স্বল্পোন্নত দেশের পর্যায় (এলডিসি) থেকে উত্তরণের পর একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বিশেষ সুবিধা অব্যাহত রাখার জন্য সংশ্লিষ্টদের আহ্বান জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। এ সুবিধার ফলে দেশগুলোয় অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকে। গত ২৮ মার্চ চলমান বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার মন্ত্রিপর্যায়ের সম্মেলনের তৃতীয় দিন বাণিজ্যমন্ত্রী দিনব্যাপী বিভিন্ন থিম্যাটিক সেশনে অংশ নিয়ে বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার সংস্কারসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরে এ কথা বলেন। এ সময় তিনি এমসি১৪-সংক্রান্ত প্যাকেজ গ্রহণের আহ্বান জানান।
আব্দুল মুক্তাদির বলেন, একটি কার্যকর, পূর্বানুমেয় এবং নিয়মভিত্তিক বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। তিনি দ্রুত পূর্ণাঙ্গ ও দুস্তরের ডিসপিউট সেটেলমেন্ট সিস্টেম পুনঃপ্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান, যেখানে অ্যাপিলেট বডির কার্যক্রম পুনরুজ্জীবিত করা প্রয়োজন। তিনি উল্লেখ করেন, উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোর স্বার্থ রক্ষায় একটি শক্তিশালী এবং নিরপেক্ষ ব্যবস্থা অপরিহার্য।
মৎস্য খাতে ভর্তুকি বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান উল্লেখ করে তিনি বলেন, ক্ষতিকর ভর্তুকিতে দেশের অবদান প্রায় শূন্যের কাছাকাছি, যেখানে বৃহৎ মৎস্য আহরণকারী দেশগুলো বড় অংশীদার। বাণিজ্যমন্ত্রী ক্ষতিকর ভর্তুকির ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপের পাশাপাশি স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বিশেষ এবং পৃথক সুবিধা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক জেলেদের সম্পূর্ণ অব্যাহতি দেওয়ার আহ্বান জানান, যাতে ন্যায্যতা ও টেকসইতা বজায় থাকে।
সম্মেলনে বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ফ্যাসিলিটেশন ফর ডেভেলপমেন্ট অ্যাগ্রিমেন্ট-এ ১২৯তম সদস্য হিসেবে যোগ দেওয়ার ঘোষণা দেয়। এটি ডব্লিউটিও কাঠামোর অধীনে বাংলাদেশের প্রথম কোনো বহুপক্ষীয় চুক্তিতে অংশগ্রহণ। বাণিজ্যমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, এই উদ্যোগ বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নে সহায়ক হবে এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে ইতিবাচক বার্তা দেবে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, কোরিয়া, যুক্তরাজ্য, হংকংসহ বিভিন্ন দেশ বাংলাদেশের এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানায়।
কৃষি খাত প্রসঙ্গে বাণিজ্যমন্ত্রী খাদ্য নিরাপত্তা, জীবিকা ও দারিদ্র্যবিমোচনে কৃষির গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি পাবলিক স্টকহোল্ডিং, বিশেষ সুরক্ষাব্যবস্থা এবং উন্নত দেশগুলোর বাণিজ্য বিকৃতকারী ভর্তুকির মতো দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত বিষয়গুলো দ্রুত সমাধানের আহ্বান জানান। তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন যে, কৃষি আলোচনায় বিশেষ ও পৃথক সুবিধা (এসঅ্যান্ডডিটি) অবশ্যই কেন্দ্রীয় অবস্থানে থাকতে হবে।
স্বল্পোন্নত দেশ প্যাকেজ বিষয়ে বাংলাদেশ দৃঢ় সমর্থন জানিয়ে টেকসই উত্তরণের গুরুত্ব তুলে ধরে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, এলডিসি থেকে উত্তরণের পর একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বিশেষ সুবিধা অব্যাহত রাখা প্রয়োজন, যাতে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকে। তিনি এমসি১৪-এ এই প্যাকেজ গ্রহণের আহ্বান জানান।
বাংলাদেশ টিআরআইপিএস চুক্তির আওতায় নন-ভায়োলেশন ও সিচুয়েশনাল কমপ্লেইন্টসের ওপর মোরাটোরিয়াম পরবর্তী মন্ত্রিপর্যায়ের সম্মেলন পর্যন্ত অব্যাহত রাখার পক্ষে মত দেয়। বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, এ ধরনের অভিযোগ উন্নয়নশীল দেশগুলোর নীতিগত স্বাধীনতা, বিশেষ করে জনস্বাস্থ্য ও শিক্ষার ক্ষেত্রে, ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তাই স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করা জরুরি।
বাণিজ্যমন্ত্রী আরও বলেন, ডব্লিউটিওর সংস্কার প্রক্রিয়া অবশ্যই এর মৌলিক নীতিমালা স্বচ্ছতা, অন্তর্ভুক্তিমূলকতা ও ন্যায্যতার ওপর ভিত্তি করে হতে হবে। এসব নীতির প্রতি প্রতিশ্রুতি বজায় রাখলেই বহুপক্ষীয় বাণিজ্য ব্যবস্থায় আস্থা ও বিশ্বাসযোগ্যতা অটুট থাকবে।
তিনি পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, বাংলাদেশ একটি ন্যায্য, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও উন্নয়নমুখী বহুপক্ষীয় বাণিজ্য ব্যবস্থার প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এমসি১৪-এর ফল ভবিষ্যৎ সংস্কারের দিকনির্দেশনা দেবে এবং বাংলাদেশ উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোর স্বার্থ রক্ষায় ডব্লিউটিও প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত থাকবে।
