মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ থেকে আপাতত যুদ্ধের মেঘ সরতে শুরু করেছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান চরম উত্তেজনার মধ্যেই আগামী দুই সপ্তাহের জন্য সব ধরনের সামরিক অভিযান ও বোমাবর্ষণ স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বুধবার (৮ এপ্রিল) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় ট্রাম্প জানান, তিনি ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে সম্মত হয়েছেন। এই পদক্ষেপকে তিনি একটি ‘দ্বিপক্ষীয় যুদ্ধবিরতি’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন, যা বিশ্বজুড়ে স্বস্তির বার্তা দিচ্ছে।
এই সাময়িক যুদ্ধবিরতিকে একটি স্থায়ী শান্তি চুক্তিতে রূপ দিতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জোর কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয়েছে। আগামী শুক্রবার (১১ এপ্রিল) পাকিস্তানের ইসলামাবাদে একটি বিশেষ বৈঠকের ডাক দেওয়া হয়েছে। এই ত্রিপক্ষীয় বা বহুপক্ষীয় আলোচনায় ইরান, যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের সংশ্লিষ্ট মিত্র দেশগুলোর প্রতিনিধিদের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। ইসলামাবাদের এই বৈঠকটিই নির্ধারণ করবে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা কোন দিকে যাবে।
এদিকে আলোচনার টেবিল গরম করতে ইরান তাদের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের মাধ্যমে ১০ দফার একটি বিস্তারিত প্রস্তাব পেশ করেছে। তেহরানের এই প্রস্তাবগুলোর মূলে রয়েছে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক আইনি নিশ্চয়তা। ইরানের অন্যতম প্রধান শর্ত হলো বিশ্ববাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালিতে “নিয়ন্ত্রিত যাতায়াত” ব্যবস্থা চালু করা। তেহরান চায় তাদের সশস্ত্র বাহিনীর সমন্বয়ে সেখানে একটি নতুন ট্রানজিট কাঠামো গড়ে তুলতে, যা কার্যকর হলে ওই অঞ্চলে ইরানের ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।
নিরাপত্তা ইস্যুতে ইরান অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নিয়েছে। তাদের অন্যতম দাবি হলো মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা সব মার্কিন সেনা প্রত্যাহার এবং বিদ্যমান সামরিক ঘাঁটিগুলো বন্ধ করে দেওয়া। ইরানের মতে, এই অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতিই সংঘাতের প্রধান উৎস। এর পাশাপাশি তারা হিজবুল্লাহ, হামাস ও হুতিদের মতো তাদের আঞ্চলিক মিত্রদের ওপর সব ধরনের সামরিক হামলা বন্ধের দাবি জানিয়েছে। ইরান স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, মিত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কোনো স্থায়ী সমঝোতা সম্ভব নয়।
অর্থনৈতিক ফ্রন্টেও ইরান বড় ধরনের ছাড় দাবি করেছে। তাদের ওপর আরোপিত সব ধরনের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং বিদেশে আটকে থাকা রাষ্ট্রীয় সম্পদ নিঃশর্তভাবে ফেরত দেওয়ার শর্ত দেওয়া হয়েছে। এছাড়া বিগত বছরগুলোতে সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপের কারণে ইরানের যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তার জন্য তারা “পূর্ণাঙ্গ ক্ষতিপূরণ” দাবি করেছে। তেহরান চায়, যেকোনো সম্ভাব্য চুক্তি যেন জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে একটি বাধ্যতামূলক রেজুলেশন হিসেবে পাস হয়, যাতে ভবিষ্যতে কোনো পক্ষ একতরফাভাবে চুক্তি থেকে সরে যেতে না পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত হলেও ইরানের ১০ দফা শর্তের অনেকগুলোই ওয়াশিংটন ও তার মিত্রদের জন্য মেনে নেওয়া বেশ কঠিন। বিশেষ করে সেনা প্রত্যাহার এবং আন্তর্জাতিক গ্যারান্টির বিষয়টি রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল। তবে ইসলামাবাদের আসন্ন বৈঠকটি যদি সফল হয়, তবে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তির পথ প্রশস্ত হবে। অন্যথায়, দুই সপ্তাহের এই বিরতি শেষে অঞ্চলটি আরও বড় ধরনের সংঘাতের মুখে পড়ার আশঙ্কা থেকে যাচ্ছে।
