‘বিশ্বের সবচেয়ে অবমূল্যায়িত ফুটবলার’ ফেদেরিক ভালভার্দের হ্যাটট্রিকে ম্যানচেস্টার সিটিকে চ্যাম্পিয়নস লিগ শেষ ১৬-র প্রথম লেগে ৩-০ গোলে হারিয়েছে রিয়াল মাদ্রিদ। সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে ২০ থেকে ৪২ মিনিটের মধ্যে হ্যাটট্রিক করেন উরুগুইয়ান মিডফিল্ডার। চোটের কারণে রিয়ালের খেলোয়াড়ের তালিকায় কিলিয়ান এমবাপ্পের নাম না দেখে সিটির সমর্থকরা নিশ্চয়ই খুশিই হয়েছিলেন। কিন্তু কে জানত, ভালভার্দে এ ম্যাচেই জীবনের অন্যতম সেরা রাতটি কাটাবেন!
প্রথম মিডফিল্ডার হিসেবে রিয়ালের হয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগে হ্যাটট্রিক করলেন ভালভার্দে। পূর্ববর্তী সংস্করণ ইউরোপিয়ান কাপও বিবেচনায় নিলে ভালভার্দে রিয়ালের ইতিহাসে হ্যাটট্রিক করা দ্বিতীয় মিডফিল্ডার। ১৯৬৮ সালে সাইপ্রাসের ক্লাব এইএলের বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করেন পিরি। ৫৮ বছর পর এ তালিকায় রিয়ালের স্প্যানিশ কিংবদন্তির একাকিত্ব ঘোচালেন ভালভার্দে।
সিটি গোলরক্ষক জানলুইজি দোন্নারুম্মার ভুল এবং অধিনায়ক ভালভার্দের দারুণ নৈপুণ্যে ২০তম মিনিটে এগিয়ে যায় আলভারো আরবেলোয়ার দল। থিবো কোর্তোয়া লম্বা করে শট নেন প্রতিপক্ষের সীমানায়, সেখানে ছিলেন নিকো ও’রাইলি, প্রথম ছোঁয়ায় তাকে ফাঁকি দিয়ে সামনে বল বাড়ান ভালভার্দে। বিপদ বুঝে দ্রুত এগিয়ে যান দোন্নারুম্মা; কিন্তু বলের গতি-প্রকৃতি বুঝতে পারেননি তিনি। বলে আরেক ছোঁয়ায় তাকেও পরাস্ত করে, দুরূহ কোণ থেকে নিখুঁত শটে দূরের পোস্ট দিয়ে গোলটি করেন উরুগুয়ের মিডফিল্ডার।
সাত মিনিট পর আরেকটি দারুণ গোল করেন ভালভার্দে। এবার ভিনিসিয়ুসের বাড়ানো বল প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডার রুবেন দিয়াজের পায়ে লেগে পেয়ে যান তিনি। দ্রুত ডি-বক্সে ঢুকে জায়গা বানিয়ে কোনাকুনি শটে দোন্নারুম্মাকে পরাস্ত করেন এই সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার।
তার হ্যাটট্রিক গোলটি আরও চমৎকার। ডি-বক্সে প্রতিপক্ষের একাধিক খেলোয়াড়ের মধ্যে দারুণভাবে বল হাওয়ায় ভাসিয়ে দেন ব্রাহিম দিয়াজ। বলে দারুণ নিয়ন্ত্রিত ছোঁয়ায় আরেক জনের চ্যালেঞ্জ সামলে, ঠাণ্ডা মাথার ভলিতে গোলটি করেন ভালভার্দে।
চলতি মৌসুমে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে আগের ৩৮ ম্যাচে তিনটি গোল করেন ভালভার্দে, লা লিগায় দুটি ও স্প্যানিশ সুপার কাপে একটি। এবার এক ম্যাচেই জালে বল পাঠালেন তিনবার। সিনিয়র ফুটবলে এক দশকের বেশি সময়ের ক্যারিয়ারে এটাই তার প্রথম হ্যাটট্রিক। উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগে আগের ৭৫টি ম্যাচে তিনটি গোল করতে পেরেছিলেন ভালভার্দে। এবার সিটির বিপক্ষে প্রথমার্ধেই তিন গোল করলেন তিনি।
চোটের কারণে কিলিয়ান এমবাপ্পে, জুড বেলিংহ্যামসহ কয়েকজনকে আগেই হারানো রিয়াল শিবিরে বিরতির সময় মেলে আরেক দুঃসংবাদ। ডিফেন্ডার ফেরলঁদ মঁদি আবার চোট পাওয়ায় দ্বিতীয়ার্ধে তার জায়গায় নামেন ফ্রান গার্সিয়া। এই অর্ধের খেলা শুরু হতেই আবার আক্রমণ শানায় রিয়াল। ডি-বক্সে একজনকে কাটিয়ে জোরালো শট নেন দিয়াস, ঝাঁপিয়ে সেটা আটকে দেন দোন্নারুম্মা।
৫৬তম মিনিটে ব্যবধান বাড়ানোর সুবর্ণ সুযোগ পেয়েও কাজে লাগাতে পারেননি ভিনিসিয়ুস। গতিময় প্রতি-আক্রমণে তিনি ডি-বক্সে ঢুকে একজনকে কাটিয়ে গোলরক্ষককেও কাটানোর চেষ্টা করেন, তাকে আটকাতে না পেরে ফাউল করে বসেন দোন্নারুম্মা। বাজে পেনাল্টির বাঁশি; কিন্তু ব্রাজিলিয়ান ফরোয়ার্ডের দুর্বল স্পটকিক রুখে দেন ইতালিয়ান গোলরক্ষক।
বল দখলে পিছিয়ে থাকলেও, টানা আক্রমণে চাপ ধরে রাখে রিয়াল। সুযোগও আসতে থাকে; যদিও চতুর্থ গোলের দেখা আর পায়নি তারা। ৬৭তম মিনিটে পাল্টা আক্রমণে দারুণ একটি সুযোগ পায় সিটি; বল যাচ্ছিল গোলমুখে ফাঁকায় আর্লিং হালান্ডের কাছে, মাঝে দুর্দান্তভাবে সøাইড করে দলকে বাঁচান আন্টোনিও রুডিগার।
কিছুটা সময় সিটির মধ্যে মরিয়া ভাব দেখা যায়। যদিও কাজের কাজ কিছু করতে পারেনি তারা। নিজের ছায়া হয়ে থাকা হালান্ডকে তুলে ওমর মার্মুশকে নামান সিটি কোচ পেপ গার্দিওলা। তিনিও পারেননি তেমন কিছু করে দেখাতে।
এখন কোয়ার্টার ফাইনালে যেতে হলে আগামী সপ্তাহে ইতিহাদে ফিরতি লেগে ঘুরে দাঁড়ানোর নতুন এক গল্প লিখতে হবে ম্যান সিটিকে। কিন্তু গার্দিওলা সেই গল্প লেখার খুব একটা সম্ভাবনা দেখছেন না। তিনি বলেছেন, ‘খুব বেশি নয়। অবশ্যই আমরা চেষ্টা করব। কোথায় কী আরও ভালো করা যায়, তা বিশ্লেষণ করব। আক্রমণভাগে আরও সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করব এবং লড়াইটা চালিয়ে যাব।’
তবে প্রথম লেগে তিন গোলে জেতার পর রিয়ালের পরবর্তী পর্বে যাওয়ার হার দেখলে আরও দমে যেতে পারেন গার্দিওলা। পরিসংখ্যান বলছে, এখন পর্যন্ত ইউরোপিয়ান ক্লাব প্রতিযোগিতার নকআউট পর্বে প্রথম লেগে ৩ বা তার বেশি গোলের ব্যবধানে জেতার পর কখনো বিদায় নেয়নি রিয়াল। ৩৫ বার দলটি প্রথম লেগে ৩-০ গোলে এগিয়ে ছিল, যেখানে দুই লেগ মিলিয়ে জিতে প্রতিবারই পরের পর্বে গেছে তারা।
তবে রেকর্ড গড়াই হয় ভাঙার জন্য। ইতিহাদে ১৭ মার্চ রাতে তেমন প্রত্যাশা নিয়েই মাঠে নামবে সিটি। সেজন্য অবশ্য কঠিন পথই পাড়ি দিতে হবে তাদের।