জান্নাত আরবি শব্দ। এর অর্থ বাগান। ইসলামী পরিভাষায় জান্নাত বলতে এমন স্থানকে বোঝায়, যা আল্লাহতায়ালা তার অনুগত বান্দাদের জন্য নির্দিষ্ট করে রেখেছেন। এটি দিগন্ত বিস্তৃত নানা রকম ফুলে ফুলে সুশোভিত ও সুরম্য অট্টালিকা সম্বলিত মনোমুগ্ধকর বাগান। যার পাশ দিয়ে প্রবহমান রয়েছে বিভিন্ন ধরনের নদী ও ঝর্ণাধারা। যেখানে চির বসন্ত বিরাজমান। কেয়ামতের দিন হিসাব-নিকাশ শেষে নেক বান্দাদের সেখানে প্রবেশ করানো হবে। কোরআন ও হাদিসে ৮ প্রকার জান্নাতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সেগুলোর নাম ও বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করা হলো।
জান্নাতুল ফেরদাউস : ফেরদাউস অর্থ উৎকৃষ্ট স্থান। এটি জান্নাতের সর্বোচ্চ এবং সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ স্তর। এর ঠিক ওপরেই মহান আল্লাহর আরশ অবস্থিত। ইমান ও সৎকর্মশীলদের জন্য মহান আল্লাহ এ জান্নাত সাজিয়ে রেখেছেন। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয় যারা ইমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে, তাদের আতিথেয়তার জন্য রয়েছে জান্নাতুল ফেরদাউস। সেখানে তারা স্থায়ী হবে, তারা সেখান থেকে অন্য কোথাও স্থানান্তরিত হতে চাইবে না।’ (সুরা কাহাফ ১০৭-১০৮)
জান্নাতুন নাঈম : জান্নাতুন নাঈম অর্থ সুখময় নিবাস। নেয়ামতে ভরপুর এ জান্নাত। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয় মুত্তাকিদের জন্য তাদের প্রতিপালকের কাছে রয়েছে নেয়ামতপূর্ণ জান্নাত।’ (সুরা কলম ৩৪) ইসলামি পরিভাষায় জান্নাতুন নাঈম হলো আল্লাহভীরু বান্দাদের জন্য প্রস্তুতকৃত জান্নাতের বিশেষ স্তর। পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই যারা ইমান এনেছে এবং সৎকর্ম করেছে, তাদের জন্য রয়েছে সুখময় জান্নাত।’ (সুরা লোকমান ৮)
জান্নাতুল মাওয়া : জান্নাতুল মাওয়া অর্থ নিরাপদ আশ্রয়। নেককার ও শহীদদের রুহগুলো এ জান্নাতে এসে আশ্রয় নেবে, এখান থেকে তারা আর বাইরে বের হবে না। এজন্য এর নামকরণ করা হয়েছে জান্নাতুল মাওয়া। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর যারা ইমান আনে ও নেক আমল করে তাদের জন্য তাদের আমলের প্রতিদানস্বরূপ রয়েছে জান্নাতুল মাওয়া।’ (সুরা সাজদা ১৯)
জান্নাতু আদন : জান্নাতু আদন অর্থ স্থায়ী ও অবিনশ্বর বাসগৃহ। চিরন্তন সুখের নীড়। জান্নাত যেহেতু চিরস্থায়ী আবাস, কখনো শেষ হবে না, তাই জান্নাতের আরেক নাম জান্নাতু আদন। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘জান্নাতু আদন, তারা তাতে প্রবেশ করবে, যার পাদদেশে ঝরনাসমূহ বয়ে গিয়েছে। সেখানে তারা যা চাইবে তাদের জন্য তাই রয়েছে। এভাবেই আল্লাহ মুত্তাকিদের পুরস্কার দিয়ে থাকেন।’ (সুরা নাহল ৩১)
দারুস সালাম : দারুস সালাম অর্থ হলো শান্তি ও নিরাপত্তার নিবাস। এ জান্নাত সম্বন্ধে মহান আল্লাহ বলেন, ‘তাদের জন্য তাদের প্রতিপালকের কাছে রয়েছে শান্তির নিবাস এবং তারা যে আমল করত, তার জন্য তিনিই তাদের অভিভাবক।’ (সুরা আনআম ১২৭)
দারুল খুলদ : দারুল খুলদ অর্থ স্থায়ী নিবাস। জান্নাতিরা সেখানে চিরস্থায়ী হবে, কখনো বের হবে না। যেখানে দুঃখ বা মৃত্যুর প্রবেশাধিকার নেই। জান্নাতিদের অবস্থার আলোকে এর নামকরণ করা হয়েছে দারুল খুলদ। এ প্রসঙ্গে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমরা তাতে শান্তির সঙ্গে প্রবেশ করো, এটাই (খুলদ) স্থায়িত্বের দিন।’ (সুরা কাফ ৩৪)
দারুল মুকামাহ : দারুল মুকামাহ অর্থ চিরস্থায়ী বাসস্থান। যেখানে মানুষ একবার প্রবেশ করলে আর কখনো বাইরে বের হবে না। তাই এর নামকরণ করা হয়েছে দারুল মুকামাহ। মহান আল্লাহ জান্নাতিদের অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, ‘আর তারা বলবে, সকল প্রশংসা আল্লাহর, যিনি আমাদের দুঃখ-কষ্ট দূর করে দিয়েছেন। নিশ্চয় আমাদের প্রতিপালক পরম ক্ষমাশীল ও অত্যন্ত গুণগ্রাহী। যিনি নিজ অনুগ্রহে আমাদের দারুল মুকামাহ তথা চিরস্থায়ী নিবাসে স্থান দিয়েছেন, যেখানে কোনো কষ্ট আমাদের স্পর্শ করে না এবং যেখানে কোনো ক্লান্তিও আমাদের স্পর্শ করে না।’ (সুরা ফাতির ৩৪-৩৫)
দারুল কারার : দারুল কারার অর্থ স্থায়ী আবাস। এ জান্নাত সম্বন্ধে পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘হে আমার সম্প্রদায়। এ পার্থিব জীবন তো অস্থায়ী উপভোগের বস্তু। আর পরকাল হলো দারুল কারার তথা চিরস্থায়ী আবাস।’ (সুরা মুমিন ৩৯)
মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে যথাযথভাবে উত্তম আমল করে জান্নাত লাভ করার তৌফিক দান করুন। আমিন।
লেখক : ইসলামবিষয়ক গবেষক