জামালপুর সদরে গরু চুরির অপবাদে ছেলেকে না পেয়ে বাবা-মাকে তুলে নিয়ে মারধর করার অপমান সহ্য না করতে পেরে মা জোৎস্না বেগম আত্মহত্যা করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় বাবা সুরুজ আলী (৫৭), তোতা মিয়া (৪৭) ও সোহেল রানাকে (৩২) ইউনিয়ন পরিষদে আটকিয়ে রেখেছেন স্থানীয় মেম্বার নায়েব আলী ও তার লোকজন।
বুধবার (২৫ মার্চ) শেষ রাতে উপজেলার কেন্দুয়া ইউনিয়নের কুটামনি পূর্বপাড়া খলিলহাটা এলাকায় এ ঘটনায় ঘটে। নিহত জোসনা বেগম (৪৫) সদর উপজেলার পূর্ব কোটামনি এলাকার কৃষক সুরুজ আলীর স্ত্রী।
এই দম্পতির দুই ছেলে সুজন মিয়া (৩০) ও সজিব মিয়া (২৭)। দুই ছেলের মধ্যে সুজন মিয়া নেশাগ্রস্ত হওয়ায় এলাকায় প্রায় চুরির সঙ্গে জড়িয়ে পড়তেন। অভিযুক্ত নায়েব আলী মেম্বার কেন্দুয়া ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য।
স্থানীয় ও পুলিশ সূত্র জানায়, রাত সাড়ে তিনটার দিকে নায়েব আলী মেম্বারের বোন কামরুন নাহারের বাড়ির গোয়াল ঘরে শব্দ হয়। গরু চুরি করার জন্য কেউ বাড়িতে এসেছে। তাদের এমন সন্দেহ হয় সুজন, তোতা মিয়া ও সোহেল রানা চুরি করতে এসেছে। এ খবর পেয়ে নায়েব আলী মেম্বার বোনের বাড়িতে আসেন। গভীর রাতে নায়েব আলী পুলিশের ছেলে কাউসার মিয়ার গোয়াল ঘর থেকে গরু চুরির করতে যাওয়ার অপবাদে সুরুজ আলীর বাড়িতে যান স্থানীয় লোকজন। কাউসার ও তার লোকজন সুরুজ আলীর বড় ছেলে সুজন মিয়াকে বাড়ি থেকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন।
এ সময় তার বাবা-মা বাধা দেন। এতে উভয়ের মধ্যে ধস্তাধস্তির মধ্যে সুজন মিয়া পালিয়ে যান। এরপর তার বাবা-মাকে সেখান থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় কাউসারের বাড়ির উঠানে। এ সময় চুরির অভিযোগ উপজেলার খলিলহাটা এলাকার রঞ্জু মিয়ার ছেলে সোহেল রানা (৩২) ও একই এলাকার সুরুজ্জামানের ছেলে তোতা মিয়াকে (৪৫) ধরে আনা হয়। পরে রাতেই নায়েব আলীর নির্দেশে সুজনের বাবা সুরুজ মিয়া, তোতা মিয়া ও সোহেলকে বেঁধে মারধর করা হয়। সুরুজ মিয়াকে মারধরের সময় জোৎস্না বেগম ফেরানোর চেষ্টা করেন। এ সময় তাকেও মারধর ও ছেলের অপরাধে বিভিন্ন অপবাদ দিতে থাকে লোকজন। এক পর্যায়ে সুরুজ আলীকে বেঁধে রেখে রাতেই জোসনাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
বৃহস্পতিবার সকালে জোৎস্না বেগমকে ফের বাড়ির উঠানে ডেকে নিয়ে যান। এ সময় আবারও তাকে মারধর ও নানা অপবাদ দেওয়া হয়। এর মধ্যে তিনজনকে এক রশিদে হাত বেঁধে এলাকায় হাঁটিয়ে কেন্দুয়া ইউনিয়ন পরিষদের নেওয়া হয়। এসব ঘটনার অপমান সইতে না পেরে আজ সকালে বাড়িতে গিয়ে জোৎস্না বেগম গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করেছেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
তবে পরিবারের অভিযোগ, নায়েব আলী মেম্বার ও তার লোজন তাকে মেরে ঝুলিয়ে রেখেছে।
খবর পেয়ে দুপুরের দিকে পুলিশ তার মরদেহ উদ্ধার করে জামালপুর জেনারেল হাসপাতাল মর্গে পাঠায়। এদিকে এ ঘটনায় এলাকায় ভোক্ষের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়রা দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
নিহত জোৎস্না বেগমের দেবর মোখলেসুর রহমান বলেন, সকালে যখন ভাই-ভাবিকে মারধর করেন তখন আমরা কেউ বাড়িতে ছিলাম না। তারা আমার ভাবিকে মেরে ঝুলিয়ে রেখেছে। আমরা এ ঘটনার বিচার চাই।
নিহতের দুলাভাই মোজাফফর হোসেন বলেন, আমার সামনে নায়েব আলী মেম্বারের লোকজন মারধর করেছে। তিনি নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে তিনি ওখান থেকে দৌড়ে পালিয়ে আসেন।
এ ঘটনার বিষয়ে কাউসারের মা কামরুন নাহার বলেন, রাতে গোয়াল ঘরে শব্দ হলে উঠে দেখি সুজন, সোহেল ও তোতা দৌড়ে পালাচ্ছে। তখন আমার ডাক-চিৎকারে লোকজন আসে। পরে তাদের কাছে বিষয়টি বলা হলে তারা সুজনকে ধরতে তাদের বাড়িতে যায়। তখন বাড়ি থেকে নিয়ে আসার ওর মা বাধা দেন। সুজন পালিয়ে যায়। তার বাবা ঘটনা জানতে আমাদের বাড়িতে আসে। ছেলে হাজির না করা পর্যন্ত আমাদের বাড়িতে থাকবেন। তাকে আমরা কেউ তুলে নিয়ে আসিনি।
অভিযুক্ত নায়েব আলী মেম্বার বলেন, ঘটনার খবর পেয়ে বোনের বাড়িতে আসি। তারা ও আমার বোন জামাই একই গোষ্ঠীর লোক। আমরা চেয়েছিলাম বসে সমাধান করার। কিন্তু সকালে সুজনকে তার বাবা হাজির করতে পারেনি। এ সময় স্থানীয় লোকজন চোর ধরলে যে ধরনের কাজ করে সেই কাজটিই করেছে। তারা মারধর করেছে।
জামালপুর সদর থানার ওসি মিজানুর রহমান বলেন, স্থানীয়দের হাতে আটক তিনজনকে পরিবারের জিম্মায় ছেড়ে দিয়েছেন তারা। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে মরদেহ উদ্ধার করে জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠিয়েছে। এখন পর্যন্ত অভিযোগ পাইনি। এ ঘটনায় কাউকে আটক করা যায়নি। অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
