প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ

বিদেশগামী শিক্ষার্থীরা পাবে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ

আপডেট : ২৫ মার্চ ২০২৬, ০৬:৩৪ এএম

বিদেশগামী শিক্ষার্থীদের ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে সচিবালয়ে বৈদেশিক কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও প্রবাসী কল্যাণ বিষয়ক কমিটির অগ্রগতি পর্যালোচনায় মন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠকে তিনি এ নির্দেশ দিয়েছেন। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এ কথা জানিয়েছেন প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘বিদেশে পড়াশোনা করতে যেতে অনেক সময় ব্যাংকে বড় অঙ্কের টাকা জমা রাখা শিক্ষার্থীদের জন্য বড় একটি বাধা হয়ে দাঁড়ায়। বিষয়টি বিবেচনা করে প্রধানমন্ত্রী শিক্ষার্থীদের সহায়তায় একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। এখন বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য যেতে ইচ্ছুক শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যাংক গ্যারান্টি বা ব্যাংক সলভেন্সির সাপোর্ট হিসেবে প্রায় ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ দিতে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দিয়েছেন।’ নুরুল হক নুর বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর আগ্রহ এবং তার নির্দেশনায় আমরা প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় থেকে যারা কোরিয়া, জাপান, চায়না, জার্মানি এ রকম দেশগুলোতে যাবে; বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের ব্যাংক গ্যারান্টি বা ব্যাংক সলভেন্সির সাপোর্ট হিসেবে ১০ লাখ টাকার ঋণ দেওয়ার নির্দেশনা প্রধানমন্ত্রী দিয়েছেন। সেটা আমাদের মন্ত্রণালয়ের একটা ব্যাংক আছে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক, ওই ব্যাংককেই ডেডিকেটেড করতে বলেছেন, যেন এই মন্ত্রণালয় থেকে দেওয়া হয়।’

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিতে শ্রমিকদের সংকট নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের শ্রমবাজারের বড় একটা অংশই কিন্তু মধ্যপ্রাচ্য। সেক্ষেত্রে এই যুদ্ধের ফলে আমাদের কী ধরনের সংকট এবং সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে সেগুলো নিয়ে আলাপ-আলোচনা করেছি। বিশেষ করে এখানে মিডল ইস্টে যে ধরনের অবকাঠামোর ক্ষতি করা হয়েছে এগুলো আবার পুনর্নির্মাণ করতে হবে। তাছাড়া ওখানে আশা করি যে আমাদের দেশের শ্রমবাজার খুব বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। বরং আমাদের দেশের চাহিদা আরও তৈরি হতে পারে। সেখানে প্রধানমন্ত্রী বরাবরই থার্ড ল্যাঙ্গুয়েজ বা ভাষা শেখার বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ করেছেন। আমাদের দেশের মানুষ শুধু ভাষা না জানার কারণে অল্প পয়সার চাকরি করে। ভাষা জানলে তারা একটু ভালো বেতন পেতে পারে।’

প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘জাপানে এক লাখ লোক পাঠানোর জন্য অন্তর্বর্তী সরকার থেকে একটা এমওইউ হয়েছে, সেটাকে কীভাবে ত্বরান্বিত করা যায়; জাপানসহ ইউরোপে কীভাবে আমরা লোক পাঠাতে পারি সে বিষয়গুলো নিয়ে আলাপ-আলোচনা হয়েছে।’

প্রতিমন্ত্রী জানান, ইউরোপের বেশ কিছু দেশের ভিসা করার জন্য ইন্ডিয়া যেতে হয়। তো এটা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শুরুতেই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা দিয়েছিলেন যে, বাংলাদেশে তাদের একটা অফিস বা কনস্যুলার সেবা নিশ্চিত করার জন্য তাদের অনুরোধ করা। এ বিষয়ে আজ (গতকাল) আলোচনা হয়েছে। কিছু দেশ এরই মধ্যে এখানে কনস্যুলার সেবা দিচ্ছে। বাকি দেশগুলো যেন এখানে নিশ্চিত করে এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দিয়েছেন।’

জনশক্তি রপ্তানিতে সিন্ডিকেট ভাঙার চেষ্টায় সরকার : জনশক্তি রপ্তানিতে সিন্ডিকেট প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে যেটা আমরা অনেক দিন ধরে দেখে আসছি, কিছু কিছু জায়গায় কিছু লোক মনোপলি করে কাজ করে। সে ক্ষেত্রে অনেক জায়গায় কিন্তু আমাদের নিয়ন্ত্রণ থাকে না। যেমন সিঙ্গাপুরের ছয়টি কোম্পানি ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে তারা লোক পাঠায়। ছয়টি কোম্পানির ট্রেনিং অথরাইজেশন আছে। এটি কিন্তু সিঙ্গাপুর সরকার তাদের অথরাইজড করেছে। এখন তারা গলাকাটা পয়সা নিচ্ছে ১৪ লাখ, ১৫ লাখ, ১৬ লাখ টাকা। সিঙ্গাপুর সরকার অথরাইজড করায় আমরা কিন্তু কিছু করতে পারছি না। তবে জনগণকে একটু স্বস্তি দেওয়ার জন্য কিংবা এই সিন্ডিকেটটা ভাঙার জন্য আমরা সরকারি চ্যানেলে চিঠি দেওয়া, দেখা-সাক্ষাৎ করা, নোট ভারবাল দেওয়ার মাধ্যমে চেষ্টা করছি। এ জন্যই সরকার অভিবাসন ব্যয়টা নির্ধারণ করে দিচ্ছে।’

এ সময় তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, ‘আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে মালয়েশিয়া ও ভিয়েতনামে শ্রমবাজারের বিষয়ে শিগগির ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যাবে।’

এপ্রিলের শেষে যানজট কিছুটা কমার আশা : প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে সচিবালয়ে ‘ঢাকা শহরের যানজট নিরসন ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়ন’ সংক্রান্ত সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভা শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন হলে আগামী এপ্রিল মাসের শেষ নাগাদ রাজধানীর যানজট সমস্যার অনেকটা নিরসন হবে। তারপর মধ্যমেয়াদি এবং দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবায়ন পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন করলে আশা করা যায় আমাদের এই ট্রাফিক সিস্টেমের একটা ব্যাপক উন্নয়ন হবে।’

তিনি বলেন, ‘ট্রাফিক সিগন্যালগুলো আমরা অটোমেশনের ব্যবস্থা করছি সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে। এখন সাতটা কাজ করছে, আর সপ্তাহখানেকের মধ্যে আরও ছয়টা ইন্টারসেকশনে কাজ হবে সিগন্যাল মোড়ে। এরপরে পর্যায়ক্রমে ১২০টার মতো সিগন্যাল আছে ঢাকা শহরে সবগুলোই অটোমেশন করা হবে।’

প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমনের বরাত দিয়ে প্রেস উইং জানিয়েছেন, বৈঠকে কয়েকটি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সেগুলো হচ্ছে ১. ট্রাফিক সিগন্যালগুলো দেশীয় পদ্ধতিতে অটোমেশনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে ঢাকার ১২০টি সিগন্যাল অটোমেশন করা হবে। ২. ঢাকা শহরের চার পাশে নতুন বাইপাস সড়ক এবং শহরের ভেতরে ওভারপাস ও আন্ডারপাস নির্মাণ করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। ৩. ঢাকা শহর থেকে যত্রতত্র বাস কাউন্টার অপসারণ করা হবে। অতিদ্রুত ঢাকা মহানগরের ভেতরে থাকা ৫টি আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল সরিয়ে শহরের বাইরে স্থাপন করা হবে। এই ৫টি বাস টার্মিনাল ‘সিটি সার্ভিসের’ জন্য চালু করা হবে। ৪. রাস্তার দু’পাশের সড়ক দখলমুক্ত করা হবে। রাস্তার মধ্যে বিদ্যুতের খুঁটি সরিয়ে ফেলা হবে। ৫. ঢাকা শহরের ভেতরে রেল ক্রসিংয়ে ম্যানুয়াল ব্যবস্থার পাশাপাশি অটো সিগন্যাল লাইটিং সিস্টেম চালু করা হবে। ৬. সিটি বাসকে জিপিএস সিস্টেমের আওতায় আনা হবে। ৭. ঢাকার অধিকাংশ ফুটওভার ব্রিজে চলন্ত সিঁড়ি স্থাপন করা হবে। পাশাপাশি শহরের হাসপাতাল এলাকায় ফুটওভার ব্রিজে দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি লিফট স্থাপন করা হবে। ৮. আগামী ৭ এপ্রিলের মধ্যে অধিকাংশ প্রস্তাবিত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারবেন বলে আশা প্রকাশ করেছেন ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের প্রশাসক। ৯. এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের সঙ্গে সমন্বয় করবেন শ্রমিক নেতা শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাস এমপি।

সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, সড়ক পরিবহন, সেতু, রেলপথ ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, রেল প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব, শ্রমিক নেতা শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাস এমপি, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুল সালাম, ঢাকা উত্তরের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম মিল্টন, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) চেয়ারম্যান রিয়াজুল ইসলাম রিজু, বিআরটিসি চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ মোল্লা, পুলিশের মহাপরিদর্শক আলী হোসেন ফকিরসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

এর আগে ঈদের ছুটির পর প্রথম কর্মদিবসে গতকাল সকাল ৯টায় সচিবালয়ে অফিসে যান প্রধানমন্ত্রী। তার অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন জানান, ঈদের ছুটি শেষে প্রধানমন্ত্রী সকাল ৯টা ১ মিনিটে সচিবালয়ে তার দপ্তরে এসেছেন।  সকাল ৮টা ৪০ মিনিটে তিনি গুলশানের বাসা থেকে বের হন। অফিসে এসে তিনি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে ঈদের কুশল বিনিময় করেন। এরপর প্রধানমন্ত্রী তার দাপ্তরিক কাজ শুরু করেন।

বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, বেসামরিক বিমান চলাচল প্রতিমন্ত্রী রশিদুজ্জামান মিল্লাত, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমীন, মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি ও প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এবিএম আবদুস সাত্তারসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিব, ঊর্র্ধ্বতন কর্মকর্তারা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ঈদের কুশল বিনিময় করেন বলে জানান অতিরিক্ত প্রেস সচিব।

এরপর প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ঢাকা সফররত আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এশিয়া ও প্যাসিফিক বিভাগের পরিচালক কৃষ্ণা শ্রীনিবাসন সাক্ষাৎ করেন। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন কৃষ্ণা শ্রীনিবাসন। এ সময় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর এবং অর্থ সচিব ড. মো. খায়রুজ্জামান মজুমদার উপস্থিত ছিলেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত