কর্মহীন হতে পারে ৭০ লাখ মানুষ

আপডেট : ১৪ মার্চ ২০২৬, ০৭:৩৫ এএম

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত বাণিজ্য ও বিনিয়োগ চুক্তির ফলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে ধস নামতে পারে এবং নতুন করে ভয়াবহ বেকারত্বের সৃষ্টি হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, বাংলাদেশের জিডিপির তুলনায় কর বাড়ানো জরুরি হলেও এই চুক্তির ফলে কর কমে যেতে পারে, যার প্রভাব সরাসরি পড়বে সাধারণ মানুষের ওপর। এতে কাজ হারাতে পারেন দেশের ৭০ লাখ মানুষ। তাদের ভাষ্য, চুক্তি করে অন্তর্বর্তী সরকার বাংলাদেশকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় ফেলে গেছে। ব্যবসায়ী বা রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে কোনো আলোচনা ছাড়াই গোপনে এই চুক্তি স্বাক্ষর করে দেশের স্বার্থ বিকিয়ে দিয়েছেন। তাই এই চুক্তির সঙ্গে জড়িতদের শাস্তির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা। গতকাল শুক্রবার রাজধানীর বিজয়নগরে ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি কেন বাংলাদেশের জন্য বিপজ্জনক’ শীর্ষক এক সেমিনারে এসব কথা বলেন বিশ্লেষকরা। গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি এ সেমিনারের আয়োজন করে। সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন লেখক ও গবেষক ড. গোলাম রসূল। আলোচনায় অংশ নেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোশাহিদা সুলতানা এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মাহা মীর্জা। 

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তিন দিন আগে ৯ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাক্ষরিত বাণিজ্য ও বিনিয়োগ চুক্তি সই হয়।

সেমিনারে সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, এ বাণিজ্য চুক্তি সইয়ের ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকারের আগ্রহ ছিল বেশি। তারা কেন এমনটি করেছে, তা বোধগম্য নয়। নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে এই চুক্তি করার কারণও প্রশ্নসাপেক্ষ।

তিনি বলেন, সংসদে আলোচনা ছাড়া কোনো চুক্তি করা উচিত নয়। বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান চুক্তিটিকে ভালো বলছেন, কিন্তু সরকারের উচিত এ চুক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া। অন্যথায় ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানটি কেবল বাগাড়ম্বর হয়ে থাকবে। এই স্লোগানটি বাস্তবায়ন করতে হলে সরকারকে জাতীয় সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

সভাপতির সমাপনী বক্তব্যে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ অন্তর্বর্তী সরকারের সমালোচনা করে বলেন, ‘যারা দেশের জনগণ, ব্যবসায়ী বা রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে কোনো আলোচনা ছাড়াই গোপনে এই চুক্তি স্বাক্ষর করে দেশের স্বার্থ বিকিয়ে দিয়েছেন, তারা গণশত্রু। চুক্তি করে অন্তর্বর্তী সরকার বাংলাদেশকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় ফেলে গেছে। চুক্তির সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের নাম প্রকাশ করে বিচার ও শাস্তির আওতায় আনতে হবে।’

বাংলাদেশে চুক্তি সঙ্গে জড়িতদের নাম উন্মোচন করার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বর্তমান সরকারপ্রধান নির্বাচনের আগে বলেছিলেন ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। যদি এই স্লোগান সত্যিই বিশ্বাস করা হয়, তাহলে সরকারকে এ বিষয়ে সংসদে আলোচনার উদ্যোগ নিতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নির্বাচনের আগে বলেছেন, সবার আগে বাংলাদেশ। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে সবার আগে যুক্তরাষ্ট্র। আমাদের দাবি, এ বাণিজ্য চুক্তিতে যারা সই করেছে তাদের বিচার করতে হবে।’

অন্তর্বর্তী সরকারকে উদ্দেশ্য করে আনু মুহাম্মদ বলেন, তারা চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল চুক্তিটিও করতে চেয়েছিল। তবে শ্রমিকদের প্রতিবাদের কারণে তা সম্ভব হয়নি। সে সময় এ বিষয়ে সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান, প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক বিশেষ দূত লুতফে সিদ্দিকী ও প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস বেশ তৎপর ছিলেন। 

