মানহার বৃত্তি পরীক্ষা অনিশ্চিত

আপডেট : ০৩ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:০৬ এএম

দৃষ্টি প্রতিবন্ধকতা জয় করে আবৃত্তি, গান, কুইজসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে প্রায় ১০০ পুরস্কার পেয়েছে ইউসরা মানহা। শ্রুতি লেখক নিয়ে দুটি আইনের জটিলতায় পড়ে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে আসন্ন প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় এই অদম্য মেধাবীর অংশগ্রহণ। প্রায় এক মাস সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোয় ধরনা দিয়েও বিষয়টির সুরাহা না হওয়ায় হতাশ মানহার বাবা-মা। প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষার আর মাত্র ১২ দিন বাকি থাকায় তারা শিক্ষামন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চেয়েছেন।

ইউসরা মানহা যশোর ইংলিশ স্কুল অ্যান্ড কলেজের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী। সে যশোর শহরের নাজির শংকরপুর এলাকার আসকার সালমান ওসুমনা ফেরদৌসের সন্তান। দৃষ্টি প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে লেখাপড়ার পাশাপাশি সে সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে চলেছে। স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে আবৃত্তি, গান, কুইজসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় প্রায় একশ পুরস্কার পেয়েছে। মানহার বাবা আসকার সালমান জানান, মানহা ২০২৫ সালের প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষায় অংশ নেবে, যা আগামী ১৫ এপ্রিল শুরু হওয়ার কথা।

যেহেতু মানহা দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী, তাই পরীক্ষার এক মাস আগে তার জন্য শ্রুতি লেখকের আবেদন করা হয়। শ্রুতি লেখকের জন্য মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের ‘পাবলিক ও শ্রেণি পরীক্ষায় শ্রুতি লেখকের সেবা গ্রহণ-সংক্রান্ত নীতিমালা-২০২৫’ রয়েছে। এই নীতিমালায় উল্লেখ আছে, ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন ২০১৩ এর ধারা ১৬ এর উপ-ধারা (১) এর দফা (ঝ) ও (ড) অনুযায়ী সকল পাবলিক পরীক্ষায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তির জন্য সংগতিপূর্ণ বন্দোবস্তপ্রাপ্তি নিশ্চিত করা।’ এই নীতিমালা অনুযায়ী প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীর জন্য শ্রুতি লেখকের সর্বোচ্চ যোগ্যতা একজন শিক্ষক নির্ধারণ করা হয়েছে। সে অনুযায়ী শ্রুতি লেখকের জন্য আবেদন করা হলে প্রাথমিক শিক্ষা অফিস ওই আবেদন গ্রহণ করেনি। বিপরীতে তারা প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা নীতিমালা-২০২৬ দেখিয়ে দিয়েছে। এই নীতিমালা অনুযায়ী শ্রুতি লেখক হিসেবে চতুর্থ শ্রেণির এক শিক্ষার্থীকে নেওয়া যাবে। আসকার সালমান বলেন, ‘আমরা যখন প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে জানতে চেয়েছি-২৬ সালের এই পরীক্ষায় চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী বলতে বোঝায় সদ্য তৃতীয় শ্রেণি উত্তীর্ণ শিশু। সে কীভাবে পঞ্চম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষায় শ্রুতি লেখক হতে পারে। সে তো অনেক শব্দ, বানান, বাক্য বুঝবেই না। পাশাপাশি এই শিশু শ্রুতি লেখকের মানসিক পরিপক্বতাও তো বুঝতে হবে। এ জন্য আমরা আবেদন করেছিলাম  ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন ২০১৩’ বিবেচনায় নিয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের নীতিমালাকে বিবেচনায় নিতে। কিন্তু প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সেটি ‘শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের, প্রাথমিকের নয়’ বলে উল্লেখ করে আমাদের কোনো কথাই শুনতে চাননি। অথচ ওই নীতিমালায় কিন্তু প্রাথমিকের বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে।’

মানহার মা সুমনা ফেরদৌস বলেন, ‘মানহা তার দৃষ্টি প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে অদম্য মেধার স্বাক্ষর রেখে চলেছে। কুইজ, আবৃত্তি, সংগীতসহ সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বিভিন্ন ধারায় প্রতিভার স্বাক্ষর রেখে প্রায় ১০০ পুরস্কার জয় করেছে। বৃত্তি পরীক্ষার জন্য নীতিমালা মেনে আমরা তার স্কুলের একজন শিক্ষককে শ্রুতি লেখক হিসেবে আবেদন করেছিলাম।’ তিনি জানান,  বিষয়টি নিয়ে তারা জেলা প্রশাসক, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা), জেলা শিক্ষা কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন দপ্তরে এক মাস ঘুরেছেন। কিন্তু প্রাথমিক শিক্ষা অফিস দুই নীতিমালার দোহাই দিয়ে কোনো সুরাহা করেনি। তিনি বলেন, ‘এই সংকট তো শুধু একটি শিশুর নয়; আরও অনেক শিশুকেই এই সমস্যার পড়তে হচ্ছে। তাই বিষয়টির সুরাহার জন্য শিক্ষামন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।’

এ ব্যাপারে জেলার ভারপ্রাপ্ত প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জিএম আলমগীর কবির জানান, প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষার জন্য ‘প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা নীতিমালা২০২৬’ রয়েছে। এই নীতিমালার বাইরে গিয়ে তাদের কিছু করার নেই।

জেলা প্রতিবন্ধীবিষয়ক কর্মকর্তা মুনা আফরিণ বলেন, ‘মেধাবী মানহার শ্রুতি লেখক নিয়ে এই ঠেলাঠেলি আমাকে মর্মাহত করেছে। অন্য আইনে যা-ই থাকুক না কেনো প্রতিবন্ধী ব্যক্তির জন্য ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন ২০১৩’ কার্যকর হবে। এই আইন মেনে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ নীতিমালা করেছে। অথচ আন্তঃমন্ত্রণালয় জটিলতার কারণে প্রাথমিক বিভাগ ওই নীতিমালা মানছে না। এটি একজন প্রতিবন্ধী শিশুর অধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। জেলা প্রতিবন্ধীবিষয়ক কর্মকর্তা হিসেবে আমি মানহার জন্য ন্যায় চাই।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত