বৈদেশিক রিজার্ভে দুশ্চিন্তা বাড়ছে

আপডেট : ৩০ মার্চ ২০২৬, ১২:৪০ এএম

ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের কারণে সমগ্র বিশ্ব এক অস্থির ও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত অবস্থায় রয়েছে। বিশেষ করে নিজ নিজ দেশের অর্থনীতি নিয়ে। এই সংঘাত খুব শিগগির থামবে বলে মনে হয় না। এ কারণে উন্নয়নশীল দেশগুলো, বিশেষ করে যেসব দেশ আমদানিনির্ভর এবং জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল, তাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ হুমকির মুখে পড়তে পারে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে, খুব দ্রুত দেশে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকটে পড়বে এবং অর্থনীতি চাপে পড়বে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার দেশ ছাড়ার সময়, ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৮ লাখ ৩২ হাজার কোটি টাকা। পরবর্তী সময় এসব প্রকল্পের কাজ চলমান থাকায় অন্তর্বর্তী সরকার চলে যাওয়ার সময় দেশের মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ২৩ লাখ কোটি টাকায়। স্বাভাবিকভাবেই এই ঋণের ভার বহন করতে হচ্ছে বর্তমান সরকারকে। নতুন করে বড় কোনো প্রকল্প গ্রহণ করা যেমন কঠিন, তেমনি নতুন প্রকল্প না নিলেও সরকারের প্রতি জনগণের আস্থার সংকট তৈরি হতে পারে যা বর্তমান সরকারের জন্য ‘শাখের করাত’-এর মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। চলমান প্রকল্পগুলো সম্পন্ন করতে হবে, যে কারণে ঋণের পরিমাণ আরও বাড়বে।

পাশাপাশি ঋণের কিস্তি পরিশোধের দায়ও বর্তমান সরকারের ওপর বর্তাবে। একই সঙ্গে বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপের পাশাপাশি প্রবাসী আয়েও অনিশ্চয়তা দেখা দিচ্ছে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করছে। এর ফলে ডলারের সংকট চরম পর্যায়ে পৌঁছাবে বলে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন। কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, দেশের ইতিহাসে ২০২১ সালে ৪৮ বিলিয়ন ডলারের রেকর্ড উচ্চতা অবস্থান করে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। কিন্তু সেখান থেকে দ্রুত কমে অক্টোবর, ২০২৪ সালে রিজার্ভ একটি নিম্নমুখী অবস্থানে নেমে আসে। কারণ হিসেবে বলা হয়, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ, উচ্চ আমদানি ব্যয়, টাকার অবমূল্যায়ন যেখানে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১১ দশমিক ৬৫ শতাংশ কমেছে এবং ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হার ১২৬ টাকা ছাড়ানো ইত্যাদি। তবে আশার বাণী হলো, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত  গ্রস রিজার্ভ ৩৫ দশমিক শূন্য ৪ বিলিয়ন ডলার, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের হিসাবপদ্ধতি বিপিএম ৬ মান অনুযায়ী অবশ্য রিজার্ভের পরিমাণ হয় ৩০ দশমিক ৩০ বিলিয়ন ডলার। বর্তমান রিজার্ভ দিয়ে প্রায় ৫ থেকে ৬ মাসের আমদানি দায় মেটানো সম্ভব। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে সংকটের কারণে অর্থনীতিতে আসন্ন বিপদ সামলাতে দেশের রিজার্ভ ধরে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন দেশের শীর্ষ অর্থনীতিবিদরা। তারা আরও বলেন, ‘সংকট কতটা গভীর হবে, তা এখনো পরিষ্কার নয় এবং বৈশি^ক সংকট তীব্র হলে ডলার ও রিজার্ভের ওপর চাপ আসবে।’ চাপ কী পরিমাণ আসবে তা এখনো পরিষ্কার নয়। তবে এটি অনেকটাই স্পষ্ট যে, চাপ তীব্র হবে। এই চাপ মোকাবিলার জন্য আমাদের আগাম প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। অন্যথায় দেশ চরম বিপদের মুখে পড়বে। কারণ একদিকে টাকার অবমূল্যায়ন হবে, অর্থাৎ ডলারের দাম বৃদ্ধি পাবে; অপরদিকে জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধি পাবে। আর এই চাপ গিয়ে পড়বে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর। সুতরাং দেশের ব্যয় সংকোচন নীতি গ্রহণের পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি করা এবং বিশ্বব্যাংকসহ যত বিদেশি ঋণের প্রতিশ্রুতি রয়েছে, তা দ্রুত ছাড় করার উদ্যোগ নিতে হবে।

তেলের আমদানির জন্য ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (আইডিবি) থেকে বাড়তি ঋণ নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে, তবে তা যথেষ্ট বিবেচনার মাধ্যমে। সাধারণত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি পাওয়ার কারণ হলো দেশের মুদ্রার মান বৃদ্ধি পাওয়া, আমদানির পরিমাণ হ্রাস পাওয়া, রপ্তানির পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়া এবং প্রবাসী আয়ের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়া। তখনই বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি পায়। কিন্তু যুদ্ধের কারণে সব উপাদানই বিপরীত অবস্থায় বিরাজ করছে বা নিম্নমুখী হচ্ছে। অর্থাৎ রপ্তানির পরিমাণ কমে যাবে এবং আমদানির পরিমাণ একই অবস্থানে থাকবে। রপ্তানি কমে যাওয়ার পেছনে যে নিয়ামক কাজ করবে, তা হলো জ্বালানি সংকট। জ্বালানি সংকটের কারণে দেশে অস্থিরতা বিরাজ করবে। এর ফলে দেশে বিদ্যুতের ঘাটতি দেখা দেবে এবং যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিঘœ ঘটবে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই রপ্তানি ঘাটতিতে পড়বে দেশ। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার আয় কমবে, যা সরাসরি প্রভাব ফেলবে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর। ইতিমধ্যেই এ প্রেক্ষাপটে বেশ কিছু দেশ জ্বালানি সংরক্ষণে মিতব্যয়ী কার্যক্রম গ্রহণ করছে। যেমন শ্রীলঙ্কা, ফিলিপাইন প্রভৃতি দেশ বিদ্যুৎ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হচ্ছে। যদিও হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাংলাদেশের জাহাজ চলাচলে বাধা দেবে না ইরান, তবু সংকট তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সুতরাং দেশের সার্বিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে, এখনই সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি করতে হবে। প্রয়োজনে জ্বালানি তেলের দাম যৌক্তিক পর্যায়ে বৃদ্ধি করা যেতে পারে। কৃত্রিমভাবে দাম ধরে রেখে রিজার্ভের ওপর চাপ বৃদ্ধি করা সমীচীন হবে বলে মনে হয় না।

বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধিতে সবচেয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে প্রবাসী আয়। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের ভয়াবহতা তীব্র আকার ধারণ করছে। বাংলাদেশের শ্রমবাজারের সিংহভাগ মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর। সেই মধ্যপ্রাচ্যই যদি অস্থির হয়ে ওঠে, তাহলে এর প্রভাব সরাসরি পড়বে বাংলাদেশের প্রবাসী আয়ের ওপর। একদিকে নতুন করে প্রবাসী শ্রমিক নেওয়া কমবে, অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত বাংলাদেশের প্রবাসী শ্রমিকদের কর্মসংস্থান হারানোর সম্ভাবনা তৈরি হবে। পাশাপাশি ফ্লাইট-সংক্রান্ত জটিলতা দেখা দিতে পারে। সবকিছু মিলিয়ে বাংলাদেশের প্রবাসী আয় চরম ধাক্কা খাবে। এই প্রেক্ষাপটে সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোকে সক্রিয় এবং কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে। অনেক দেশ সঞ্চয় বৃদ্ধির দিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। বিশেষ করে জ্বালানি আমদানি হ্রাস এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন কমিয়ে তারা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ধরে রাখার চেষ্টা করছে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশকেও সার্বিক বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। তবেই বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি পাবে, যা দেশের সংকটময় মুহূর্তে কাজে দেবে।

লেখক : ব্যাংকার ও কলামিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত