তেহরানের নতুন অস্ত্র ‘সেজিল-২’

আপডেট : ১৭ মার্চ ২০২৬, ০২:০১ এএম

ইরানের পশ্চিমাপন্থি শাসকগোষ্ঠীর পতনের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য বিশ্ব শক্তির বিরুদ্ধে তেহরানকে সবসময়ই তটস্থ থাকতে হয়েছে। ৪৭ বছরের এই পরিক্রমায় ইরান বেশ কয়েকবার সম্মুখ সংঘাতে জড়িয়েছে। তবে ইরানের ইসলামি শাসনতন্ত্রের পুরোটা সময় যে যুদ্ধ সামাল দিতে হচ্ছে, তা হলো অর্থনৈতিক যুদ্ধ। পশ্চিমাদের আরোপিত নিষেধাজ্ঞায় ইরানের অর্থনীতি যখন ভেঙে পড়েছে; তখনো ইরানকে তার ক্ষেপণাস্ত্র ভান্ডারের আধুনিকায়ন চালিয়ে নিতে হয়েছে। এর পেছনে সবচেয়ে মুখ্য কারণ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান হুমকি। সমর বিশেষজ্ঞরা অনেক দিন ধরেই দাবি করছেন, ইরান তার মিসাইল ভান্ডার এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। সময়ে সময়ে ইরানও তাদের সাফল্যের কথা জানালেও, পশ্চিমারা বিশেষত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তাদের সক্ষমতা নিয়ে প্রকাশ্যে সন্দেহ পোষণ করেছে; উপরন্তু এ দুই দেশই আবার পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের অভিযোগ চাপিয়ে ইরানে হামলা করেছে কিংবা দেশটির শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্যবস্তু করে ধারাবাহিকভাবে চাপ সৃষ্টি করে আসছে। তবে উপসাগরীয় অঞ্চলে চলমান সংঘাত ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা বেশ ভালোভাবেই ফুটিয়ে তুলেছে। ইতিমধ্যে এই যুদ্ধে ইরান তার ভা-ার থেকে হারপারসনিকসহ বেশ কয়েকটি নতুন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে। এসবের মধ্যে আলোচনায় উঠে এসেছে ইরানের ড্যান্সিং ক্ষেপণাস্ত্র ‘সেজিল-২’। গত রবিবার ইসরায়েলের একাধিক লক্ষ্যবস্তুতে ‘সেজিল’ মিসাইল দিয়ে হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরানের ইসলামিক রেভোলিউশন গার্ড কোর (আইআরজিসি)। ইরানের আধা-সরকারি তাসনিম নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলা শুরুর পর এই প্রথম কৌশলগত ও সলিড-ফুয়েল সেজিল মিসাইল ব্যবহার করেছে আইআরজিসি। ইরানের এই অভিজাত বাহিনী বলছে, ইসরায়েলের ওপর ৫৪তম দফায় এই পাল্টা হামলা চালানো হয়।

আইআরজিসির জনসংযোগ দপ্তর এক বিবৃতিতে বলেছে, নতুন দফার এই হামলায় খায়বার-শেকান, কদর ও এমাদ মিসাইল ছোড়া হয়েছে। এর পাশাপাশি ছিল দুই টন ওয়ারহেড বহনে সক্ষম অতি-ভারী খাইবার সিরিজের ক্ষেপণাস্ত্র ‘খোররামশহর’। বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, ইসরায়েলি বাহিনীর যে কেন্দ্রগুলো থেকে বিমান হামলা নিয়ন্ত্রণ ও নীতিনির্ধারণ করা হয়, মূলত সেগুলো লক্ষ করেই এই প্রথম সেজিল ছুড়েছে তারা। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা ও সামরিক শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও সেনাঘাঁটিগুলোয় এ হামলায় সফলভাবে আঘাত হানা গেছে বলেও দাবি করেছে আইআরজিসি।

সেজিল ক্ষেপণাস্ত্র কতটা শক্তিশালী

সেজিল একটি দ্বি-স্তরীয় (টু-স্টেজ), সলিড-ফুয়েল বা কঠিন জ¦ালানিচালিত মাঝারি পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র। তরল জ্বালানিচালিত মিসাইলের তুলনায় এই সলিড-ফুয়েল মিসাইল অনেক দ্রুত উৎক্ষেপণের জন্য প্রস্তুত করা যায়। শত্রুপক্ষ আক্রমণ করলে পাল্টা জবাব দিতে এবং প্রতিকূল পরিস্থিতিতে টিকে থাকতে এই দ্রুত প্রস্তুতি বাড়তি সুবিধা দেয়। অনেক উঁচু দিয়ে ওড়ার সময়ও এ ক্ষেপণাস্ত্রের পথ পরিবর্তনের ক্ষমতা থাকার জন্য এটিকে ‘ড্যান্সিং মিসাইল’ বা ‘নাচুনে ক্ষেপণাস্ত্র’ বলে ডাকা হয়ে থাকে। এই মিসাইলের পাল্লা প্রায় ২ হাজার ৫০০ কিলোমিটার এবং এটি প্রায় ৭০০ কেজি ওজনের পেলোড (যুদ্ধাস্ত্র) বহনে সক্ষম। ইসরায়েলের আয়রন ডোমের মতো প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ফাঁকি দেওয়ার লক্ষ্যেই এই বিশেষ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। ওয়াশিংটনের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ক্ষেপণাস্ত্রটি প্রায় ১৮ মিটার লম্বা; এর ওজন প্রায় ২৩ হাজার ৬০০ কেজি। কঠিন জ¦ালানির ব্যবহার ক্ষেপণাস্ত্রটিকে একটি কৌশলগত সুবিধা দেয়। তরল জ্বালানিব্যবস্থায় পরিচালিত শাহাব সিরিজের ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায় এটিকে দ্রুত প্রস্তুত ও উৎক্ষেপণ করা যায়।

সলিড-ফুয়েল হওয়ায় সেজিল আরও একটি বাড়তি সুবিধা পায়। এটি শনাক্ত করা ও প্রতিহত করা তুলনামূলক কঠিন। আইআরজিসির দাবি, সেজিল ইরানের নাতাঞ্জ পারমাণবিক স্থাপনা থেকে প্রায় সাত মিনিটে তেল আবিবে পৌঁছে যেতে পারবে। নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে এই ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির কাজ শুরু করেছিল ইরান। সিএসআইএসের তথ্য বলছে, ২০০৮ সালে প্রথম এই ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণ শুরু হয়। ওই সময় ক্ষেপণাস্ত্রটি প্রায় ৮০০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করেছিল। দ্বিতীয় উৎক্ষেপণটি করা হয় ২০০৯ সালের মে মাসে। ওই বছরের পর থেকে ক্ষেপণাস্ত্রটির আরও চারটি ফ্লাইট পরীক্ষা পরিচালিত হয়েছে। ষষ্ঠ পরীক্ষার সময় ক্ষেপণাস্ত্রটি প্রায় ১ হাজার ৯০০ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে ভারত মহাসাগরে পৌঁছায়। এবার ইরান যুদ্ধের ১৬তম দিনে ক্ষেপণাস্ত্রটি উৎক্ষেপণ করা হয়েছে। একই দিনে ইসরায়েলের বিশেষ পুলিশ ইউনিট ‘লাহাভ ৪৩৩’-এর সদর দপ্তর ও গিলাত প্রতিরক্ষা স্যাটেলাইট যোগাযোগ কেন্দ্রেও বড় ধরনের হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরানের সেনাবাহিনী।

গত মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে আগ্রাসন চালানোর পর সংঘাত ছড়িয়ে পড়ে। এই হামলায় ইরানের ৮৬ বছর বয়সী সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হন এবং মধ্যপ্রাচ্যে আরও ব্যাপক আকারে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। জবাবে ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলোয় থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি ও স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে ইরান। একই সময়ে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের স্থাপনাগুলোয় হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, এই যুদ্ধে ইতিমধ্যে দুই হাজারের বেশি মানুষ মারা গেছে; যার সিংহভাগই ইরানি। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানের ক্ষয়ক্ষতি ও হতাহতের সংখ্যা বেশি হলেও, কৌশলগতভাবে ইরান এই যুদ্ধে ভালোই জবাব দিচ্ছে। যুদ্ধ বিশ্লেষকরা বলছেন, এই যুদ্ধে ইরানকে সামরিক, প্রযুক্তি ও তথ্যগত সুবিধা দিচ্ছে রাশিয়া-চীন। সে কারণেই ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রগুলো অনেক বেশি নির্ভুলভাবে আঘাত হানছে। সংঘাতের এই পর্যায়ে এসে ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করে ইসরায়েল জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ক্ষেপণাস্ত্র ইন্টারসেপ্টর ফুরিয়ে আসছে। দেশটির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, গত বছর ইরানের সঙ্গে লড়াইয়ের সময় বিপুল পরিমাণ ইন্টারসেপ্টর ব্যবহারের ফলে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা আগে থেকেই অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়েছিল। বর্তমান যুদ্ধে ইরানের ক্রমাগত ক্ষেপণাস্ত্র বর্ষণ ইসরায়েলের দূরপাল্লার আকাশ প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্কের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান তাদের কিছু ক্ষেপণাস্ত্রে গুচ্ছ বোমা যুক্ত করেছে। এর ফলে সেগুলো মাঝপথে আটকে দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে এবং ইসরায়েলের মজুদে থাকা ইন্টারসেপ্টর দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। ওয়াশিংটন অবশ্য কয়েক মাস আগে থেকেই এই সংকটের বিষয়ে অবগত ছিল। কিন্তু এসব ইন্টারসেপ্টরের উৎপাদন সময়সাপেক্ষ হওয়ায় এটির সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে ব্যবহারের জন্য দ. কোরিয়া থেকে থাড প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সরিয়ে আনার বিষয়টিও সে কথার পক্ষে ইঙ্গিত দেয়। যদিও ওয়াশিংটন জোর দিয়ে বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের হাতে পর্যাপ্ত ইন্টারসেপ্টরের মজুদ রয়েছে এবং তারা এ ধরনের কোনো সংকটের সম্মুখীন নয়। যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে অতিরিক্ত ইন্টারসেপ্টর সরবরাহ করবে কি না তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে ইরানের হামলায় ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা কতটা কার্যকর থাকবে, সেটির ওপরও যুদ্ধের স্থায়িত্বে বিষয়টি নির্ভর করতে পারে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত