বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার শিক্ষাকে জাতির শ্রেষ্ঠ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করে একটি গুণগত, জীবনমুখী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একইসঙ্গে তিনি ঘোষণা করেছেন, সরকারের মূল দর্শন হলো ‘ব্যক্তি নয়, পরিবারই উন্নয়নের মূল একক’।
গতকাল বুধবার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রমের সভাপতিত্বে প্রশ্নোত্তরপর্বে সংসদ সদস্যদের বিভিন্ন লিখিত প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তরগুলো টেবিলে উত্থাপিত হয়।
শিক্ষা খাতে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের পরিকল্পনা : সংসদ সদস্য মো. সেলিম রেজার প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী জানান, সরকার নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী শিক্ষা খাতে বরাদ্দ পর্যায়ক্রমে জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা নিয়েছে। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে ৪৩টি ক্ষেত্র চিহ্নিত করে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা কার্যকর করা হচ্ছে।
শিক্ষায় ডিজিটাল রূপান্তর : নতুন প্রজন্মকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সক্ষম করতে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপন করা হবে। ডিজিটাল বৈষম্য দূর করতে ১৫০০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফ্রি ওয়াইফাই সংযোগ এবং শিক্ষার্থীদের জন্য ‘এডু-আইডি’ (ঊফঁ-ওউ) প্রদান করা হবে। আগামী ১৮০ দিনের মধ্যে ২৩৩৬টি কারিগরি ও ৮২৩২টি মাদ্রাসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফ্রি ওয়াইফাই চালু করা হবে।
বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের (বিসিসি) মাধ্যমে আগামী ৬ মাসের মধ্যে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (অও), সাইবার সিকিউরিটি এবং পাইথন প্রোগ্রামিংয়ের মতো আধুনিক বিষয়ে শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রাথমিক ও মাদ্রাসা শিক্ষার মানোন্নয়ন: প্রধানমন্ত্রী জানান, চলতি অর্থবছরেই ২ লাখ শিক্ষার্থীর মধ্যে বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস বিতরণ করা হবে এবং পর্যায়ক্রমে সব উপজেলায় স্কুল ফিডিং বা মিড-ডে মিল চালু করা হবে। এছাড়া মাদ্রাসা শিক্ষাকে আধুনিক করতে স্মার্ট ক্লাসরুম ও কারিগরি কোর্স অন্তর্ভুক্ত করার কাজ চলছে।
প্রতিটি উপজেলায় একটি করে মহিলা কলেজ সরকারিকরণ করা হবে : দেশের নারীশিক্ষার প্রসার ও নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে প্রতিটি উপজেলা সদরে একটি করে মহিলা কলেজ সরকারিকরণের পরিকল্পনা করছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জানিয়েছেন, সরকার বিষয়টি অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করছে এবং পর্যায়ক্রমে তা বাস্তবায়ন করা হবে। নওগাঁ-৪ আসনের সংসদ সদস্য ইকরামুল বারী টিপুর এক প্রশ্নের লিখিত জবাবে প্রধানমন্ত্রী এ তথ্য জানান।
সাংসদ ইকরামুল বারী টিপু তার প্রশ্নে নওগাঁর মান্দা উপজেলাধীন ‘মান্দা থানা আদর্শ বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজ’-সহ দেশের সব উপজেলা সদরে একটি করে মহিলা কলেজ সরকারিকরণের কোনো পরিকল্পনা আছে কি না এবং থাকলে তা কতদিনের মধ্যে বাস্তবায়ন হবে তা জানতে চান।
জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার নারীশিক্ষার প্রসার এবং নারীর ক্ষমতায়ন ও শিক্ষার সমান সুযোগ নিশ্চিতকরণে বদ্ধপরিকর। এ লক্ষ্যে দেশের সব উপজেলা সদরে একটি করে মহিলা কলেজ সরকারিকরণের বিষয়টি সরকার ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করছে।
তিনি আরও উল্লেখ করে বলেন, মান্দা একটি বৃহৎ ও গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা হওয়ায় সেখানে নারীশিক্ষার প্রসারে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বাস্তবায়নের সময়সীমা ও প্রক্রিয়া প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী জানান, মান্দা থানার আদর্শ বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজসহ দেশের অন্যান্য উপজেলার উপযুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকারিকরণের বিষয়টি বর্তমান নীতিমালা এবং প্রয়োজনীয় আর্থিক সংস্থান বিবেচনা করে পর্যায়ক্রমে উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে।
প্রধানমন্ত্রী নারীশিক্ষার সমান সুযোগ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন এবং জানান যে, সরকারের এই পদক্ষেপ তৃণমূল পর্যায়ে নারীশিক্ষার হারে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে।
‘ফ্যামিলি কার্ড’: ৪ কোটি পরিবারকে সহায়তার লক্ষ্য : নোয়াখালী-১ আসনের সংসদ সদস্য এ. এম. মাহবুব উদ্দিনের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বর্তমান সরকারের দর্শন হলো ব্যক্তি নয়, পরিবারই উন্নয়নের মূল একক। এই দর্শনের ভিত্তিতে দেশের প্রায় ৪ কোটি প্রান্তিক ও নিম্নবিত্ত পরিবারকে পর্যায়ক্রমে ‘ফ্যামিলি কার্ড’-এর আওতায় আনা হবে।
উল্লেখ্য, গত ১০ মার্চ ২০২৬ তারিখে পরীক্ষামূলকভাবে ১০টি জেলা ও ৩টি সিটি করপোরেশনের ৩৭,৮১৪টি পরিবারকে এই কার্ড প্রদান করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, দ্রুততম সময়ের মধ্যে নোয়াখালীর চাটখিল ও সোনাইমুড়ী এলাকার দরিদ্র নারীদেরও এই কর্মসূচির আওতায় এনে স্বাবলম্বী করা হবে।
পর্যটন শিল্পের বিকাশে মহাপরিকল্পনা : সংসদ সদস্য দেওয়ান মোহাম্মদ সালাউদ্দিনের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী পর্যটন খাতকে অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি জানান, ‘জাতীয় পর্যটন মহাপরিকল্পনা’-এর খসড়া ইতিমধ্যে প্রণয়ন করা হয়েছে।
সরকারের ৫টি প্রধান প্রতিশ্রুতি : ১. পর্যটকদের নিরাপত্তা ও পর্যটনবান্ধব নীতি। ২. ট্যুর গাইড প্রশিক্ষণ। ৩. রন্ধনশৈলী (ঈঁষরহধৎু) পর্যটনের প্রসার। ৪. কমিউনিটি, এথনিক ও ওয়াটার ট্যুরিজমের বিকাশ। ৫. ইকো-ট্যুরিজম ও গ্রাম পর্যটন উন্নয়ন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের ৩০টিরও বেশি জেলায় স্বীকৃত পর্যটন গন্তব্য রয়েছে। প্রতিটি জেলার স্থানীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে ভিত্তি করে পর্যটন সুবিধা সৃষ্টির মাধ্যমে আগামী দুই দশকের জন্য একটি সমন্বিত উন্নয়ন কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে।
