অনলাইন ক্লাসে সমাধান হবে?

আপডেট : ০৫ এপ্রিল ২০২৬, ০১:১৮ এএম

হঠাৎ করে বদলে যাচ্ছে শ্রেণিকক্ষের দৃশ্য। যে ঘর একসময় ভরে থাকত চক-ডাস্টের গন্ধে, বেঞ্চের সারিতে বসা কৌতূহলী চোখ আর শিক্ষক-শিক্ষার্থীর প্রাণবন্ত আলাপচারিতায়, সেই জায়গা এখন দখল করে নিচ্ছে একটি ছোট স্ক্রিন। নীল আলোর সেই পর্দা যেন ধীরে ধীরে গ্রাস করছে, শিক্ষার বিস্তৃত পরিসর। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভেসে বেড়ানো খবরগুলো প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছে আবার কি ফিরছে অনলাইন ক্লাসের দিন, নাকি এটি কেবল সময়ের সাময়িক প্রতিক্রিয়া? সাম্প্রতিক জ্বালানি সংকট ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের প্রয়োজনীয়তা সামনে আসার পর থেকে, অনলাইন ক্লাস নিয়ে আলোচনা নতুন গতি পেয়েছে। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিকল্প পথ হিসেবে,  ডিজিটাল শিক্ষার দিকে ঝুঁকছে। বাস্তবতার নিরিখে এটি নিঃসন্দেহে একটি পরিস্থিতিভিত্তিক সিদ্ধান্ত। যদিও শিক্ষাব্যবস্থা এখনো পুরোপুরি অনলাইন কাঠামোয় রূপ নিতে প্রস্তুত হয়নি। অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, প্রযুক্তিগত ঘাটতি এবং দক্ষতার অভাব সব মিলিয়ে এই রূপান্তর এখনো অসম্পূর্ণ, অনেক পথ বাকি।

প্রশ্নটি কেবল প্রযুক্তিগত নয়, গভীরভাবে মানবিক। স্ক্রিনের ওপারে বসে,  একজন শিক্ষার্থী কি সত্যিই শ্রেণিকক্ষের মতো মনোযোগ ধরে রাখতে পারে? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে,  আমাদের ফিরে যেতে হয় সেই পরিচিত শ্রেণিকক্ষে, যেখানে প্রতিটি মুহূর্তে থাকে এক ধরনের জীবন্ত স্পন্দন। শিক্ষকের কণ্ঠের ওঠানামা, সহপাঠীদের সঙ্গে সুস্থ প্রতিযোগিতা, হঠাৎ ছুড়ে দেওয়া প্রশ্ন সবকিছু মিলিয়ে তৈরি হয় শেখার অদৃশ্য কিন্তু শক্তিশালী পরিবেশ। এই পরিবেশই শিক্ষার্থীর মনোযোগকে ধরে রাখে, শেখার প্রতি আগ্রহ জাগিয়ে তোলে। অন্যদিকে, অনলাইন ক্লাসে সেই প্রাণবন্ততার অনেকটাই অনুপস্থিত। এখানে শিক্ষার্থী একা, একটি ডিভাইসের সামনে নিঃশব্দে বসে। শিক্ষক বলছেন, কিন্তু প্রতিক্রিয়ার উষ্ণতা যেন পর্দার আড়ালে আটকে থাকে। চোখে চোখ রেখে বোঝানোর সুযোগ নেই, তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার স্বতঃস্ফূর্ততা হারিয়ে যায়। যে কারণে মনোযোগ ধরে রাখা হয়ে ওঠে এক নিঃসঙ্গ সংগ্রাম। এর সঙ্গে যুক্ত হয় বিভ্রান্তির সহজলভ্যতা। একটি স্ক্রিনে যখন ক্লাস চলছে, তখন একই সঙ্গে সেখানে হাজির থাকে অসংখ্য প্রলোভন। একটি নোটিফিকেশন, একটি মেসেজ কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আকর্ষণ। অজান্তেই শিক্ষার্থীর মন সরে যায় অন্যদিকে। ফলে শেখার ধারাবাহিকতা ভেঙে পড়ে নিঃশব্দে। শুধু মনোযোগ নয়, অনলাইন শিক্ষার ক্ষেত্রে সমান সুযোগের প্রশ্নটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের অনেক অঞ্চলে এখনো স্থিতিশীল ইন্টারনেট সংযোগ একটি স্বপ্নের মতো। অনেক শিক্ষার্থীর কাছে প্রয়োজনীয় ডিভাইস নেই। কোথাও একটি ফোন ভাগাভাগি করে ব্যবহার করতে হয়,  পরিবারের কয়েকজনকে। ফলে অনলাইন শিক্ষা সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর হয়ে ওঠে না; বরং অনেক সময় এটি শিক্ষার বৈষম্যকে আরও প্রকট করে তোলে।

এই বৈষম্য শুধু একাডেমিক নয়, মানসিকও। যারা নিয়মিত ক্লাসে অংশ নিতে পারে না, তারা ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়ে, আত্মবিশ্বাস হারায় জন্ম নেয় হীনমন্যতা। ফলে অনলাইন শিক্ষা কখনো কখনো সুযোগ তৈরি করার বদলে, নতুন এক বিভাজনের রেখা টেনে দেয়। তবু পুরো চিত্রটি একপাক্ষিক নয়। অনলাইন শিক্ষার রয়েছে কিছু উজ্জ্বল দিকও। সময় ও স্থানের সীমাবদ্ধতা ভেঙে দিয়ে, এটি শেখার প্রক্রিয়াকে করে তুলেছে আরও নমনীয়। একজন শিক্ষার্থী নিজের সুবিধামতো সময়ে পড়তে পারে, রেকর্ড করা লেকচার বারবার দেখে বুঝে নিতে পারে। বিশেষ করে যারা নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত থাকতে পারে না, তাদের জন্য এটি হয়ে উঠেছে এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার। শিক্ষকদের জন্যও এই মাধ্যম খুলে দিয়েছে নতুন দিগন্ত। মাল্টিমিডিয়া উপকরণ, ভিডিও, অ্যানিমেশন ও প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে পাঠদানকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলা সম্ভব হচ্ছে, যা অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বাড়াতে সহায়ক ভূমিকা রাখছে। তবু একটি অনিবার্য প্রশ্ন এই সুবিধাগুলো কি কখনো শ্রেণিকক্ষের অভিজ্ঞতার বিকল্প হতে পারে? কারণ শ্রেণিকক্ষ শুধু একটি স্থান নয়; একটি অনুভব। এখানে জানা-শেখা হয় শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান নয় বরং সামাজিকতা, যোগাযোগ দক্ষতা, দলগত কাজ এবং মানবিক মূল্যবোধ। এই অমূল্য অভিজ্ঞতাগুলো একটি স্ক্রিনে, ধারণ করা কঠিন।এখানেই আসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভাবনা। যদি জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য অনলাইন ক্লাস চালু করা হয়, তাহলে সেই উদ্যোগ কি কেবল শিক্ষার্থীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে? অফিস-আদালত ও বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে যদি আংশিকভাবে ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ চালু করা যায়, তাহলে সামগ্রিকভাবে যাতায়াত ও বিদ্যুৎ ব্যবহারের চাপ কমানো সম্ভব। যদিও এখানে কিছু সমস্যা রয়েছে। তবে তুলনামূলকভাবে বিদ্যুতের অপচয় কম হবে।

শ্রেণিকক্ষের হাসি, বন্ধুর সঙ্গে ছোটখাটো তর্ক, শিক্ষকের সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন করার সাহস এসব শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ। এগুলো একজন শিক্ষার্থীর ব্যক্তিত্ব গঠনে গভীর প্রভাব ফেলে। অনলাইন ক্লাসে এই মানবিক সংযোগের অভাব দীর্ঘমেয়াদে একটি শূন্যতা তৈরি করতে পারে, যা প্রযুক্তি দিয়ে পূরণ করা সহজ নয়। তাই বাস্তবতার নিরিখে বলা যায়, অনলাইন ক্লাস এখনো একটি সহায়ক মাধ্যম, কখনো মূলধারার বিকল্প নয়। মহামারি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা জ্বালানি সংকটের মতো পরিস্থিতিতে, এটি আপাত শিক্ষাব্যবস্থাকে সচল রাখার একটি উপায় হতে পারে। কিন্তু সম্পূর্ণভাবে মূলধারায় রূপ দিতে হলে প্রয়োজন, সুদূরপ্রসারী প্রস্তুতি, উন্নত ইন্টারনেট ব্যবস্থা, সবার জন্য ডিভাইসের সহজলভ্যতা, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ এবং শিক্ষার্থীদের মানসিক প্রস্তুতি। শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন আসে, আমরা প্রযুক্তিকে কীভাবে গ্রহণ করব? শুধু সংকটের সাময়িক সমাধান হিসেবে, নাকি ভবিষ্যতের শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে? হয়তো উত্তরটি মাঝামাঝি কোথাও লুকিয়ে আছে। প্রযুক্তিকে পুরোপুরি অস্বীকার করা যেমন সম্ভব নয়, তেমনি এটিকে একমাত্র ভরসা করাও বাস্তবসম্মত নয়। প্রয়োজন একটি সমন্বিত পদ্ধতি যেখানে অনলাইন ও অফলাইন শিক্ষা একে অপরের পরিপূরক হয়ে কাজ করবে। কারণ শিক্ষা কেবল একটি পদ্ধতি নয়; এটি একটি অভিজ্ঞতা, একটি যাত্রা। আর সেই যাত্রার প্রাণ এখনো বেঁচে আছে শ্রেণিকক্ষের ভেতরে। সেটি মানুষের মধ্যে, সংযোগের উষ্ণতায়। যতদিন সেই উষ্ণতা পুরোপুরি স্ক্রিনে ধরা সম্ভব না হবে, ততদিন অনলাইন ক্লাস থাকবে প্রয়োজনের সঙ্গী হয়ে। কিন্তু কখনো শ্রেণিকক্ষের বিকল্প হয়ে উঠবে না।

লেখক : সহযোগী সদস্য রাজশাহী কলেজ রিপোর্টার্স ইউনিটি

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত