অপরিশোধিত জ্বালানির ঘাটতিতে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় তেল পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল) সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনায় সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যাহত হওয়ায় এই সংকটের মুখে পড়েছে জ্বালানি খাত। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হলেও স্বল্পমেয়াদে বড় ধরনের জ্বালানি সংকটের ঝুঁকি আপাতত সীমিত।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ৩১ মার্চ সকাল পর্যন্ত ইআরএলে অপরিশোধিত তেলের মজুদ নেমে এসেছে মাত্র ২৩ হাজার টনে, যা দিয়ে সর্বোচ্চ এক সপ্তাহ উৎপাদন চালানো সম্ভব। নতুন চালান না এলে ৭ এপ্রিলের মধ্যেই পরিশোধন কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যেতে পারে। সর্বশেষ গত ১৮ ফেব্রুয়ারি দেশে অপরিশোধিত তেলের চালান আসে; এরপর নতুন কোনো জাহাজ না পৌঁছায় মজুদ দ্রুত কমে গেছে।
জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহে সংকট প্রকট হতে পারে। প্রয়োজনে কিছু সময়ের জন্য পরিশোধন কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হতে পারে। তবে একই সঙ্গে তারা জনসাধারণকে আতঙ্কিত না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
এদিকে জরুরি জ্বালানি চাহিদা পূরণে ১৭ লাখ টন বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি তেল আমদানি করবে সরকার। শনিবার সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির ভার্চুয়াল সভায় এসব প্রস্তাব তুলে ধরা হবে
বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, ইআরএল বন্ধ হলেও তাৎক্ষণিকভাবে দেশের জ্বালানি সরবরাহে বড় ধাক্কা লাগার সম্ভাবনা কম। কারণ, বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থা মূলত পরিশোধিত তেল আমদানিনির্ভর। ইআরএল দেশের মোট জ্বালানির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এবং ডিজেলের মাত্র এক-ষষ্ঠাংশ সরবরাহ করে। ফলে আমদানি স্বাভাবিক থাকলে বাজারে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা কম।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে মাসে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ টন ডিজেলের চাহিদা রয়েছে। এর বিপরীতে এপ্রিল মাসের জন্য আমদানির মাধ্যমে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার টন ডিজেল নিশ্চিত হয়েছে এবং আরও ৬০ হাজার টনের প্রক্রিয়া চূড়ান্তের পথে। পাশাপাশি ডিপোগুলোতে প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার টন মজুদ রয়েছে। সব মিলিয়ে মোট সরবরাহ চাহিদার প্রায় ৮৬ শতাংশ পূরণ করতে সক্ষম।
পেট্রোল ও অকটেনের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল। দেশে মাসে পেট্রোলের চাহিদা প্রায় ৩০ থেকে ৩২ হাজার টন, যা প্রায় পুরোপুরি দেশীয় কনডেনসেট প্রক্রিয়াজাত করেই পূরণ করা হয়। সিলেটের সরকারি প্ল্যান্ট থেকে প্রায় ১২ হাজার টন এবং বেসরকারি প্ল্যান্টগুলো থেকে আরও ১৮ থেকে ২০ হাজার টন পেট্রোল সরবরাহ আসে। ফলে পেট্রোলের ক্ষেত্রে ইআরএলের ভূমিকা সীমিত এবং এটি বন্ধ হলেও তাৎক্ষণিক বড় প্রভাব পড়ার আশঙ্কা নেই।
অন্যদিকে, অকটেনের মাসিক চাহিদা প্রায় ৩৫ হাজার টন। এর মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশ দেশীয়ভাবে উৎপাদিত হয় এবং বাকি ৬০ শতাংশ আমদানি করতে হয়। এখানে ইআরএল সরাসরি বড় উৎপাদক না হলেও ন্যাফতা সরবরাহের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কারণ, কনডেনসেটের সঙ্গে ন্যাফতা মিশিয়ে অকটেন উৎপাদন করা হয়।
ইআরএল মাসে প্রায় ২ লাখ টন অপরিশোধিত তেল পরিশোধন করে, যেখান থেকে ন্যাফতাসহ বিভিন্ন উপাদান উৎপাদিত হয়। ফলে রিফাইনারি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে ন্যাফতার ঘাটতি তৈরি হয়ে পেট্রোল ও অকটেন উৎপাদনে চাপ বাড়তে পারে এবং আমদানিনির্ভরতা বৃদ্ধি পাবে।
তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে পেট্রোল ও অকটেনের সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। সম্প্রতি ২৫ হাজার টন অকটেনবাহী একটি জাহাজ দেশে পৌঁছেছে এবং আরও একটি চালান আসার কথা রয়েছে। এতে করে দেড় মাসের বেশি সময়ের চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে, তিনটি তেলবাহী জাহাজ দেশের পথে রয়েছে বলে জানা গেছে, যদিও পৌঁছানোর সময় এখনো অনিশ্চিত। কর্মকর্তাদের আশা, এসব চালান সময়মতো এলে ইআরএলের উৎপাদন দ্রুত স্বাভাবিক হবে।
সব মিলিয়ে, মজুদ তলানিতে নেমে এলেও এবং পরিশোধন কার্যক্রম বন্ধের শঙ্কা তৈরি হলেও আমদানি, দেশীয় কনডেনসেট প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থার কারণে আপাতত বড় ধরনের জ্বালানি সংকটের ঝুঁকি কম বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অবৈধ মজুদবিরোধী অভিযানে ৩ লাখ ৭২ হাজার লিটার জ্বালানি উদ্ধার : সারা দেশে অবৈধ মজুদবিরোধী অভিযানে এক দিনে আরও ২৫ হাজার ৫৩৭ লিটার জ্বালানি তেল উদ্ধার করা হয়েছে। এ নিয়ে মোট উদ্ধার দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৭২ হাজার ৩৮৮ লিটারে।
গতকাল বৃহস্পতিবার জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের মুখপাত্র (যুগ্ম সচিব) মনির হোসেন চৌধুরী এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, গত ৩ মার্চ থেকে ১ এপ্রিল পর্যন্ত ৬৪ জেলায় মোট ৪ হাজার ৮২৪টি অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। এর মধ্যে বুধবার ৩৮১টি অভিযান চালিয়ে ১৬৯টি মামলা করা হয়েছে। এসব অভিযানে মোট ৮ লাখ ৮৬ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয় এবং একজনকে দেওয়া হয়েছে একজনকে কারাদ-। জব্দ করা হয়েছে ২৫ হাজার ১৩২ লিটার ডিজেল, ১০ লিটার অকটেন ও ৩৯৫ লিটার পেট্রোল।
এ পর্যন্ত মোট ২ হাজার ৯টি মামলা হয়েছে এবং জরিমানা আদায় করা হয়েছে ১ কোটি ১ লাখ ৪৩৫ টাকা। কারাদ- পেয়েছেন ২৪ জন। উদ্ধারকৃত জ্বালানির মধ্যে রয়েছে ২ লাখ ৭১ হাজার ৩৭৪ লিটার ডিজেল, ৩০ হাজার ৯৬০ লিটার অকটেন এবং ৭০ হাজার ৫৪ লিটার পেট্রোল।
সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়, দেশে বর্তমানে মোট ২ লাখ ৫৫ হাজার ১৮ টন জ্বালানি তেল মজুদ রয়েছে। এর মধ্যে ডিজেল ১ লাখ ২২ হাজার ৬৬০ টন, কেরোসিন ৯ হাজার ৩৭৮ টন, অকটেন ৯ হাজার ২১ টন এবং পেট্রোল ১২ হাজার ১৯৪ টন। এছাড়া ফার্নেস অয়েল রয়েছে ৫৮ হাজার ৭৩৬ টন, জেট ফুয়েল ৪১ হাজার ৮৭৬ টন এবং মেরিন ফুয়েল ১ হাজার ১৫৩ টন।
মনির হোসেন চৌধুরী বলেন, দেশে ডিজেল, পেট্রোল ও অকটেনের কোনো সংকট নেই এবং এপ্রিল মাস পুরোপুরি নিরাপদ। তবে প্যানিক বায়িং ও মজুদ-প্রবণতা এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি, যার প্রভাব পেট্রোলপাম্পে দেখা যাচ্ছে।
আরও ১৭ লাখ টন জ্বালানি তেল কিনবে সরকার : দেশে জরুরি জ্বালানি চাহিদা পূরণে আন্তর্জাতিক তিনটি দরপত্রের মাধ্যমে ১৭ লাখ টন বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি তেল আমদানি করবে সরকার। আগামীকাল শনিবার সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির ভার্চুয়াল সভায় এসব প্রস্তাব তুলে ধরা হবে বলে জানিয়েছে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ।
এসব জ্বালানির মধ্যে দুবাই থেকে ১০ লাখ টন ডিজেল ও ১ লাখ টন অকটেন, ওমান থেকে ১ লাখ টন ডিজেল এবং কাজাখস্তান থেকে ৫ লাখ টন ডিজেল কেনার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
প্রস্তাব অনুসারে ডিবিএস ট্রেডিং হাউজ এফজেডসিওর কাছ থেকে আন্তর্জাতিক ক্রয়ে সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে ১০ লাখ টন (ইএন ৫৯০-১০ পিপিএম) মানের ডিজেল এবং ১ লাখ টন অকটেন আমদানির প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে। একই সভায় ম্যাক্সওয়েল ইন্টারন্যাশনাল এসপিসির কাছ থেকে আন্তর্জাতিক সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে ১ লাখ টন ৫০ পিপিএম সালফার মানের ডিজেল আমদানির প্রস্তাব উপস্থাপন করা হবে। অন্যদিকে কাজাখস্তান গ্যাস প্রসেসিং প্ল্যান্ট এলএলপির কাছ থেকে আন্তর্জাতিক সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে ৫ লাখ টন ডিজেল আমদানির প্রস্তাবও সভায় উপস্থাপন করা হবে।