জামালপুরে ৫ শিশুর দাফন সম্পন্ন, তদন্ত কমিটি গঠন

আপডেট : ২২ মার্চ ২০২৬, ০৪:৫২ পিএম

জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ পৌর শহরের কালিকাপুর এলাকায় ব্রহ্মপুত্র নদের ওপর প্লাস্টিক ড্রামের তৈরি ভাসমান পরিত্যক্ত সাঁকো ভেঙে পানিতে ডুবে দুই পরিবারের চার সহদোরসহ নিহত পাঁচ শিশুর দাফন সম্পন্ন হয়েছে। প্রশাসনের উদাসীনতা ও পার্ক মালিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানিয়েছেন স্বজন এবং স্থানীয়রা। এ ঘটনায় আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। 
 
রবিবার (২২ মার্চ) সকালে নিহত শিশুদের তিন পরিবারের নিজ নিজ এলাকায় জানাজার পর দাফন সম্পন্ন করা হয়। রাত সাড়ে ১০টায় আর কোনো নিখোঁজ না থাকায় উদ্ধার অভিযান সমাপ্ত করেছে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল।
 
এরআগে শনিবার (২১ মার্চ) বিকাল ৪টার দিকে দেওয়ানগঞ্জ পৌর শহরের মডেল থানার সামনে কালিকাপুর এলাকায় ব্রহ্মপুত্র নদের ওপর প্লাস্টিক ড্রামের তৈরি ভাসমান পরিত্যক্ত সাঁকো ভেঙে এই দুর্ঘটনা ঘটে।

এ ঘটনায় প্রশাসনের উদাসীনতা ও ইকো পার্ক মালিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ করছেন স্বজন এবং স্থানীয়রা। তারা জানিয়েছেন, প্রতি বছর ঈদের আগে পৌর কর্তৃপক্ষ সাঁকোটি সংস্কার করেন। কিন্তু গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর সাঁকোটি আর কোনো সংস্কার করা হয়নি এবং সাঁকোটিকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। যার কারণে ঈদের আগের দিন পর্যন্ত সাঁকোটি বন্ধ ছিল। সাঁকো মেরামত না করেই ওই পাড়ের পার্ক মালিক তাদের ব্যবসার কথা ভেবে নদের পূর্বপাড়ে সাঁকোর মাথায় ঈদের আগের দিন ইকো পার্ক ঘুরে আসুন এমন লেখা একটি বিলবোর্ড টাঙিয়ে দেন। প্রশাসন নাকের ডগায় পরিত্যক্ত সাঁকোটি চালু হলেও প্রশাসন কোনো ধরনের ব্যবস্থা নেয়নি বলে অভিযোগ তাদের। 

এছাড়াও ঈদের সময় ওই সাঁকো দিয়ে মানুষের যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ করতে পৌর প্রশাসনের পক্ষ থেকে লোকবল নিয়োগ করা হতো। কিন্তু কালকে প্রশাসন সেই কাজটিও করেন নাই। প্রশাসন ও মালিহা গ্রুপ যোগসাজস করেই পরিত্যক্ত সাঁকোটি চালু করেছেন। তাই আজকের এই মৃত্যুর জন্য প্রশাসনের উদাসীনতা ও পার্ক মালিক পক্ষ দায়ি বলে অভিযোগ করছেন তারা।

নিহত শিশুরা হলেন- দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার চুকাইবাড়ি ইউনিয়নের ডাকাতিয়াপাড়া এলাকার জয়নাল আবেদীনের মেয়ে মায়া মনি (১০), তার ছেলে মিহাত (১৪), একই উপজেলার বাহাদুরাবাদ ইউনিয়নের ঝালুরচর এলাকার শের আলীর ছেলে ও স্থানীয় ইসাতুন সুন্নাহ মডেল মাদরাসার শিক্ষার্থী আব্দুল মোতালেব (৬), মেয়ে একই মাদরাসার হাফেজ শিক্ষার্থী খাদিজা বেগম (১২) ও দেওয়ানগঞ্জ পৌর শহরের বেলতলি বাজার এলাকার হাবিবুল্লাহর ছেলে পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থী আবির হোসেন (১৪)। 

স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, থানা মোড় থেকে পৌর শহরের কালিকাপুর এলাকায় যাতাযাতের জন্য দেওয়ানগঞ্জ পৌরসভার উদ্যোগে ব্রহ্মপুত্র নদের ওপর প্লাস্টিকের ড্রামের ভাসমান সাঁকো তৈরি করা হয়। গত ৫ আগষ্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সাঁকোর আর কোন সংস্কার করা হয়নি। পরে সাঁকোটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। সেই পরিত্যক্ত সাঁকোটি ঈদের আগের দিন পর্যন্ত অর্থাৎ গত শুক্রবার (১৯ মার্চ) পর্যন্ত বন্ধ ছিল।

ব্রহ্মপুত্র নদের পূর্ব তীরে চর কালিকাপুর এলাকায় পিকনিক স্পট, মিনি চিড়িয়াখানা ও শিশু পার্কসহ বিনোদনের জন্য মালিহা গ্রুপ একটি মালিহা ইকো পার্ক তৈরি করেছেন। ঈদ উপলক্ষে পার্ক কর্তৃপক্ষ ব্যবসার কথা ভেবে পরিত্যক্ত সাঁকোর সামনে পার্কে ঘুরে আসার বিলবোর্ড টাঙ্গিয়ে দেন। ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে ওই ইকো পার্কে যাওয়ার জন্য বিকাল থেকেই থানার সামনে নদের পশ্চিম তীরে ভিড় করে নানা বয়সী দর্শনার্থী। বিকাল ৪টার দিকে সাঁকোর ওপর দিয়ে পার্কে যাওয়ার সময় পরিত্যক্ত সাঁকোটি ভেঙ্গে যায়। এ সময় প্রায় শতাধিক মানুষ নদের পানিতে ডুবে যায়। এ ঘটনায় ৬ শিশু নিখোঁজ হয়। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল উদ্ধার অভিযান শুরু করেন। পরে ফায়ার সার্ভিসের ডুবরী দলের অভিযানে ও স্থানীয়দের সহায়তায় একে একে পাঁচ শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। পরে আজ সকালে তিন পরিবার তাদের নিজ নিজ এলাকায় জানাজা শেষে দাফন সম্পন্ন করেছেন। এ ঘটনায় আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট এ, কে, এম আব্দুল্লাহ-বিন-রশিদকে প্রধান ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সুমী আক্তারকে সদস্য সচিব করে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। 

এখন আর কোনো শিশু নিখোঁজ না থাকায় উদ্ধার অভিযান বন্ধ করেছেন ফায়ার সার্ভিস। এ ঘটনায় শান্তি নামে এক শিশু আহত হয়ে দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

এ বিষয়ে ইকো পার্ক মালিক মালিহা গ্রুপের চেয়ারম্যান উপজেলা বিএনপির সহ-সভাপতি মাহবুবুল হাসান বলেন, থানার সামনে অনেক মানুষের সমাগম ঘটে। প্রচার-প্রচারণার জন্য সেখানে বিলবোর্ড লাগানো হয়। প্রচার-প্রচারনার জন্য এমন বিলবোর্ড আরও অনেক জায়গায় লাগানো হয়েছে। আর সাঁকোটি পরিত্যক্ত বা চালু কিনা বিষয়টা আমি জানি না। সাঁকো চালু করার সাথে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। 
    
জামালপুর ফায়ার সার্ভিসের সিনিয়র স্টেশন অফিসার রবিউল ইসলাম বলেন, পাঁচজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। একজন আহত চিকিৎসাধীন রয়েছে। আর কোনো নিখোঁজের অভিযোগ না থাকায় আমাদের উদ্ধার অভিযান বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
 
এ বিষয়ে দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) ও পৌর প্রশাসক মুরাদ হোসেন বলেন, আমি ১০-১২ দিন আগে পৌর প্রশাসকের দায়িত্ব নিয়েছি। ওই পাড়ে পার্ক আছে কি না তা আমি জানি না। আর পার্কের মালিক কে, তাকেও আমি চিনি না। ভাসমান সাঁকো পরিত্যক্ত হওয়ায় এটার সংযোগ ঈদের দিন সকাল পর্যন্ত বিচ্ছিন্ন ছিল। পরে কে বা কাহা এটার সংযোগ দিয়েছে বিষয়টা আমি অবগত না। 
     
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইউসুপ আলী শোক প্রকাশ করে বলেন, গতকালকের ঘটনাটি খুবই দুঃখজনক ও হৃদয়বিদারক। এ ঘটনা তদন্তের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রধান ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব), পুলিশ এবং ফায়ার সার্ভিস মিলে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে দেওয়া হয়েছে। তারা সার্বিক বিষয় পর্যালোচনা করে ৭-১০ দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিবেন। এ ঘটনার সাথে কেউ জড়িত থাকলে তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাগ্রহণ করা হবে।

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত