সারাদেশের কারাগারগুলোতে বন্দি মায়েদের সঙ্গে কতজন শিশু অবস্থান করছে, তাদের বয়সসহ বিস্তারিত তালিকা চেয়েছেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে কারাগারে থাকা শিশুদের নিরাপত্তা, কল্যাণ এবং জীবনমান নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন আদালত। সোমবার (১৫ জুন) বিচারপতি খিজির আহমেদ চৌধুরী ও বিচারপতি মো. জিয়াউল হকের হাইকোর্ট বেঞ্চ এই আদেশ দেন। আগামী দুই মাসের মধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এই প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে।
আদালতে রিট আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী কামরুন নাহার মাহমুদ দীপা। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. ফারুক হোসেন। এর আগে ‘কারাগারে বিপন্ন শৈশব’ শিরোনামে দৈনিক দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন যুক্ত করে গত ৯ মে জনস্বার্থে এই রিট আবেদনটি করা হয়। আদালতের আদেশে স্বরাষ্ট্র সচিব, আইন সচিব, সমাজকল্যাণ সচিব এবং কারা মহাপরিদর্শককে (আইজি প্রিজন্স) রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।
কারা অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, গত ২৬ এপ্রিল ২০২৬ পর্যন্ত দেশের ৭৪টি কেন্দ্রীয় ও জেলা কারাগারে মায়েদের সঙ্গে ২৯৯টি শিশু বন্দি জীবন কাটাচ্ছে। এর মধ্যে ছেলেশিশু ১৪৬ জন এবং কন্যাশিশু ১৫৩ জন। এসব শিশুদের মায়েদের বেশিরভাগই মাদক মামলার আসামি। বিভাগভিত্তিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ঢাকা বিভাগে ১০০ জন, চট্টগ্রামে ৯০ জন, রাজশাহী ও রংপুরে ২৫ জন করে, খুলনায় ২০ জন, সিলেটে ১৯ জন, ময়মনসিংহে ১৩ জন এবং বরিশাল বিভাগে ৪ জন শিশু রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৫১ জন শিশু রয়েছে গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগারে।
বাংলাদেশ জেল কোডের ৯৫৭ বিধি অনুযায়ী, নারী হাজতি ও কয়েদিরা তাদের সন্তানদের সর্বোচ্চ চার বছর বয়স পর্যন্ত কাছে রাখতে পারেন। তবে কারা কর্তৃপক্ষের বিশেষ অনুমতি সাপেক্ষে ছয় বছর বয়স পর্যন্ত সন্তানদের কারাগারের ভেতরে রাখার সুযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, শিশুর বয়স ছয় বছর পার হলে বা মা কারাগার থেকে মুক্তি পেলে শিশুটির স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। আর যেসব শিশুর অভিভাবক নেই, তাদের সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে সরকারি শিশুনিবাসে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, কারাগারের ভেতরে থাকা শিশুরা সাধারণত একটি কঠোর পরিবেশে বেড়ে ওঠে। বিশেষ করে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগারের মতো জায়গায় শিশুদের হত্যা ও মাদক মামলার আসামিদের সঙ্গে একই সেলে থাকতে হয়। শিশুদের জন্য এই পরিবেশ অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং তাদের স্বাভাবিক বিকাশের জন্য বড় বাধা। হাইকোর্টের এই আদেশের ফলে কারাগারের ভেতরে থাকা শিশুদের সুরক্ষা ও জীবনমান উন্নয়নে রাষ্ট্র নতুন করে কোনো কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করবে কি না, এখন সেটাই দেখার বিষয়।