আহত : ইরানের ওপর আগ্রাসনের জবাবে দেশটি মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্যবস্তুতে ডোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে। নিউ ইয়র্ক টাইমস অন্তত ১৭টি ক্ষতিগ্রস্ত মার্কিন সামরিক অবকাঠামো শনাক্ত করেছে।

চলমান এই সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ১৫০ জন সেনা আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে দেশটির প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন। তাদের মধ্যে আটজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। পেন্টাগনের মুখপাত্র শন পার্নেল বলেন, আহত অধিকাংশ সেনার আঘাত তুলনামূলক সামান্য। এই যুদ্ধে ইতিমধ্যে আট সেনা নিহত হয়েছেন। এর আগে কখনো আহত সেনার সংখ্যা প্রকাশ করেনি ওয়াশিংটন।

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্মকর্তারা বলছেন, এই পাল্টা হামলার তীব্রতা দেখিয়ে দিয়েছে, যুদ্ধের জন্য ইরান ট্রাম্প প্রশাসনের অনেকের ধারণার চেয়ে বেশি প্রস্তুত ছিল।

 

মোজতবা খামেনি নিরাপদে আছেন : ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত হওয়ার পর মোজতবা খামেনি এখনো প্রকাশ্যে না আসায় তাকে নিয়ে জল্পনা শুরু হয়েছে।

ইরানি কর্মকর্তারা বলেন, সরকারের জ্যেষ্ঠ ব্যক্তিদের কাছ থেকে তারা শুনেছেন, মোজতবা আহত হয়েছেন। তার পায়ে আঘাত লেগেছে।

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সমন্বিত হামলার শুরুর দিকে নিজ কার্যালয়ে নিহত হন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি।

যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম সিএনএন দেশটির সরকারি সূত্রের বরাতে জানায়, হামলায় মোজতবার এক পায়ের হাড় ফেটে গেছে (ফ্র্যাকচার) এবং তিনি মুখমণ্ডলেও আঘাত পেয়েছেন।

গতকাল ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের ছেলে ও উপদেষ্টা ইয়োসেফ পেজেশকিয়ানের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, ‘সুস্থ ও নিরাপদ’ আছেন মোজতবা খামেনি। ইরানের কর্মকর্তারা বলেন, মোজতবা সচেতন অবস্থায় আছেন। সীমিত যোগাযোগ ব্যবস্থাসহ অত্যন্ত নিরাপদ একটি স্থানে আশ্রয় নিয়েছেন।

 

পুতিনের ফোন : রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে গত মঙ্গলবার ফোনে কথা বলেছেন। ক্রেমলিন জানায়, যত দ্রুত সম্ভব সংঘাত নিরসন ও রাজনৈতিক উপায়ে সমস্যা সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন পুতিন। এর আগে তিনি সোমবার ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। এ সময় তারা ইরান যুদ্ধ ও ইউক্রেনে শান্তির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন।

ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকভ বলেন, ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবস্থানবিষয়ক গোয়েন্দা তথ্য দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছে মস্কো। এর আগে ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানকে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধজাহাজ এবং সামরিক অবস্থানের বিষয়ে তথ্য দিচ্ছে রাশিয়া।

 

দক্ষিণ কোরিয়ার উদ্বেগ : ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে ব্যবহারের জন্য দক্ষিণ কোরিয়া থেকে তাদের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থাড সরিয়ে নিতে শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, থাড ছাড়াও আরও কিছু সামরিক সরঞ্জাম মধ্যপ্রাচ্যে পাঠাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। এমনকি প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের কয়েকটি ব্যাটারি সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে পাঠানোর বিষয়েও আলোচনা চলছে। ওয়াশিংটনের এই সিদ্ধান্তে দক্ষিণ কোরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন ও গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে পূর্ব এশিয়া থেকে ওয়াশিংটনের অঙ্গীকার কমে যাওয়ার এই ইঙ্গিতÑ উত্তর কোরিয়া বা তাইওয়ান ইস্যুতে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত