কথাই রাখে না হজ এজেন্সিগুলো

আপডেট : ০৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১৭ এএম

‘সারা জীবনের জমানো ৫ লাখ টাকা তুলে দিয়েছিলাম এজেন্সির হাতে। বলেছিল কাবা শরিফের পাশেই হোটেলে রাখা হবে, দুই বেলা ভালো খাবার আর সার্বক্ষণিক গাইড থাকবে। কিন্তু মক্কায় গিয়ে দেখি আমাদের রাখা হয়েছে শহর থেকে ৫ কিলোমিটার দূরে এক জীর্ণ দালানে। দুই দিন আমাদের না খেয়ে কাটাতে হয়েছে। এজেন্সির মালিককে ফোন দিলে তিনি উল্টো ধমক দিয়ে বলেন, বেশি কথা বললে পথেই ফেলে রেখে যাব।’ চোখের পানি মুছতে মুছতে এসব কথা বলছিলেন নরসিংদী থেকে মক্কায় আসা ষাটোর্ধ্ব আমেনা খাতুন। এমনটা কেবল আমেনা খাতুনের সঙ্গেই ঘটেছে তা নয়, প্রতি বছর শত শত হাজি এমন চরম প্রতারণার শিকার হচ্ছেন এক শ্রেণির অসাধু হজ এজেন্সির হাতে।

তদন্তে দেখা গেছে, অনেক এজেন্সি ‘বাজেট হজ’ বা ‘সাশ্রয়ী প্যাকেজ’-এর নামে সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করে। কিন্তু টাকা জমা নেওয়ার পর শুরু হয় আসল খেলা। প্রাথমিক প্যাকেজের বাইরেও ‘হজ ফি বৃদ্ধি’, ‘রিয়াল সংকট’ বা ‘সৌদি ট্যাক্সের’ দোহাই দিয়ে শেষ মুহূর্তে যাত্রীপ্রতি ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা অতিরিক্ত দাবি করা হয়। আবার টাকা নিলেও এজেন্সিগুলো সময়মতো টিকিট না কাটায় হজে যাওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়ে অনেকেরই। ওমরার ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটছে। চুক্তিতে ‘মারকাজিয়া’ বা কাবার নিকটবর্তী হোটেলে রাখার কথা থাকলেও হাজিদের রাখা হয় আজিজিয়া বা মিসফালাহ এলাকার দূরবর্তী পাহাড়ের ওপর। হাজিদের নিয়ম-কানুন শেখানোর জন্য অভিজ্ঞ ‘মোয়াল্লিম’ বা গাইডদেওয়ার কথা থাকলেও অনভিজ্ঞ মৌসুমি কর্মী দিয়ে কাজ চালানো হয়।

এজেন্সির মালিকরা মিলে সিন্ডিকেট : অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, কিছু প্রভাবশালী এজেন্সির মালিকরা মিলে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট তৈরি করেছে। তারা সরকারি কোটা ও বেসরকারি ব্যবস্থাপনার মধ্যে এক ধরনের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে মুনাফা লুটে নিচ্ছে। সম্প্রতি ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, কিছু প্রতারক চক্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদিত হজ ও ওমরাহ এজেন্সি না হয়েও বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে হজ ও ওমরাহ প্যাকেজ ফেইসবুক ও ইউটিউবে প্রচার করে যাত্রীদের আকৃষ্ট করছে। এতে হজ ও ওমরাহ যাত্রীরা প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে ওমরাহ পালন করতে যাওয়া হাজার হাজার যাত্রী আটকা পড়েছেন। আকাশপথ অনিরাপদ হয়ে পড়ায় অনেক ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। এতে করে চরম ভোগান্তির শিকার যাত্রীরা।

প্রতারণা করে কোটি কোটি টাকা লুটের অভিযোগ : সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, প্রতিবছরই বাড়ছে হজ ও ওমরাহ যাত্রী। এই সুযোগে প্রতারণা করে হাজিদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে প্রতারক চক্র। কিন্তু এসব চক্রের মূল হোতাদের দৃশ্যমান কোনো শাস্তির আওতায় আনতে পারছে না সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। প্রতারকদের খুঁজেও পায় না পুলিশ। পুরো অর্থ দিয়ে অনেকে যেতে পারেন না। আবার যারা যেতে পারেন, তাদের দুর্বিসহ দিন কাটাতে হয়। হজে নেওয়ার আগে যেসব সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার কথা বলে তার সিকিআনাও দেওয়া হচ্ছে না।

গত বছরের ৭ সেপ্টেম্বর ক্যাপ্টেন ফরিদুল আলম ধর্ম মন্ত্রণালয়ে একটি অভিযোগ দিয়ে বলেন, খান ট্রাভেলস সার্ভিস নামে একটি এজেন্সিকে ভিআইপি প্যাকেজে (২০ দিন মেয়াদি) চারজন মিলে জনপ্রতি ১৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা দেওয়া হয়। পুরো টাকা দেওয়ার পরও এজেন্সির লোকজন তাদের সাধারণ একটি বাসে জেদ্দা থেকে মক্কায় নিয়ে যায়। মক্কায় দুপুরের খাবারও দেওয়া হয়নি। হোটেলে সাধারণ হজযাত্রীদের সঙ্গে নানা ভোগান্তি সৃষ্টি করে মিনায় নেওয়া হয়। মদিনায় পাঁচ তারকা হোটেলের পরিবর্তে নিম্নমানের হোটেলে রাখে। এমনকি এজেন্সির কোনো প্রতিনিধিও ছিলেন না। হোটেলে ছিল না কোনো এসি, বাথরুমে ছিল না গরম পানি। নাস্তা খেতে গিয়ে হোটেল কর্মচারীদের হাতে বিড়ম্বনার শিকার হতে হয়েছে। নিজের টাকা দিয়ে বিমান টিকিট পর্যন্ত কিনতে হয়েছে।

প্রায় একই ঘটনা ঘটেছে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান ও তার পরিবারের সঙ্গে। পরিবারের পাঁচ সদস্য চলতি বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি শাহীন নামে এক ব্যক্তির মাধ্যমে ওমরা হজ করতে যান। খাওয়া-দাওয়াসহ জনপ্রতি ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা দিয়েছেন। যদিও শাহীনের লাইসেন্সকৃত কোনো এজেন্সি নেই বলে জানান মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, ‘কোনো কথা ও কাজে মিল রাখেননি শাহীন। মসজিদুল হেরাম ও মসজিদুল নববীর কাছেই হোটেল ঠিক করার কথা ছিল। কিন্তু অনেক দূরে হোটেলে রাখা হয়। ফলে সময়মতো হেরাম ও নববীতে আসতে পারিনি। পরিবহন ও খাবার খরচও দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তাও তিনি করেননি। সবকিছুই আমাদের টাকা দিয়ে করতে হয়েছে। এক কথায় আমরা প্রতারণার শিকার হয়েছি। মার্কিন-ইসরাইল ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ চলাকালীন জেদ্দায় আটকা পড়ি। নিজের টাকায় বিমান টিকিট ক্রয় করে দেশে আসতে হয়েছে। এখানেও তিনি কোনো ধরনের সহায়তা করেননি।’ ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন,  ‘এজেন্সি বা মোয়াল্লেমরা হাজিদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক প্রতারণা করলেও সরকার কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। ফলে তারা বেপরোয়া হয়ে ওঠে। মানুষকে মানুষ মনে করেন না তারা।’

গাদাগাদি করে রাখা হচ্ছে হাজিদের : সরেজমিন দেখা গেছে, হজ বা ওমরাহ যাত্রীদের মক্কা বা মদিনায় নেওয়ার পর রাখা হয় অত্যন্ত নিম্নমানের ঘরে গাদাগাদি করে। কাবা শরিফের কাছে বাড়ি ভাড়ার কথা বলে তাদের রাখা হয় দূরবর্তী কোনো স্থানে। গাড়ির কথা বললেও সেখানে গাড়ি দেওয়া হয় না। ফলে বয়স্ক হাজিদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী গাইড দেওয়া হয় না।

গত বছর রংপুরের একটি এজেন্সি ৭৫ জন হজযাত্রীর কাছ থেকে ৩ কোটি টাকা নিয়েছে। একইভাবে আরেকটি প্রতিষ্ঠান ৪৪৮ হজযাত্রীকে নিবন্ধন করে মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। দুটি হজ এজেন্সির মালিক ওই যাত্রীদের টাকা নিয়ে সটকে পড়েন। ওই প্রতিষ্ঠানের মালিকের বিরুদ্ধে নামমাত্র ব্যবস্থা নেওয়া হলেও অন্য প্রতিষ্ঠানের মালিকের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ধর্ম মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, হজ ও ওমরা  নিয়ে হজ এজেন্সিগুলোর প্রতারণার ঘটনা বাড়ছে। কতিপয় অসাধু এজেন্সির মালিকের দুর্নীতি-প্রতারণা ও অপতৎপতার কারণে সুষ্ঠু হজব্যবস্থা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। কোনো দুর্নীতি, অনিয়ম ও প্রতারণা বরদাশত করা হবে না বলে কিছুদিন আগে সংশ্লিষ্টদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।

‘কালো’ তালিকার এজেন্সিগুলো ভিন্ন নামে মাঠে : গত কয়েক বছরে অনিয়মকারী শতাধিক এজেন্সিকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে কিছু এজেন্সির লাইসেন্স স্থগিত করা হলেও তারা ভিন্ন নামে বা আত্মীয়স্বজনের নামে নতুন লাইসেন্স নিয়ে আবার মাঠে নেমেছে। কয়েকজন হাজি বলেন, প্রতারণা ঠেকাতে হলে সৌদি আরবে বাংলাদেশ হজ মিশনের পক্ষ থেকে কঠোর তদারকি নিশ্চিত করতে হবে, নগদ লেনদেনের বদলে সরাসরি ব্যাংকের মাধ্যমে লেনদেন এবং ট্র্যাকিং সিস্টেম চালু করতে হবে, প্রতারক এজেন্সির লাইসেন্স আজীবনের জন্য বাতিল এবং মালিকের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে হাজিদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার উদ্যোগ নিতে হবে।

সঞ্চয়ের জমা টাকা নিয়ে যায় প্রতারক এজেন্সি : প্রতি বছর হাজার হাজার ধর্মপ্রাণ মুসলমান তাদের সারা জীবনের সঞ্চয় জমা দেন আল্লাহর ঘর জিয়ারতের আশায়। কিন্তু এক শ্রেণির অসাধু হজ এজেন্সির কারণে সেই পবিত্র স্বপ্ন অনেক সময় দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়। রাজশাহীর ষাটোর্ধ্ব কৃষক আব্দুর রহিম নিজের শেষ সম্বল জমিটুকু বিক্রি করেছিলেন হজে যাওয়ার জন্য। একটি নামি এজেন্সিকে দিয়েছিলে মোটা অঙ্কের টাকা। তাকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল ‘এ’ ক্যাটাগরির হোটেলে রাখার, যা হবে হারাম শরিফের খুব কাছে। কিন্তু মক্কায় পৌঁছে তিনি দেখলেন, তার আবাসন হয়েছে জনশূন্য এক পাহাড়ের ওপর, যা কাবাঘর থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে। তার মতো হাজারও হাজি এমন পরিস্থিতির শিকার হচ্ছেন।

চেনা রূপ বদলে ফেলেন এজেন্সির মালিকরা : এজেন্সির মালিকরা দেশে থাকাকালীন যে বিনয়ী ও ধর্মপ্রাণ রূপ দেখান, সৌদি আরবে পৌঁছে তারা যেন চেনা রূপ বদলে ফেলেন। কম টাকায় লাক্সারি প্যাকেজের লোভ দেখিয়ে যাত্রীদের অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন। মক্কায় কাবার কাছে হোটেলের কথা বলে দূরে রাখে প্রায়ই এজেন্সি। এমনকি এক রুমে চারজনের কথা বলে ৮ থেকে ১০ জনকে রাখা হচ্ছে। চুক্তিতে ভালো মানের দেশি খাবারের কথা থাকলেও অনেক সময় নিম্নমানের খাবার পরিবেশন করা হয়। শেষ মুহূর্তে টিকিট না দিয়ে হাজিদের বিমানবন্দরে বসিয়ে পর্যন্ত রাখা হচ্ছে।

ডিজিটালের নামে ফাঁকফোকর : বর্তমানে হজ ব্যবস্থাপনা অনেক বেশি ডিজিটাল হলেও দুর্নীতির ফাঁকফোকর রয়ে গেছে। অনেক এজেন্সি ‘কোরবানি’ বা ‘অতিরিক্ত ফি’র নামে হাজিদের কাছ থেকে রসিদ ছাড়াই বাড়তি ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়। এ ছাড়া প্যাকেজ মূল্য বাড়ানোর অজুহাতে শেষ মুহূর্তে হাজিদের জিম্মি করা হয়। যারা টাকা দিতে পারেন না, তাদের হজে যাওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। ধর্ম মন্ত্রণালয় প্রতিবছর কিছু এজেন্সিকে জরিমানা করে এবং লাইসেন্স বাতিল করে। কিন্তু দেখা যায়, একই মালিক অন্য নামে নতুন লাইসেন্স বের করে আবার ব্যবসা শুরু করে। আইনের এই ফাঁক গলে বের হয়ে যাওয়াই তাদের সাহস বাড়িয়ে দেয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত