আলোচনায় বসতে চাপ ট্রাম্পের

ইরানের নৌবাহিনী প্রধানকে হত্যার দাবি ইসরায়েলের

আপডেট : ২৭ মার্চ ২০২৬, ০১:১৯ এএম

ইরানকে যুদ্ধ থেকে আলোচনায় টেনে আনতে চাপ দিয়ে যাচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সঙ্গে তিনি পারস্য উপসাগরের দিকে আরও সৈন্য নিচ্ছেন। আশঙ্কা করা হচ্ছে, শেষ পর্যন্ত ইরান আলোচনায় না এলে অথবা এলেও তা থেকে কোনো ফল না পাওয়া গেলে দেশটির খারগ দ্বীপে যুক্তরাষ্ট্র স্থল অভিযান চালাতে পারে।

অন্যদিকে, ইরান নতুন হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, দেশটিতে যুক্তরাষ্ট্র যদি স্থল অভিযান শুরু করে, তাহলে আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথের নিয়ন্ত্রণ ইরান নিয়ে নেবে। এর পরিণতিতে বিশ্ব অর্থনীতিতে আরও বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ইরানের আধাসরকারি সংবাদ সংস্থা তাসনিম দেশটির একটি সামরিক সূত্র উদ্ধৃত করে এক প্রতিবেদনে বলেছে, ইরানের মূল ভূখ- বা কোনো দ্বীপে সামরিক অভিযানের প্রতিশোধ হিসেবে ‘বাব আল-মানদাব’ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজের ওপর হামলা হতে পারে। কৌশলগত এই প্রণালিটি লোহিত সাগরের মুখে জিবুতি ও ইয়েমেনের মাঝখানে অবস্থিত।

ইরানের সামরিক সূত্রটি ‘বাব আল-মানদাব’ প্রণালির প্রতি ইঙ্গিত করে বলেছে, ইরানের যেকোনো স্থানে স্থল অভিযান হলে কিংবা পারস্য উপসাগর এবং ওমান সাগরে নৌ-তৎপরতার মাধ্যমে ইরানের ক্ষতি করার চেষ্টা করা হলে, তাহলে আরেকটি বিস্ময়কর নতুন রণাঙ্গন খুলে দেওয়া হবে।

যেসব জাহাজ আটলান্টিক মহাসাগর ও ভূমধ্যসাগর থেকে সুয়েজ খাল হয়ে এবং লোহিত সাগর থেকে আরব সাগরের দিকে আসতে চায় তাদের ‘বাব আল-মানদাব’ প্রণালি অতিক্রম করতে হয়।

ইরানপন্থি হুতিরা এর আগেও এই প্রণালিতে জাহাজে হামলা চালিয়েছে। তবে তারা গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যে এবারকার যুদ্ধ থেকে দূরে রয়েছে।

আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ইরানের এই প্রক্সি-গোষ্ঠীটির এই নিষ্পৃহতা আসলে একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত, যাতে পরবর্তী কোনো ধাপে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ওপর আরও বড় চাপ তৈরি করা যায়।

ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র একযোগে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে আগ্রাসন চালিয়ে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনিকে হত্যা করে। ইরান, ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিগুলোয় পাল্টা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। এ যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল-গ্যাসের সরবরাহ অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় ভোগান্তিতে পড়েছে বিভিন্ন দেশ।

হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশে^ তেল-গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ পরিবহন করা হয়ে থাকে। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে উৎপাদিত তেলের ১২ শতাংশ ‘বাব আল-মানদাব’ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়।

ইরানের ফার্স নিউজের কাছে দেশটির ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) এক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, হুতি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গে ‘বাব আল-মানদাব’ বিষয়ে আইআরজিসির কথা হয়েছে। হুতি নেতারা এ ক্ষেত্রে ইরানকে পূর্ণ সহযোগিতা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

পাকিস্তান, মিসর ও তুরস্কের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতিতে যাওয়ার জন্য ডোনাল্ড ট্রাম্প এরই মধ্যে ইরানের পারমাণবিক সমরাস্ত্র তৈরির সক্ষমতা ত্যাগসহ ১৫ দফা দাবি তুলেছেন। অন্যদিকে, যুদ্ধবিরতিতে নারাজ স্পষ্টভাবে এ কথা জানিয়ে ইরান স্থায়ীভাবে যুদ্ধ বন্ধের জন্য পাঁচ দফা দাবি দিয়েছে।

দ্রুত আলোচনা চায় যুক্তরাষ্ট্র : ইরানকে আলোচনায় ফিরতে আবার হুমকি দিয়েছেন ট্রাম্প। গতকাল বৃহস্পতিবার তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেন, ‘বেশি দেরি হয়ে যাওয়ার আগেই (আলোচনার) বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে তাদের (ইরান)।’ তিনি বলেন, বেশি দেরি হয়ে গেলে ফেরার কোনো পথ নেই এবং এটি ভালো দেখাবে না।

আলোচনার সম্ভাবনা দেখছে আইএইএ : আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) অবশ্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরকারি পর্যায়ে সরাসরি আলোচনার সম্ভাবনার কথা বলছে। আগামী ২৯ মার্চের মধ্যে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে এ আলোচনা শুরু হতে পারে এমন দাবি করছে সংস্থাটি।

আইএইএ মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রেসি ইতালির একটি গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আলোচনার সম্ভাবনার কথা জানান। তিনি বলেন, এবারের সংলাপে চলমান যুদ্ধ, ইরানের পরমাণু প্রকল্প ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি, মধ্যপ্রাচ্যে সক্রিয় বিভিন্ন সশস্ত্র রাজনৈতিক গোষ্ঠী এবং ইরানের নিরাপত্তা নিশ্চয়তাসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে।

বাংলাদেশের জাহাজ হরমুজে চলবে : ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ নয়। ইরানের প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন দেশসহ কয়েকটি দেশের জাহাজকে কৌশলগত কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদে পারাপারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ, ভারত, চীন, ইরাক ও পাকিস্তান রয়েছে। শত্রুভাবাপন্ন নয়, এমন দেশগুলোর জাহাজকে আগাম তথ্য দিয়ে অনুমতি সাপেক্ষে এ প্রণালি পার হতে হবে। যুদ্ধের পরও এই প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে।

পারস্য উপসাগরের দেশগুলোর সংস্থা জিসিসি বলছে, হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়া ও প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর সরাসরি হামলার মাধ্যমে ইরান সব ধরনের ‘সীমারেখা’ (রেডলাইন) অতিক্রম করেছে। গতকাল রিয়াদে জিসিসির বৈঠকের পর সংস্থাটির মহাসচিব জাসেম মোহামেদ আল বুদাইওয়ি বলেন, হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সেখান দিয়ে চলাচলের ওপর শুল্ক আরোপ করা হয়েছে; যা জিসিসি দেশগুলোর ওপর সরাসরি আগ্রাসন এবং সমুদ্র আইন-সংক্রান্ত জাতিসংঘ চুক্তির স্পষ্ট লঙ্ঘন।

হামলার হুমকি অব্যাহত : যুক্তরাষ্ট্রে ও ইরানের মধ্যে আলোচনার এই আয়োজনের মধ্যেই আইআরজিসির নৌবাহিনী প্রধান রিয়ার অ্যাডমিরাল আলিরেজা তাংসিরিকে বিমান হামলায় হত্যা করার দাবি করেছে ইসরায়েল। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ এক ভিডিও বার্তায় এ দাবি করেন। কাৎজের দাবি, তাংসিরি হরমুজ প্রণালিতে মাইন পুঁতে রাখা ও জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়ার সঙ্গে জড়িত ছিলেন।

অন্যদিকে, ইরান গতকালও ইসরায়েলের কয়েকটি লক্ষ্যবস্তুতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে।

ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোর অবস্থান পারস্য উপসাগরের খারগ দ্বীপে। গোয়েন্দা তথ্যের উল্লেখ করে ইরান বলছে, ‘শত্রুরা’ দ্বীপটি দখলে নেওয়ার ষড়যন্ত্র করছে। এতে সহযোগিতা করছে উপসাগরের একটি দেশ, যা ইরানকে ক্ষুব্ধ করে তুলেছে।

ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, এ ধরনের প্রচেষ্টা হলেই উপসাগরের সংশ্লিষ্ট দেশটির ‘গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর’ ওপর লক্ষ্যভিত্তিক হামলা চালানো হবে। তবে তিনি দেশটির নাম বলেননি।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত