নিজ ভাষণে পলায়নপর ট্রাম্প!

আপডেট : ০৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:২২ এএম

ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এক মাসের বেশি সময় ধরে চলা এই সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যে ক্রমশ বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। এমনকি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তার প্রশাসনের অনেক শীর্ষ কর্মকর্তার বক্তব্য ‘সাংঘর্ষিক’ হয়ে উঠছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলার মধ্য দিয়ে সূত্রপাত হওয়া এই যুদ্ধের পর ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথমবার জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে চোখ ছিল বিশ্ববাসীর। তবে গত বুধবাবের সেই ভাষণে যুদ্ধ বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্যের কথা বলতে পারেননি ট্রাম্প। কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন এই ভাষণ ছিল ট্রাম্পের জন্য যুদ্ধের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রে জনমত গড়ার একটি সুযোগ, কিন্তু তিনি সেটি কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছেন। তাদের মতে, ২০ মিনিটের এই ভাষণ, পরিকল্পনাহীন নেতার জবানবন্দি ছাড়া আর কিছুই নয়।

সবচেয়ে বড় বিশ্লেষণ যা উঠে এসেছে, তা হলো ভাষণের মৌলিক নতুনত্বের অভাব। জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির মধ্যপ্রাচ্য রাজনীতির সহকারী অধ্যাপক সিনা আজোদি বলেন, ‘আমি ভাষণের কোনো মূলকেন্দ্র ধরতে পারিনি’। এটি গত ৩০ দিনে তিনি যা টুইট করেছেন, প্রায় কালানুক্রমিকভাবে সেগুলোর পুনরাবৃত্তি মাত্র। কোয়েনসি ইনস্টিটিউটের ত্রিতা পার্সি আরও কঠোর। ভাষণের মূল্যায়নে তিনি বলেছেন এতে নতুন কিছু না থাকায় বোঝা যায়, ট্রাম্পের আসলে কোনো পরিকল্পনাই নেই। ভাষণটি ছিল ইরানের সাম্প্রতিক পাল্টা হামলার জবাব দেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা। তিনি আরও বলেন, এই ‘কৌশলগত শূন্যতা’ ইঙ্গিত দেয় যে হোয়াইট হাউজ যুদ্ধ শেষ করার কোনো বাস্তব কূটনৈতিক বা সামরিক রোডম্যাপ তৈরি করতে পারেনি। ইরানি হামলা ট্রাম্পের ‘জয়ের’ দাবিকে ভুয়া প্রমাণ করছে। ট্রাম্প তার ভাষণে ইরানকে পারমাণবিক হামলার হুমকি ও যুক্তরাষ্ট্রের সেনা হত্যার অভিযোগ এনে যুদ্ধের পক্ষে আমেরিকানদের সমর্থন চান। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। ইয়োগাভ জরিপ বলছে, মাত্র ২৮ শতাংশ জনগণ, এর মধ্যে রিপাবলিকান ৬১ শতাংশ এই যুদ্ধ সমর্থন করেন। গত ২ মার্চ এই সমর্থন ছিল রিপাবলিকানদের মধ্যে ৭৬ শতাংশ। ট্রাম্পের নিজের ভোট ব্যাংক থেকেই সমর্থন কমে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ। কারণ যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর জ্বালানির দাম গ্যালনপ্রতি ৪ ডলার ছাড়িয়েছে, যা ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় মূল্যস্ফীতি আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ত্রিতা পার্সি বলছেন, ট্রাম্প সমর্থকরা গ্যাস স্টেশন ও মুদির দোকানে ইরান যুদ্ধের মাশুল দিচ্ছেন। আর তা বাড়তেই থাকবে। ট্রাম্পের ‘সাময়িক মূল্যবৃদ্ধি’ দাবি বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

বিশ্লেষকদের কাছে আরেকটি বড় বিস্ময় হলো, ভাষণে আলোচনা বা কূটনীতির কোনো উল্লেখ না থাকা। গত কয়েক দিনে ট্রাম্প বেশ কয়েকবার দাবি করেছেন, ইরানের প্রেসিডেন্ট যুদ্ধবিরতি চেয়েছেন এবং আলোচনা চলছে। ট্রাম্পের ভাষণে কূটনীতির এই বাদ পড়া ইঙ্গিত দেয় যে হয় আলোচনা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে, নয়তো ট্রাম্পের আগের দাবিগুলো ভিত্তিহীন ছিল। ভাষণে কূটনীতি উল্লেখ না করে কেবল সামরিক হুমকি দিয়ে তিনি কার্যত স্বীকার করে নিয়েছেন, তিনি যে ‘চুক্তি’ করার কথা বলতেন, তা বাস্তব নয়। এটি যুদ্ধের একটি বিপজ্জনক মোড়, এখন কেবল সংঘাত বাড়ানোর পথ খোলা রাখা। ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানে ‘শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন’ ঘটে গেছে। কারণ সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ও শীর্ষ কমান্ডাররা নিহত হয়েছেন। কিন্তু ন্যাশনাল ইরানি আমেরিকান কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট জামাল আবদি বলেন, ট্রাম্প শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন করতে পারেননি; বরং তিনি শাসনের সবচেয়ে কট্টর অংশটিকে ক্ষমতায় আরও পাকাপোক্ত করেছেন। প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন তার ছেলে মোজতাবা খামেনি, আইআরজিসি যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে। ট্রাম্পের ভাষণের পরপরই ইরান ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে, যা প্রমাণ করে যে ইরানের সামরিক সক্ষমতা শেষ হয়নি।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ‘শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন’ এর দাবি দিয়ে ট্রাম্প দুই পাখি এক ঢিলে মারতে চেয়েছেন; একদিকে বিজয়ের আবহ তৈরি করা, অন্যদিকে ইরানের অভ্যন্তরীণ পতনের গুজব ছড়িয়ে যুদ্ধের বিরুদ্ধে যারা আওয়াজ তোলেন, তাদের দাবি খণ্ডন করা। কিন্তু বাস্তব ঘটনাপ্রবাহ এই দাবিকে ভিত্তিহীন প্রমাণ করছে। ট্রাম্প স্বীকার করেছেন জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি। কিন্তু সমাধান হিসেবে বলেছেন, উপসাগরীয় তেলনির্ভর দেশগুলো যেন নিজেরা প্রণালিটি রক্ষা করে। তিনি বলেন, দেরিতে হলেও তোমরা নিজেরা সাহস সঞ্চয় কর। এটি একটি অস্বাভাবিক ও কূটনৈতিকভাবে দুর্বল সমাধান। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল একতরফা যুদ্ধ শুরু করেছে। এখন সেই যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট সংকট সমাধানের দায়িত্ব অন্য দেশের দেওয়া অযৌক্তিক। এ ছাড়া, এই বক্তব্য দিয়ে ট্রাম্প কার্যত মিত্র দেশগুলোর সমালোচনা করলেন, যাদের সহযোগিতা ছাড়া হরমুজ প্রণালি খোলা কার্যত অসম্ভব। এটি যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বের সংকটকেই ফুটিয়ে তোলে।

ট্রাম্প আবারও ইরানের বৈদ্যুতিক গ্রিড ধ্বংস করার হুমকি দিয়েছেন ভাষণে, যা সরাসরি যুদ্ধাপরাধ। আন্তর্জাতিক আইনে বেসামরিক স্থাপনা ধ্বংস নিষিদ্ধ। ইরান হুঁশিয়ারি দিয়েছে, তাহলে তারা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলা চালাবে। সিনা আজোদি এই হুমকিকে ‘নিয়মতান্ত্রিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার মৃত্যু’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ট্রাম্পের এই হুমকি এবং ইরানের পাল্টা হুমকি ইঙ্গিত দেয় এই যুদ্ধ আর কেবল সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটি একটি ‘সর্বগ্রাসী যুদ্ধে’ রূপ নিতে পারে, যার ভুক্তভোগী হবে সাধারণ মানুষ। এই ভাষণের মাধ্যমে ট্রাম্প যুদ্ধের ‘জয়’ ঘোষণা করে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণের চেষ্টা করেছেন, কিন্তু বাস্তবে তিনি একটি অনিশ্চিত ও দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের দিকে পা বাড়িয়েছেন, যেখানে তার হাতে নেই কোনো বাস্তব সমাধান, আছে কেবল ‘ইরানকে প্রস্তর যুগে ফিরিয়ে দেওয়ার’ অবাস্তব হুমকি।

পেজেশকিয়ানের খোলা চিঠি : ট্রাম্পের ভাষণের আগে যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের উদ্দেশে এক খোলা চিঠি লিখেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। সেখানে তিনি প্রশ্ন রেখেছেন ইরানের বিরুদ্ধে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের যুদ্ধ কি সত্যিই ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতিকে এগিয়ে নিচ্ছে? গত বুধবার সন্ধ্যায় সামাজিকমাধ্যম এক্সে তিনি এই চিঠি প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি লিখেছেন, এই যুদ্ধের মাধ্যমে আমেরিকান জনগণের ঠিক কোন স্বার্থ রক্ষা করা হচ্ছে? চিঠিতে পেজেশকিয়ান বলেন, আধুনিক ইতিহাসে ইরান কখনোই আগ্রাসন, সম্প্রসারণবাদ, উপনিবেশবাদ বা আধিপত্যের পথ বেছে নেয়নি এবং কোনো যুদ্ধও শুরু করেনি। তার ভাষায়, ইরানকে হুমকি হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে ‘ক্ষমতাবানদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক খামখেয়ালির ফল’। উপসাগরীয় অঞ্চলে বেসামরিক ও সামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে ইরানের প্রতিদিন ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মতো পদক্ষেপকে তিনি ‘বৈধ আত্মরক্ষা’ হিসেবেও উল্লেখ করেছেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত