যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান উত্তেজনা এখন এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি আল্টিমেটামের জবাবে ইরান পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছে, তাদের বিদ্যুৎকেন্দ্রে কোনো আঘাত এলে তারা পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে জ্বালানি ও পানি অবকাঠামোতে আক্রমণ চালাবে। এই পাল্টাপাল্টি হুমকির ফলে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে এক ভয়াবহ মানবিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত হয় গত শনিবার (২১ মার্চ) রাতে, যখন ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে ইরানকে ৪৮ ঘণ্টার সময় বেঁধে দেন। তিনি জানান, ইরান যদি এই সময়ের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী পুরোপুরি খুলে না দেয়, তবে যুক্তরাষ্ট্র দেশটির বৃহত্তম বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো ধ্বংস করে দেবে। এর জবাবে ইরানের সামরিক মুখপাত্র ইব্রাহিম জোলফাকারি এবং পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কলিবাফ কড়া বার্তা দিয়েছেন। তারা জানিয়েছেন, ইরানের শক্তি অবকাঠামো আক্রান্ত হলে ওই অঞ্চলে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্রদের সমস্ত জ্বালানি, তথ্যপ্রযুক্তি এবং পানি শোধন কেন্দ্রগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বিদ্যুৎকেন্দ্রে এই হামলা ইরানের জন্য ক্ষতিকর হলেও প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্য তা হবে চরম বিপর্যয়কর। কারণ বাহরাইন ও কাতারের ব্যবহৃত শতভাগ পানি এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের ৮০ শতাংশ ও সৌদি আরবের ৫০ শতাংশ পানীয় জল আসে সমুদ্রের পানি শোধন বা ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্ট থেকে। এই প্ল্যান্টগুলো পুরোপুরি বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। ফলে বিদ্যুৎ ও পানির সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে মরু-শহরগুলো বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়বে।
এই উত্তেজনার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিশ্ব বাজারে। তেলের দাম ওঠানামা করার পাশাপাশি ইউরোপীয় গ্যাসের দাম ইতোমধ্যে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডস সাফ জানিয়ে দিয়েছে, তাদের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পুনর্নির্মিত না হওয়া পর্যন্ত বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি রুট হরমুজ প্রণালী বন্ধ রাখা হবে। বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়েই পরিবাহিত হয়, যার ফলে বিশ্বজুড়ে নতুন করে মুদ্রাস্ফীতির উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই যুদ্ধে এ পর্যন্ত ২ হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। তিন সপ্তাহ ধরে চলা বিমান হামলায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা কমার দাবি করা হলেও, তেহরান এখনো পাল্টা আঘাত হানার ক্ষমতা প্রদর্শন করছে। গত শুক্রবার তারা ৪ হাজার কিলোমিটার পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে ভারত মহাসাগরে একটি মার্কিন-ব্রিটিশ সামরিক ঘাঁটিকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। একদিকে লেবানন সীমান্তে সংঘাত এবং অন্যদিকে জ্বালানি ও পানি যুদ্ধের হুমকি- সব মিলিয়ে পুরো অঞ্চল এখন এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত হচ্ছে।