আদালতের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘এখন আবার আদালত রায় দিচ্ছে। বিস্ময়কর লাগে সরকারের ইচ্ছা যেন আদালত বুঝে ফেলে এবং সে অনুযায়ী রায় দেয়। জানি না এটি কোন আইনি প্রক্রিয়ায় ঘটে।’ 

ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, মানবাধিকার রক্ষায় ইউরোপ কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখেনি। ইরানের ওপর হামলার ঘটনায়ও তারা কোনো নিন্দা জানায়নি। বর্তমান পরিস্থিতিতে চীন বা রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশ সম্পর্ক রাখবে কি না সেটিও যেন যুক্তরাষ্ট্রের নির্দেশনার ওপর নির্ভর করছে। বৈশ্বিক সংকটে জাতিসংঘেরও কার্যকর ভূমিকা দেখা যাচ্ছে না। এতে ঔপনিবেশিক ব্যবস্থার ভয়ংকর চেহারা ফুটে উঠছে।

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনায় ড. গোলাম রসূল চুক্তির ঝুঁকি তুলে ধরে বলেন, ‘এটি সম্পূর্ণ একতরফা চুক্তি। বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রকে ‘জিরো-ট্যারিফ (শূন্য শুল্ক) সুবিধা দিলেও যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাকের ওপর তাদের ১৬ শতাংশ শুল্ক প্রত্যাহার করেনি। যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধার কথা বলা হলেও তাতে এত শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে যে গার্মেন্টস মালিকরাই এর লাভ নিয়ে সন্দিহান।’

 তিনি আরও জানান, চুক্তির শর্ত অনুযায়ী আগামী ৫ বছরে বাজারদরের চেয়ে অনেক বেশি মূল্যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ২২ বিলিয়ন ডলারের সামরিক সরঞ্জাম, ১৪টি বোয়িং বিমান, এলএনজি, তুলা ও সয়াবিন কিনতে বাধ্য থাকবে বাংলাদেশ। বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে ডাব্লিউটিও-এর বদলে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব মেকানিজম এবং ‘জিএমও’ বীজ ও প্যাটেন্ট আইনের বাধ্যবাধকতার ফলে দেশীয় ফার্মাসিউটিক্যালস শিল্প ধ্বংসের পাশাপাশি দেশের সার্বভৌমত্ব মারাত্মকভাবে ক্ষুন্ন হবে। 

কৃষি ও দুগ্ধ শিল্পের পরিণতির কথা তুলে ধরে ড. মাহা মীর্জা বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র থেকে শূন্যশুল্কে দুধ, মাখন, পনির, গুঁড়া দুধ এবং হিমায়িত মাংস দেশে প্রবেশ করলে স্থানীয় পোলট্রি ও দুগ্ধ শিল্প পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাবে। এর ফলে গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত ৬৫ থেকে ৭০ লাখ মানুষ, বিশেষ করে নারীরা কর্মহীন হয়ে পড়বেন।’ 

তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের কৃষকরা বিপুল ভর্তুকি পেলেও চুক্তির কারণে বাংলাদেশ তার দেশীয় কৃষকদের কোনো ভর্তুকি বা বিদেশি পণ্যের ওপর রেগুলেটরি বাধা দিতে পারবে না। ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করে ড. মোশাহিদা সুলতানা বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের ম্যানুফ্যাকচারিং খাত সংকুচিত হওয়ায় তারা এখন জোরপূর্বক বিভিন্ন দেশের বাজার দখলের চেষ্টা করছে। এটি স্পষ্টতই একটি দাসত্বের চুক্তি।’ 

চুক্তিটির আইনি বৈধতা নিয়ে ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের এ ধরনের দীর্ঘমেয়াদি আন্তর্জাতিক চুক্তি স্বাক্ষরের কোনো ম্যান্ডেট ছিল না। সংবিধানের ১৪৫ (ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিদেশের সঙ্গে হওয়া কোনো চুক্তি রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে সংসদে উপস্থাপন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু এই চুক্তিটি সম্পূর্ণ গোপনীয়তার সঙ্গে করা হয়েছে, যা সরাসরি সংবিধানের লঙ্ঘন।’

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত