স্বাধীনতার ৫৫ বছর উদযাপন

বৈষম্যহীন মানবিক রাষ্ট্র গঠনের প্রত্যাশা

আপডেট : ২৭ মার্চ ২০২৬, ০১:২১ এএম

মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসের ৫৫তম বার্ষিকী উদযাপন করল জাতি। গতকাল গৌরবজ্জ্বল এই দিনে মুক্তিযুদ্ধে আত্মদানকারী শহীদদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও শোক নিবেদনের পাশাাপশি রাজনৈতিক হানাহানিমুক্ত, বৈষম্যহীন, মানবিক, শোষণমুক্ত, অসাম্প্রদায়িক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের প্রত্যাশায় দিবসটি উদযাপিত হয়। এদিন শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ভোর থেকে সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে লাখো মানুষের ঢল নামে।

গতকাল সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে তোপধ্বনির মধ্য দিয়ে শুরু হয় স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসের আনুষ্ঠানিকতা। ঢাকার তেজগাঁওয়ে পুরাতন বিমান বন্দর এলাকায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি আর্টিলারি রেজিমেন্টের ছয়টি গান ৩১ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে মহান স্বাধীনতাযুদ্ধে আত্মদানকারী বীর শহীদদের প্রতি গান স্যালুট প্রদর্শন করে। সব সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি ভবনে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। দিবসটি উপলক্ষে সারা দেশে দিনভর সরকারিভাবে, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন, পক্ষে কুচকাওয়াজ, র‌্যালি, আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, ফুটবল, ক্রিকেটসহ বিভিন্ন ক্রিড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়।

শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মার মাগফিরাত, জীবিত মুক্তিযোদ্ধাদের সুস্বাস্থ্য এবং দেশের শান্তি, সমৃদ্ধি ও অগ্রগতি কামনায় মসজিদে বিশেষ মোনাজাত করা হয়। পাশাপাশি মন্দির, গির্জা, প্যাগোডাসহ অন্যান্য উপাসনালয়েও বিশেষ প্রার্থনার আয়োজন করা হয়। এদিন সরকারি হাসপাতাল, কারাগার, সরকারি শিশুপরিবার, পুনর্বাসন কেন্দ্র ও বিভিন্ন কল্যাণ প্রতিষ্ঠানে বিশেষ খাবার বিতরণ করা হয়।

ভোর ছয়টার দিকে সাভারে জাতীয় স্মৃতিসৌধে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বীর শহীদদের প্রতি পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শহীদদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন তারা। সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর একটি চৌকস দল রাষ্ট্রীয় সালাম প্রদান করে। এ সময় বিউগলের করুণ সুর বাজানো হয়। প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, মন্ত্রিপরিষদ সদস্য, তিন বাহিনীর প্রধানরা, যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সদস্যরা, কূটনীতিক এবং রাজনৈতিক নেতাসহ উচ্চপদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তারা এ সময় উপস্থিত ছিলেন। পরে দলীয়প্রধান হিসেবে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে নিয়ে স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে বীর শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান। এ সময় মন্ত্রিপরিষদের পক্ষেও পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের আত্মার শান্তি এবং দেশ ও জাতির কল্যাণ কামনা করে দোয়া ও মোনাজাত করা হয়। পরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্মৃতিসৌধে উপস্থিত যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সদস্য এবং আমন্ত্রিত অতিথিদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন। শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্মৃতিসৌধের পরিদর্শন বইয়ে স্বাক্ষর করেন।

রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে জাতীয় স্মৃতিসৌধ সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। এ সময় রাজনীতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠক, বীর মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ পরিবারের সদস্য, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জানাতে আসেন। সরেজমিনে দেখা যায়, বিভিন্ন সংগঠন ও স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা হাতে ফুল, ব্যানার ও ফেস্টুন নিয়ে স্মৃতিসৌধ প্রাঙ্গণে আসছেন বীর সন্তানদের শ্রদ্ধা জানাতে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শ্রদ্ধায় ফুলে ফুলে ভরে ওঠে শহীদ বেদি।

মানিকগঞ্জ থেকে আসা স্কুলশিক্ষক রবিউল আলম বলেন, ‘প্রতিবছরই স্মৃতিসৌধে আসি। যাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা দেশ পেয়েছিলাম। তাদের কাছে আমরা চিরঋণী।’ কলেজপড়ুয়া তানজিন আফরোজা বলেন, ‘আমরা গর্বিত আমাদের শহীদদের জন্য। তাদের জীবনের বিনিময়ে পরিচিত হয়েছে এই বাংলাদেশ ও আমাদের মাতৃভূমি। তাই তাদের শ্রদ্ধা জানাই।’ এদিন সকালে প্রথম বারের মতো সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে বীর শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির আমির ও জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান ও অন্য কেন্দ্রীয় নেতারা স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জানাতে আসেন।

স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা জানানোর পর জাতীয় নাগরিক পার্টির (এসসিপির) আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, মহান স্বাধীনতা দিবস এবং জাতীয় দিবসে স্বাধীনতার সপক্ষে যারা ছিলেন, শহীদ হয়েছিলেন, বীরাঙ্গনা হয়েছেন তাদের শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি। তিনি বলেন, ‘আমাদের ৭১- এবং ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের যে আকাক্সক্ষা, সেই আকাক্সক্ষার ভিত্তিতে সাম্য এবং মানবিক মর্যাদার ভিত্তিতে এই বাংলাদেশ গড়তে চাই। সে জন্যই কাজ করছি।’ আমাদের স্বাধীনতার অনেক আকাক্সক্ষাই পূরণ হয়নি। যে কারণে নতুন প্রজন্মকে আবারও রক্ত দিতে হয়েছে, জীবন দিতে হয়েছে। আমরা চাই যে সামনে যাতে আর এমন না হয়।

দেড় যুগ পর কুচকাওয়াজ, সামরিক প্রদর্শনী : দীর্ঘ দেড় যুগ পর স্বাধীনতা দিবসে অনুষ্ঠিত হলো সশস্ত্র বাহিনীর বর্ণাঢ্য কুচকাওয়াজ ও সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শনী। সকাল ৯টায় রাজধানীর তেজগাঁওয়ে পুরাতন বিমানবন্দরের জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডে কুচকাওয়াজ শুরু হয়। এ সময় অভিবাদন মঞ্চ থেকে সালাম গ্রহণ করেন রাষ্ট্রপতি। সুসজ্জিত মোটর শোভাযাত্রাসহ ১০টার দিকে প্যারেড গ্রাউন্ডে উপস্থিত হন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। তাকে অভ্যর্থনা জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান, প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন, সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ নাজমুল হাসান, বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন ও মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের সচিব ইসরাত চৌধুরী। এর আগে সকাল ৯টা ৫৫ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্যারেড গ্রাউন্ডে পৌঁছান।

অনুষ্ঠানে মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতসহ দেশি-বিদেশি অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন। জাতীয় সংগীত পরিবেশনের পর সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক মো. সাহাবুদ্দিনকে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। খোলা জিপে প্যারেড পরিদর্শন করেন তিনি। পরে মার্চপাস্ট শুরু হয়।

মার্চপাস্টের পর ১০ হাজার ফুট উপর থেকে মূল মঞ্চের দুদিকে ২৬ জন প্যারাট্রুপার প্যারেড গ্রাউন্ডে নামেন, যারা জাতীয় পতাকাসহ বিভিন্ন বাহিনীর পতাকা বহন করেন। এরপর প্যারাকমান্ডো টিমের প্যারাট্রুপার দল রাষ্ট্রপতিকে সালাম প্রদর্শন করেন। একপর্যায়ে কুচকাওয়াজের অন্যতম আকর্ষণ বিমানবাহিনীর ‘অ্যারোবেটিক শো’র মহড়া শুরু হয়। ‘বাংলার আকাশ রাখিব মুক্ত’ এই প্রতিপাদ্যে বিমানবাহিনীর যুদ্ধ বিমানসহ প্রশিক্ষণ বিমান ও হেলিকপ্টারগুলো বিভিন্ন ফরম্যাশনে উড্ডয়ন কৌশল প্রদর্শিত হয়। পাঁচটি এফ-সেভেন যুদ্ধবিমান বর্ণিল রঙ ছাড়তে ছাড়তে প্যারেড গ্রাউন্ড প্রদক্ষিণ করে। কুচকাওয়াজ শেষে সশ্রস্ত্র বাহিনীকে শুভেচ্ছা জানান প্রধানমন্ত্রী।

জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার সমাধিতে প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা : স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সকালে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে দুজনের সমাধিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন তিনি। প্রথমে মন্ত্রিপরিষদের সদস্যদের নিয়ে সমাধিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পরে বিএনপি চেয়ারম্যান হিসেবে দলের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। পরে বিশেষ মোনাজাতে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী।

বঙ্গভবনে সংবর্ধনা অনুষ্ঠান : স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে বিকেলে বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও তার সহধর্মিণী ড. রেবেকা সুলতানা সংবর্ধনার আয়োজন করেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যোগ দেন। অনুষ্ঠানে মন্ত্রিপরিষদ সদস্য, বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনার, সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি, তিন বাহিনীর প্রধান, সংসদ সদস্য, শিক্ষাবিদ, ব্যবসায়ী নেতা, শিল্পী, বীর মুক্তিযোদ্ধা, বীরশ্রেষ্ঠদের পরিবারের সদস্যরা অংশ নেন।

বায়তুল মোকাররমে কোরআন খতম ও দোয়া : স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মার মাগফিরাত ও যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সুস্থতা কামনায় বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে কোরআন খতম ও বিশেষ দোয়া অনুষ্ঠিত হয়েছে। দুপুর ১২টায় হাফেজদের মাধ্যমে কোরআন তেলাওয়াত হয়। বাদ জোহর দোয়া অনুষ্ঠিত হয় দোয়া। ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক আ. ছালাম খান এ সময় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। মোনাজাত পরিচালনা করেন বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের সিনিয়র পেশ ইমাম মাওলানা মুহাম্মদ মিজানুর রহমান।

ঢাকেশ্বরী মন্দিরে বিশেষ প্রার্থনা : স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে মুক্তিযুদ্ধে বীর শহীদদের আত্মার শান্তি, দেশের উন্নয়ন ও সার্বিক মঙ্গল কামনায় রাজধানীর শ্রী শ্রী ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে বেলা সাড়ে ১১টায় বিশেষ প্রার্থনা হয়। ঢাকা মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির সভাপতি জয়ন্ত কুমার দেবের সভাপতিত্বে প্রার্থনা সভা পরিচালনা করেন ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরের পুরোহিত নিখিল চক্রবর্তী।

রাজধানীতে শিবিরের র‌্যালি : স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবস উপলক্ষে রাজধানীতে র‌্যালি করেছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র শিবির। র‌্যালিটি রাজধানীর বায়তুল মোকাররম মসজিদের উত্তর গেট থেকে শুরু হয়ে পল্টন, প্রেস ক্লাব ও মৎস্যভবন মোড় হয়ে শাহবাগে গিয়ে সংক্ষিপ্ত সমাবেশের মাধ্যমে শেষ হয়। শিবিরের ঢাকা মহানগর শাখার উদ্যোগে আয়োজিত হয় র‌্যালি ও সমাবেশ।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত